বিক্রম থেকে শ্রী কিংবা মোহাম্মদ: অস্ট্রেলিয়ার রাস্তায় স্বপ্নভঙ্গের করুণ আখ্যান

পরিবারের কাছে হারিয়ে যাওয়া, বিশ্বের কাছেও হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ মারা গেলেন। তার মৃত্যু ছিল নীরব, কোনো ঘোষণা বা আলোচনার বিষয় নয়। ছয় দিন পর্যন্ত তার মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। হাজার হাজার মানুষ তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কেউ খেয়াল করেনি। এটি কোনো প্রত্যন্ত এলাকা নয়। এটি সিডনির কেন্দ্রস্থল। আর শীত নামার সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করছে যে এমন আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ এমন মা, যারা জোরপূর্বক বা পারিবারিক চাপে হওয়া বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছেন। কেউ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, যারা নিজেদের অবস্থার কথা পরিবারকে বলতে এতটাই লজ্জা পান যে তারা বরং মৃত্যুকেই বেছে নিতে চান।

তারা গৃহহীন— যেমন ছিলেন বিক্রম লামা। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি নেপালের একজন সাবেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ছিলেন। সেন্ট জেমস ট্রেন স্টেশনের বাইরে তার মৃত্যু অস্ট্রেলিয়ার রাস্তায় চলতে থাকা এক অদৃশ্য বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এই গৃহহীন মানুষরা নাগরিক নন, স্থায়ী বাসিন্দাও নন। কিন্তু তারা অস্ট্রেলিয়ায় আটকে আছেন— কেউ দেশে ফিরতে পারছেন না, কেউ দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী ভিসার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন, আশায় যে অস্ট্রেলিয়া তাদের থাকতে দেবে।

শ্রীও একজন নেপালি নারী। তিনি 7.30-কে জানান, তাকে প্রতারণা ও চাপের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। “আমার আত্মীয়রা তাকে চিনত। তারা চারবার আমার কাছে এই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। আমি বলেছিলাম, ‘না, না, আমি বিয়ে করতে চাই না।'”

শ্রী বলেন, শেষ পর্যন্ত পারিবারিক চাপের কাছে তাকে হার মানতে হয়। বিয়ের দুই সপ্তাহের মধ্যেই তার স্বামী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। এক মাসের মধ্যেই তিনি গর্ভবতী হন। গর্ভাবস্থার সময় তিনি অস্ট্রেলিয়ায় স্বামীর বৃহৎ পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন।

শ্রী বলেন, “তার মা বারবার বলতেন, তার ছেলে আমাকে বিয়ে করেছে শুধু এই কারণে যে আমার বয়স ২৫-এর নিচে এবং আমি সন্তান জন্ম দিতে পারব।” সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তিনি জানান, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন এবং তার স্বামীর পরিবার তাকে “মানসিক রোগী” বলে উপহাস করত এবং আত্মহত্যা করতে বলত।

শ্রী তখন একটি ব্রিজিং ভিসায় ছিলেন এবং তার পার্টনার-স্পন্সরড ভিসা আবেদনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি জানান, তার স্বামী তাকে হুমকি দেন যে তিনি তাকে তালাক দেবেন, তার ভিসা বাতিল করবেন এবং নেপালে ফেরত পাঠাবেন।

স্বামী সেই হুমকির একটি অংশ বাস্তবায়ন করেন— তার ভিসা বাতিল করেন এবং তাকে পরিত্যাগ করেন। ফলে তিনি গৃহহীন হয়ে পড়েন। তালাকের প্রক্রিয়া এখনও চলছে।

শ্রী বর্তমানে Women & Girls Emergency Centre (WAGEC)-এর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি জরুরি আশ্রয় পেয়েছেন। এটি গৃহহীনতা ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য একটি সেবা। সংস্থাটির আশ্রয়কেন্দ্রে প্রতিরাতে প্রায় ২০০ জন নারী থাকেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই স্থায়ী বাসিন্দা নন।

WAGEC-এর প্রতিনিধি স্যাম ইয়েটস বলেন, শ্রীর মতো ঘটনা খুবই সাধারণ। “তিনি তার স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেন। কিন্তু এখানে এসে যদি পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন, তখন স্বামী তার ভিসা আবেদন বাতিল করতে পারেন। ফলে তিনি মেডিকেয়ার, সেন্টারলিংকসহ কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার জন্য যোগ্য থাকেন না।”

তিনি আরও বলেন: “অনেক নারী বলেন, ‘আমি দেশে ফিরে পরিবারে কাছে যেতে চাই।’ কিন্তু সেটাও সব সময় সম্ভব হয় না। কারণ সন্তান নিয়ে দেশ ছাড়তে গেলে বাবার অনুমতি লাগে, আর অনেক পুরুষ সেই অনুমতি দেন না।” শ্রীর সাবেক স্বামী এবং তাদের মেয়ে দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। শ্রী পারিবারিক সহিংসতা সংক্রান্ত বিশেষ বিধানের আওতায় পার্টনার ভিসার আবেদন করেছেন। এটি অনুমোদিত হলে তিনি স্বামীর ওপর নির্ভর না করেই স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাবেন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, পার্টনার ভিসার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকরণ সময় ১৭ মাসেরও বেশি হতে পারে।

ইয়েটস বলেন, অনেক নারীর ক্ষেত্রে এটি কয়েক বছর পর্যন্ত সময় নেয়। আর অপেক্ষার সময়ে তাদের নিজেদের জীবিকা নির্বাহের অধিকারও সীমিত থাকে, যা তাদের গৃহহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। “অনেক সময় তারা কাজ করার অনুমতিও পান না। ফলে তারা পড়াশোনা করতে পারেন না, শিশু পরিচর্যা ভাতা পান না, এমনকি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করতে পারেন না।”

তবুও শ্রী অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আমার মেয়েকে ছেড়ে চলে যেতে পারি না। সেটাই তো সে (স্বামী) চেয়েছিল।”

বিক্রমের পরিবারের কাছে তার অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার খরচ জোগানো সহজ ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার ডিগ্রি তার জন্য ভালো ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে— এই আশায় তার পরিবার কাঠমান্ডুর দক্ষিণে অবস্থিত তাদের গ্রামের কিছু কৃষিজমি বিক্রি করে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠায়। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০২৩ সালে তিনি তার পাসপোর্ট নবায়ন করতে ব্যর্থ হন।

নেপালি দূতাবাস যখন তার মরদেহ শনাক্ত করার জন্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখনই তারা প্রথম জানতে পারে তার জীবনের করুণ পরিণতির কথা। মরদেহ এতটাই পচে গিয়েছিল যে ডিএনএ নমুনা, দাঁতের রেকর্ড ও আঙুলের ছাপের সাহায্য নিতে হয়েছিল। তার পরিবার জানতই না যে তিনি মৃত্যুর আগে রাস্তায় বসবাস করছিলেন। যেখানে তার মরদেহ পাওয়া যায়, সেখান থেকে কয়েক ব্লক দূরে সেন্ট ভিনসেন্ট ডি পল সোসাইটির ম্যাথিউ ট্যালবট হোস্টেল রয়েছে, যেখানে গৃহহীন একাকী পুরুষদের জন্য ৫২টি শয্যা আছে।

হোমলেসনেস অ্যান্ড হাউজিং এরিয়া ম্যানেজার জেমস নিউয়েল বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষাব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই এই সমস্যার বড় কারণ। “এর সঙ্গে খাবার ও ভাড়ার খরচ যোগ করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। ফলে অনেকেই পড়াশোনা শেষ করতে পারেন না এবং শেষ পর্যন্ত রাস্তায় এসে পড়েন।” যদিও হোস্টেলটি অস্থায়ী বাসিন্দাদেরও আশ্রয় দেয়, তবে যারা সরকারি ভাতা পান না তাদের জন্য খরচ বহন করা সংস্থার জন্য কঠিন।

