অঞ্জন দত্ত এবং এক প্রজন্মের স্মৃতি

বিশ্বজিৎ ঘোষ: অঞ্জন দত্ত আমাদের প্রজন্মের অনেকের কাছেই শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়, তিনি একটা সময়, একটা অনুভূতি, একটা বড় হয়ে ওঠার গল্প। ছোটবেলা থেকে তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি। তাই অঞ্জন দত্তের গান আমার কাছে শুধু গান না, অনেক স্মৃতি, অনেক অনুভূতি আর জীবনের নানা সময়ের সঙ্গী।

তাঁর গানের মধ্যে শহরের একাকীত্ব আছে, অসম্পূর্ণ প্রেম আছে, আছে বন্ধুত্ব, রাত জাগা আড্ডা, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর জীবনের প্রতি এক অদ্ভুত সৎ দৃষ্টিভঙ্গি। “বেলা বোস” এর সেই টেলিফোন বুথ, “জেরেমির বেহালা”র বিষণ্ণতা, “কাঞ্চনজঙ্ঘা”র নীরবতা কিংবা “একদিন বৃষ্টিতে”র স্মৃতিমাখা আবহ আজও ভীষণ পরিচিত লাগে।

বন্ধুত্ব নিয়ে তাঁর গানগুলোও আলাদা করে ছুঁয়ে যায়। “বন্ধুত্বের হয়না পদবি, বন্ধু তুমি কেঁদো না” এই লাইনগুলো শুনলেই ছোটবেলার বন্ধুদের কথা মনে পড়ে যায়। পাড়ার আড্ডা, হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া পরিচিত মুখ, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্ক, সবকিছু যেন আবার সামনে এসে দাঁড়ায়।

অঞ্জন দত্তের গান শুনতে শুনতে অনেক জায়গাকেও নিজের খুব চেনা মনে হয়। আমি কখনও দার্জিলিং যাইনি, কিন্তু তাঁর “দার্জিলিং” আর “কাঞ্চনজঙ্ঘা” শুনতে শুনতে পাহাড়, কুয়াশা, টয় ট্রেন আর পাহাড়ি রাস্তাগুলোকে অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগে। মনে হয়, জায়গাটা যেন কোথাও আগে দেখেছি। হয়তো তাঁর গানেই।

আজ দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড শহরে থাকি। প্রবাসের ব্যস্ততা আর দূরত্বের মধ্যে বাংলা ভাষা, বাংলা গান আর ফেলে আসা শহরের স্মৃতিগুলো অনেক সময় খুব দূরের মনে হয়। কিন্তু আজ যখন অঞ্জন দত্ত অ্যাডিলেডে এসে গান শোনালেন, মনে হলো কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও আবার নিজের শহরে ফিরে গেছি। তাঁর গান শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল ঢাকার কোনো বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, পুরোনো রাস্তা কিংবা ফেলে আসা কোনো অনুভূতি আবার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। তিনি মানুষকে তার স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নিতে পারেন। শুধু গান নয়, মানুষ হিসেবেও অঞ্জন দত্ত সবসময় আলাদা। তাঁর কথাবার্তা, অভিনয়, চলচ্চিত্র কিংবা মঞ্চ উপস্থিতি সব জায়গাতেই একটা নির্ভীক সততা আছে। তিনি যা বিশ্বাস করেন, সেটা স্পষ্টভাবে বলেন। তাই হয়তো তাঁর সেই লাইন “মিথ্যে কথা আমি বলতে যে পারিনা ভ্যাবা ভ্যাবা ভ্যাবাচ্যাকা খাই” শুধু একটা গানের লাইন নয়, বরং তাঁর পুরো শিল্পীসত্তার পরিচয়।

এই স্কেচটা তাই শুধু একজন শিল্পীর প্রতিকৃতি নয়। এটা আমার বড় হয়ে ওঠার স্মৃতি, ছোটবেলার বন্ধুদের কথা, প্রবাসে থেকেও বাংলা গানকে বুকে ধরে রাখার চেষ্টা, আর একটা প্রজন্মের পক্ষ থেকে সেই শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার ছোট্ট প্রকাশ। এই কাজের পেছনে আমার স্ত্রী মিতার উৎসাহ, ছবির ছোট ছোট বিষয় নিয়ে পরামর্শ এবং আমার মেয়ে বিণীতার ছোট্ট সমালোচনা ও পরে প্রশংসা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষ ধন্যবাদ রায়হান ভাইকে, যিনি সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন এবং স্কেচটি অঞ্জন দত্তের হাতে পৌঁছে দিতেও সাহায্য করেছেন।

লেখক: বিশ্বজিৎ ঘোষ, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ।