ম্যাকলেসফিল্ড — গত শনিবার সকালে ম্যাকলেসফিল্ডের আকাশ শুধু কুয়াশায় নয়, বরং দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার গল্পের মায়াবী আবেশে ঢাকা ছিল। ৯ মে শুরু হওয়া ‘ম্যাকলেসফিল্ড ইনঅগ্যুরাল লিটারারি ফেস্টিভ্যাল’-এর উদ্বোধনী সেশনে স্থানীয় প্রকাশনা, মুদ্রণ শিল্প এবং উদীয়মান তরুণ লেখকদের এক মিলনমেলা বসেছিল। শনিবার সকালে বইপ্রেমী, লেখক, শিল্পী ও পরিবারগুলোর মিলনমেলায় প্রাণ ফিরে পায় ম্যাকলসফিল্ড শহর। উদ্বোধন হয় ম্যাকলসফিল্ড লিটারারি ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এর, যেখানে স্থানীয় গল্প, সাহিত্য ও সৃজনশীলতাকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মুংলো পাবলিশিং এবং ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডের ওজোন হোটেলের সৌজন্যে আয়োজিত ছোটগল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা। প্রতিযোগীদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে ৫০০ শব্দের একটি গল্প তৈরি করা।
শর্ট স্টোরি প্রাইজ (বিজয়ী তালিকা)
প্রথম পুরস্কার: আমান্ডা সলি (গল্প: “ফায়ার গার্ল”)
দ্বিতীয় পুরস্কার: ক্রিস্টিন মারডক (গল্প: “কিনড্রেড স্পিরিট”)
তৃতীয় পুরস্কার: কেলি ক্লার্ক (গল্প: “গেম ওভার”)
বিশেষ পুরস্কার: জোসেফাইন হামফ্রে (গল্প: “আইল্যান্ড টাইম”)
পাঠকদের জন্য সুখবর হলো, এই বিজয়ী গল্পগুলো এবং আরও কিছু নির্বাচিত লেখা নিয়ে খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে সংকলন গ্রন্থ “ওজোন: ফায়ার গার্ল অ্যান্ড আদার স্টোরিজ”।
তরুণ লেখক উদ্যোগ (Youth Writers Initiative): ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাহিত্য প্রতিভা বিকাশে এই বিভাগটি ছিল অনন্য। “লিপ” গল্পের জন্য প্রথম পুরস্কার জিতেছেন তামিকা রেটালিক। দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন সাছিনি উইমালারত্ন (“দ্য ওয়ে শি লিভড”)। বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন লুসিয়া গ্রে এবং সান্দালি উইমালারত্ন।
শিশু-কিশোর সাহিত্য: শিশু ও কিশোর সাহিত্য ছিল সকালের অন্যতম আকর্ষণ। লেখক কেট এলিস তাঁর বই One at a Time নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে ডন অসওয়াল্ড ও মার্ক রজার্স উপস্থাপন করেন শিশুতোষ অ্যাডভেঞ্চার Waylon’s Adventures এবং তরুণ পাঠকদের জন্য লেখা Skating Through Trouble। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে কল্পনা, সাহস ও মানবিকতার গল্প—যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
শিল্প, ইতিহাস ও জীবনের গল্প: “Art, History & Health” পর্বে উঠে আসে স্মৃতি, অভিবাসন, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির নানা দিক। মারগ্রিট ওয়ার্মার তাঁর Impressions of the Heysen Trail বইয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি ও শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
রিক সারে আলোচনা করেন Life Actually: A Feast of 500-word Memories নিয়ে—যেখানে ছোট ছোট স্মৃতিচিত্রের মাধ্যমে জীবনের নানা অনুভূতি ধরা পড়েছে।
অভিবাসন ও পরিচয়ের গল্প উঠে আসে লরা ডি মার্টিনোর Cremona House – An Italian Migration Journey বইয়ে।
অন্যদিকে লিন্ডসে চাইল্ডস তাঁর Adapting to Hearing Loss বইয়ে শ্রবণশক্তি হারানোর অভিজ্ঞতা ও মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামের কথা বলেন।
লেখক ও শিল্পী মায়া উপস্থাপন করেন Bound by Compassion এবং Hahndorf: A History to Colour and Keep—যেখানে ইতিহাস ও শিল্প একসঙ্গে মিলেছে।
তরুণদের গল্প ও অদম্য শক্তি: YA Fiction বা তরুণদের সাহিত্যে ছিল রোমাঞ্চ, সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসের গল্প। আয়ান অধরা তাঁর ফ্যান্টাসি উপন্যাস Crown of Knives নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া লিসা ম্যাকমার্ট্রির Unstoppable Force: Immovable Object আধুনিক জীবনের মানসিক টানাপোড়েন ও দৃঢ়তার গল্প তুলে ধরে।
রহস্য, অপরাধ ও থ্রিলার: ক্রাইম ও থ্রিলার সেশনে দর্শকদের সামনে হাজির হন একঝাঁক জনপ্রিয় লেখক। অংশ নেন— রবার্ট কোহনে — Killer Island, জুডিথ লিস — The Silent Syringe ও The Dispatch, লিয়ান্ডা হেরিং — Beneath Her Lies, কেরি রিকস — Cage of War ও Castelle, মাইকেল আর. ব্রুকস — The Retired Country Doctor. মনস্তাত্ত্বিক রহস্য থেকে শুরু করে দ্বীপকেন্দ্রিক অপরাধকাহিনি—সব মিলিয়ে জমে ওঠে সেশনটি।
স্মৃতিকথায় জীবনসংগ্রাম: মেমোয়ার বা স্মৃতিকথা পর্বে উঠে আসে জীবনের গভীর ও আবেগঘন অভিজ্ঞতা। সান্দ্রা কান্ক তাঁর Nothing and Everything: A Childhood Memoir বইয়ে শৈশব স্মৃতির নানা দিক তুলে ধরেন। পিটার ডগলাস কথা বলেন The Longest Day of My Life বইয়ে বর্ণিত জীবনসংগ্রাম ও বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে।
এছাড়া অ্যান্ড্রু ওভেনডেন তাঁর Meet Me in the Cool Room বইয়ে মানবিক সম্পর্কের গল্প বলেন।
প্রিয়ম্বুদি সুলিস্তিয়ান্তোর Finding Captain Boodieman – Travels in Indonesia and Australia বইয়ে উঠে আসে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
আনুষ্ঠানিক বই প্রকাশ: অন্যতম আকর্ষণ ছিল ক্রেইগ চ্যাপম্যান-এর নতুন বই The Long Way Home: A Journey of Survival এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন। বইটি বেঁচে থাকা, সংগ্রাম ও আশার এক অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি। সেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ক্রেইগ চ্যাপম্যানের স্মৃতিকথা ‘দ্য লং ওয়ে হোম: আ জার্নি অফ সারভাইভাল’-এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন। প্রতিকূলতা জয় করে ফিরে আসার এই গল্প উপস্থিত দর্শকদের ভীষণভাবে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
“এই উৎসব কেবল বই নিয়ে নয়, এটি আমাদের সম্প্রদায়ের হৃদস্পন্দন,” বলছিলেন একজন দর্শক। “আমাদের চেনা রাস্তাঘাট আর হোটেলগুলো যখন সাহিত্যে উঠে আসে, তখন মনে হয় গল্পগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।”
ম্যাকলেসফিল্ড সাহিত্য উৎসবের প্রথম দিনই প্রমাণ করে দিল, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সাহিত্য মানচিত্রে এই শহর এখন এক উজ্জ্বল নাম।