তিনি বলেন, “বেশিরভাগ বাসিন্দাই সেন্টারলিংক ভাতা পান এবং সেই অর্থ দিয়ে আবাসনের খরচ দেন। কিন্তু অ-নাগরিকরা সেন্টারলিংক পান না। তাই আমরা তাদের তিন মাস পর্যন্ত বিনামূল্যে জরুরি আশ্রয় দিই।” গড় হিসেবে, অ-নাগরিকরা অন্যদের তুলনায় দীর্ঘ সময় হোস্টেলে থাকেন, কারণ তাদের জটিল ভিসা সমস্যার সমাধান করতে এবং জীবিকা অর্জনের পথ খুঁজতে বেশি সময় লাগে।

২০২৬ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস স্ট্রিট কাউন্ট অনুযায়ী, রাজ্যে ২,৩০৮ জন মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি।

সিডনি শহর কর্তৃপক্ষের অনুমান, রাস্তায় বসবাসকারী প্রতি পাঁচজনের একজন অ-নাগরিক। মোহাম্মদ তাদেরই একজন। তিনি প্রায় প্রতিদিন সেন্ট জেমস স্টেশনের পাশ দিয়ে হাঁটেন।  “আমি যখনই এখানে দিয়ে যাই, খুব খারাপ লাগে,” তিনি বলেন। বাংলাদেশ থেকে আসা মোহাম্মদ ১০ বছর আগে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। পরে তিনি গ্র্যাজুয়েট ভিসা পান এবং কাজ করার অনুমতি লাভ করেন।

নিজের পড়াশোনার ক্ষেত্র অনুযায়ী চাকরি না পেলেও তিনি পেট্রোল স্টেশন ও কনভিনিয়েন্স স্টোরে কাজ করতেন। তার আয়ের বেশিরভাগই স্ত্রী ও দুই সন্তানের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। ডিসেম্বরে তার কর্মভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাস্তায় ঘুমাতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি আশ্রয় (asylum) চেয়ে আবেদন করেছেন এবং বর্তমানে একটি ব্রিজিং ভিসা পেয়েছেন। এখন তার কাজ করার অনুমতি আছে, কিন্তু চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না। তার স্ত্রী জানতে চাইছেন কেন তিনি আর টাকা পাঠাচ্ছেন না। লজ্জার কারণে তিনি এখনও পরিবারকে বলেননি যে তিনি গৃহহীন।

তিনি বলেন, “স্ত্রীর কিছু সন্দেহ হচ্ছে।” “মানুষ যখন বিদেশে থাকে, তখন সবাই তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করে।” “আমি যদি বাবা-মাকে সত্যিটা বলি, হয়তো আমি তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে যাব।”

মোহাম্মদ বহুবার জরুরি আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছেন। “প্রথমেই তারা জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার মেডিকেয়ার আছে? সেন্টারলিংক আছে?’ যদি থাকে, তাহলে সাহায্য করা যায়। না হলে আপনাকে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হবে।” ফেডারেল সামাজিক সেবা বিভাগ এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

তবে গৃহহীনতা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে অ-নাগরিকদের জন্য আয়-সহায়তা চালু না হলে এই সম্প্রদায়ে আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে।

শ্রী যদিও ভাগ্যবানদের একজন, কারণ তিনি অন্তত অস্থায়ী আশ্রয় পেয়েছেন, তবুও তিনি নিজেকে অদৃশ্য মনে করেন। তিনি বলেন, “বিক্রম বা আমার মতো মানুষদের সবাই উপেক্ষা করে, কারণ আমরা সমাজের জন্য যেন এক ধরনের নিষিদ্ধ বিষয় হয়ে গেছি।” “শুধু অভিবাসন অবস্থানের কারণে মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করা সত্যিই খুব দুঃখজনক।”

Source: ABC news