‘মামস কিচেন’ : অস্ট্রেলিয়ায় হৃদয় শিকদারের স্বপ্নপূরণের গল্প

“স্বপ্ন যদি সত্যি মন থেকে দেখা যায়, তবে কঠোর পরিশ্রম একদিন না একদিন সফলতা এনে দেবেই। ব্যর্থতা কখনো শেষ নয়, প্রতিটি ব্যর্থতাই নতুন শিক্ষার পথ দেখায়।”

কথাগুলো বলছিলেন ৩০ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ উদ্যোক্তা হৃদয় শিকদার। জীবনের গতিপথ পরিবর্তনের আশায় ২০১৭ সালে দেশ ছেড়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী থানার এই যুবক। দীর্ঘ ৯ বছরের কঠোর সংগ্রাম, ভাষা ও সংস্কৃতির দেয়াল ভাঙা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আজ তিনি অস্ট্রেলিয়ার এডেলেইড শহরের একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টের সফল মালিক। ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে রাতারাতি সফল হওয়া কোনো গল্প এটি নয়; বরং ডিশ ওয়াশিং থেকে শুরু করে হেড শেফ এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মাটিতে নিজের রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণামূলক লড়াইয়ের গল্প। বিদেশের মাটিতে সফলতার গল্পগুলো সাধারণত শেষটা দেখেই মানুষ বিচার করে। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, পরিশ্রম আর অসংখ্য নির্ঘুম রাতের ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে বসবাসকারী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা হৃদয় শিকদারের গল্পও তেমনই এক অনুপ্রেরণার গল্প।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সংগ্রামের শুরু : উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান হৃদয়। সেখানে কিয়াংসাং ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ সম্পন্ন করার পর পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ বিষয়ে মাস্টার্স শুরু করেন। নতুন দেশ, সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে নিজের যোগ্যতায় বিদেশের মাটিতে কিছু করার স্বপ্ন ছিল ছোটবেলা থেকেই। পড়াশোনার পাশাপাশি খরচ চালাতে একটি রেস্টুরেন্টে পার্ট-টাইম কাজ শুরু করেন তিনি। হৃদয় বলেন, “প্রথম দিনগুলোতে আমি ডিশ ওয়াশিংয়ের কাজ করেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থালা-বাসন মাজা, ভাষার বাধা আর হাড়ভাঙা খাটুনি—সবকিছুই ছিল চরম চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমি কখনো কাজকে ছোট করে দেখিনি।”

ধীরে ধীরে রান্নাঘরের কাজ রপ্ত করতে শুরু করেন তিনি। কাজের প্রতি সততা ও দক্ষতার কারণে দ্রুতই কোরিয়ার বড় বড় রেস্টুরেন্টে কাজের সুযোগ চলে আসে। কয়েক বছরের মধ্যে বুসান শহরের কয়েকটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার ও হেড শেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হৃদয়। তখনই বুঝতে পারেন, ফুড বিজনেস শুধু তাঁর পেশা নয়, এটাই তাঁর ভালোবাসা। ২০২১ সালে মাস্টার্স অধ্যয়নের সময় বুসান শহরে নিজের উদ্যোগে একটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন হৃদয়। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের খাবারের স্বাদ তুলে ধরার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। রেস্টুরেন্টটি পরিচালনার মাধ্যমে তিনি আত্মবিশ্বাস পান যে আন্তর্জাতিক মানের একটি ফুড ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

অস্ট্রেলিয়া আগমন ও ‘মামস কিচেন’ টেকওভার: কোভিড-পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে হৃদয় পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। লক্ষ্য ছিল একটাই—এখানে নিজের একটি ব্যবসা দাঁড় করানো। তবে তাড়াহুড়ো না করে নিজেকে অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দক্ষ করতে কুকিং ও হসপিটালিটির বিভিন্ন প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পড়াশোনা শেষ করেই হাত দেন মূল পরিকল্পনায়। এডেলেইডে এক কোরিয়ান দম্পতির দীর্ঘ সাত বছর ধরে পরিচালিত অত্যন্ত জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট “Mum’s Kitchen” টেকওভার (মালিকানা গ্রহণ) করেন তিনি। মালিকানা নেওয়ার পর রেস্টুরেন্টটিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজান হৃদয়। যুক্ত করেন শতভাগ ‘হালাল ফুড কনসেপ্ট’। তৈরি করেন একটি অনন্য ফিউশন মেন্যু, যেখানে কোরিয়ান এবং ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবার একসাথে অত্যন্ত মানসম্মতভাবে পরিবেশন করা হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর, চলতি বছরের ৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুনরূপে যাত্রা শুরু করেছে ‘মামস কিচেন’।

