পিচ ঢালা পথ, কামিনী আর রবিঠাকুর: অ্যাডিলেডের এক বিষণ্ণ সুন্দর সন্ধ্যা

মোহাম্মদ তারেক: সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শীতকাল মানেই মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি, কিন্তু আজ সকাল থেকেই আকাশটা যেন একরাশ মেঘ জমিয়ে বসে আছে। ধূসর দিগন্তের নিচে অ্যাডিলেডের ব্যস্ত শহরটাও আজ কিছুটা মন্থর। সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি, থামার কোনো লক্ষণ নেই। গুডউড রোডের ওপর দিয়ে যখন গাড়িগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন ভিজে পিচের ওপর আলোর প্রতিফলনে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি হচ্ছে। সন্ধ্যার মুখে যখন আকাশের রং গাঢ় নীল থেকে কালচে আভার দিকে যাচ্ছে, ঠিক তখনই গুডউড রোডের (Goodwood Road) বাঁকে এক অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য ধরা দিল। গুডউড রোডের মোড়টায় দাঁড়িয়ে আকাশটার দিকে তাকালে মনে হয়, মেঘগুলো যেন পাহাড়ের মতো জমে আছে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই শান্ত শহরটা বৃষ্টির দিনে আরও বেশি নির্জন হয়ে যায়। রাস্তার ধারের ক্যাফেগুলো থেকে কফির সুবাস ভেসে আসছে ঠিকই, কিন্তু বাইরের স্যাঁতসেঁতে হাওয়াটা গায়ে লাগলে মনের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। গুডউড এলাকাটি তার শৈল্পিক পরিবেশের জন্য পরিচিত।

হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় নাকে এল সেই চেনা গন্ধটা। কামিনী! এই সুদূর প্রবাসে, যেখানে টিউলিপ আর ল্যাভেন্ডারের দাপট, সেখানে এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় কামিনী ফুলের ঘ্রাণটা যেন একটা বড়সড় ধাক্কা। বাড়ির পেছনের বাগান থেকে আসা সেই সুবাস মনের পর্দাটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। মনে পড়ল কোনো এক মফস্বল শহরের পুরোনো কোঠাবাড়ি, যার জানলার নিচে ভিজে মাটিতে কামিনী ফুল ঝরে পড়ে থাকত। অ্যাডিলেডের কনকনে ঠান্ডার মাঝে এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় কামিনী ফুলের সুবাস যেন কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক, আবার ভীষণভাবে কাম্য। কোনো এক বাড়ির বাগান থেকে ভেসে আসা সেই মিষ্টি গন্ধ মনে করিয়ে দিচ্ছিল বাংলার ভাদ্রের ভেজা দুপুরকে। বিদেশের মাটিতে এই দেশি ঘ্রাণটুকু এক মুহূর্তের জন্য সময়কে থামিয়ে দেয়।

শরতের শেষলগ্নে অ্যাডিলেডের এই রূপটা অনেকটা আমাদের দেশের বর্ষাকালের কথা মনে করিয়ে দেয়। সন্ধ্যার আলো যখন নিভে আসছে, তখন গুডউডের (Goodwood) ভিজে পিচঢালা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগল মনে। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সোডিয়ামের আলোয় যখন ফুটপাতের ফলকগুলোর দিকে তাকালাম, শান্ত চোখে তাকিয়ে আছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই চিরচেনা দীর্ঘ অবয়ব, শুভ্র দাড়ি আর গভীর চোখ। বৃষ্টির ঝাপটায় চারিদিক যখন ঝাপসা, তখন ভেতরের সেই ছবিটি যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।বৃষ্টির ছাঁটে চকচক করছে একটি নাম— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গুডউডের (ওয়াক অফ ফ্রেম- কিউমিন রেষ্টুরেন্টের সামনে) এই ধুলোবালিহীন পরিচ্ছন্ন রাস্তায় কবিগুরুর প্রতিকৃতি আর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি খোদাই করা ফলকটি যেন এক টুকরো শান্তিনিকেতন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অ্যাডিলেডের এই নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় রবিঠাকুরের উপস্থিতি কাকতালীয় একটি বিষয়। চলতি পথে পথচারী যখন ছবিটি দেখে ক্ষণিকের জন্য থামেন, তখন মনে হয় কবি বুঝি এই বিদেশের বৃষ্টিকেও নিজের কলমে বেঁধে রেখে গেছেন। গুডউডের এই ছোট রাস্তায় আজ যেন শান্তি আর নস্টালজিয়া মিলেমিশে একাকার। বিদেশের যান্ত্রিক জীবনেও বাঙালির শেকড় কত গভীরে, তার প্রমাণ মেলে গুডউডের এই সন্ধ্যায়। বৃষ্টির শব্দ, কামিনীর ঘ্রাণ আর রবিঠাকুরের ছবি— এই তিন মিলে যেন এক টুকরো শান্তিনিকেতন উঠে এসেছে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে।
রাস্তার ট্রামলাইন ধরে পিচ ঢালা ভেজা পথে যখন ট্রামটি চলে গেল, তার হেডলাইটের আলোয় সেই রবিঠাকুরকে এক মুহূর্তের জন্য জীবন্ত মনে হলো। প্রশান্ত এক বিকেলের শেষে রাত নামছে অ্যাডিলেডে, কিন্তু গুডউডের সেই কোণে জ্বলে থাকা টিমটিমে আলো আর রবীন্দ্রনাথের সেই ছবিটুকু এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে মনে।

জীবনের গভীর সংকট মুহূর্তে কোনো ধ্রুবতারার দরকার হয়, এই বিদেশের মাটিতে রবিঠাকুরের ওই ছবিটা ঠিক তেমনই এক আশ্রয়। মনে হচ্ছিল, কবি যেন বলছেন— “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি।” অথচ এখন ঘোর শ্রাবণ-ঘন আঁধার। “মানুষটা চলে গেছেন বহু বছর আগে, কিন্তু গুডউডের এই ভিজে সন্ধ্যায় তাঁর ছবিটার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, তিনি এখানেই ছিলেন। বাঙালির যা কিছু বিষণ্ণতা, যা কিছু হাহাকার— সবটাই যেন ওই শান্ত চোখের মনিতে বন্দি হয়ে আছে।”

জীবনের গভীর সংকট মুহূর্তে কোনো ধ্রুবতারার দরকার হয়, এই বিদেশের মাটিতে রবিঠাকুরের ওই ছবিটা ঠিক তেমনই এক আশ্রয়। মনে হচ্ছিল, কবি যেন বলছেন— “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি।” অথচ এখন ঘোর শ্রাবণ-ঘন আঁধার। “মানুষটা চলে গেছেন বহু বছর আগে, কিন্তু গুডউডের এই ভিজে সন্ধ্যায় তাঁর ছবিটার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, তিনি এখানেই ছিলেন। বাঙালির যা কিছু বিষণ্ণতা, যা কিছু হাহাকার, সবটাই যেন ওই শান্ত চোখের মনিতে বন্দি হয়ে আছে।”

সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামছে। গুডউডের রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কমে এসেছে। বৃষ্টির দাপট একটু বেড়েছে। কামিনী ফুলের গন্ধটা এখন আরও তীব্র। রবিঠাকুরের ছবিটাকে পেরিয়ে, আমি ভিজে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন, বৃষ্টি আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের পিছু ছাড়ে না। অ্যাডিলেডের গুডউড আজ আর ভিনদেশি কোনো রাস্তা নয়, ওটা যেন বাংলাদেশের কোনো এক সিক্ত গলি, যেখানে বৃষ্টির শব্দে গান হয়ে বেজে উঠছেন স্বয়ং কবিগুরু। অ্যাডিলেডের আকাশ আজ মেঘলা হতে পারে, কিন্তু রবিঠাকুরের উপস্থিতিতে বাঙালির মনটা আজ ঠিকই ঘরে ফেরার গান গাইছে।

Write: Mohammad Tarik, Assistant Director , Department of Human Services, SA.