সংস্কৃতির এক সুন্দর বন্ধন: বর্তমানে এডেলেইডের স্থানীয় অস্ট্রেলিয়ান এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষ প্রতিদিন ভিড় করছেন হৃদয়ের রেস্টুরেন্টে। কোরিয়ান ও বাংলাদেশি খাবারের এই মেলবন্ধন স্থানীয়দের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছে। খাবারের মাধ্যমে সংস্কৃতির এক সুন্দর মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন হৃদয়। তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য শুধু একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করা নয়। আমি চাই মানুষ এখানে এসে খাবারের মাধ্যমে দুই দেশের সংস্কৃতিকে অনুভব করুক।”

“Mum’s Kitchen শুধু একটি রেস্টুরেন্ট নয়, এটি আমার সংগ্রাম, পরিশ্রম এবং স্বপ্নপূরণের প্রতীক,”

আজ যখন তিনি পেছনে তাকান, তখন ডিশওয়াশার থেকে রেস্টুরেন্ট মালিক হয়ে ওঠার যাত্রা তাঁকে আবেগাপ্লুত করে। তাঁর ভাষায়, “এই পথচলা আমাকে শিখিয়েছে, স্বপ্ন যদি সত্যিই মন থেকে দেখা যায়, তাহলে কঠোর পরিশ্রম একদিন না একদিন সফলতা এনে দেয়।” হৃদয়ের মতে, তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি হিসেবে সম্মানের সঙ্গে নিজের পরিচয় তৈরি করা। “Mum’s Kitchen শুধু একটি রেস্টুরেন্ট নয়, এটি আমার সংগ্রাম, পরিশ্রম এবং স্বপ্নপূরণের প্রতীক,” বলেন তিনি।

নতুন প্রজন্ম ও প্রবাসীদের জন্য পরামর্শ: যারা নতুন করে প্রবাসে আসছেন বা ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে সফল এই তরুণ উদ্যোক্তার ৪টি মূল পরামর্শ:
• মানসিক দৃঢ়তা: প্রবাসের শুরুতে অনেক কঠিন পরিস্থিতি আসবে, তাই মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে।
• দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: রাতারাতি বা দ্রুত সফল হওয়ার চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
• ধৈর্য ও সততা: পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই, সততার সাথে ধৈর্য ধরে টিকে থাকতে হবে।
• ভয়কে জয় করা: ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে, সেটাকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন: হৃদয় শিকদারের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য Mum’s Kitchen-কে অ্যাডিলেডে কোরিয়ান ও বাংলাদেশি হালাল খাবারের একটি পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি চান, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিটির মানুষ এক ছাদের নিচে দুই ভিন্ন সংস্কৃতির খাবার উপভোগ করুক এবং একটি অনন্য ডাইনিং অভিজ্ঞতা লাভ করুক। জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্পর্কে জানতে চাইলে হৃদয় বলেন, “ব্যর্থতা কখনো শেষ নয়। প্রতিটি ব্যর্থতা নতুন শিক্ষা দেয়। লক্ষ্য পরিষ্কার থাকলে এবং পরিশ্রম অব্যাহত থাকলে সফলতা একদিন অবশ্যই আসে।”
তিনি আরো বলেন—

“স্বপ্ন দেখুন, পরিকল্পনা করুন এবং কাজ শুরু করুন। পথে বাধা আসবেই, কিন্তু যারা বাধাকে অজুহাত না বানিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তারাই একদিন সফল হয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন।”

Mum’s Kitchen এর ঠিকানা:
Mum`s Kitchen (엄마밥) – All About Korean Food
Address: Shop A/66 Reid Ave, Tranmere SA 5073