মাহবুব সিরাজ তুহিন: অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল বাজেট সাধারণত প্রতি বছর মে মাসে অস্ট্রেলিয়ান সরকারের Treasurer (কোষাধ্যক্ষ/অর্থমন্ত্রী) পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেন। ২০২৬-২৭বাজেটটি Treasurer জিম চালমার্স (Jim Chalmers) ফেডারেল পার্লামেন্টে ১২ মে, মঙ্গলবার, ক্যানবেরার পার্লামেন্ট হাউস থেকে অস্ট্রেলীয় পূর্ব মান সময় (AEST) সন্ধ্যা প্রায় ৭:৩০ মিনিটে উপস্থাপন করেছেন। এটি ছিল কোষাধ্যক্ষ চালমার্সের পঞ্চম ফেডারেল বাজেট এবং ২০২৫ সালে লেবার (Labor) সরকার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বাজেট। বাজেট তৈরির আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়। এরপর সরকার আয়-ব্যয়, করনীতি, মাইগ্রেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে কত অর্থ ব্যয় হবে তা নির্ধারণ করে। বাজেট পার্লামেন্টে উপস্থাপনের পর তা নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
২০২৬-২৭ অস্ট্রেলিয়ান বাজেটে মাইগ্রেশন নীতির সামগ্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার একদিকে দক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবদান রাখতে সক্ষম অভিবাসীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে সামগ্রিক নেট মাইগ্রেশন কমানোর দিকেও স্পষ্টভাবে এগোচ্ছে। মূল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বড় দিক সামনে আসে:
১. সংখ্যার চেয়ে “কোয়ালিটি” ভিত্তিক মাইগ্রেশন
যদিও স্থায়ী মাইগ্রেশন সংখ্যা ১,৮৫,০০০ রাখা হয়েছে, সরকার পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এখন “উচ্চ দক্ষতা”, “উচ্চ শিক্ষা” এবং “কম বয়সী” আবেদনকারীদের বেশি গুরুত্ব দেবে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে শুধু পয়েন্ট থাকলেই হবে না, আবেদনকারীর বাস্তব দক্ষতা, অর্থনীতিতে অবদান রাখার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এতে বোঝা যাচ্ছে:
• মাঝারি দক্ষতার আবেদনকারীদের প্রতিযোগিতা বাড়বে
• বয়স বেশি হলে বা কম দক্ষ পেশা হলে সুযোগ কিছুটা কমতে পারে
• STEM, healthcare, trades এবং priority occupation-এ সুযোগ বাড়বে
২. অনশোর আবেদনকারীদের জন্য বড় সুবিধা
বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ১,২৯,৫৯০টি স্থান অস্ট্রেলিয়ায় ইতোমধ্যে অবস্থানরত অভিবাসীদের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া।
এটার মানে:
• ছাত্র ভিসাধারী
• টেম্পোরারি স্কিলড ভিসাধারী
• গ্র্যাজুয়েট ভিসাধারী
• স্থানীয় কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মাইগ্র্যান্ট
এরা অফশোর আবেদনকারীদের তুলনায় বেশি সুবিধা পাবে। এটি মূলত অস্ট্রেলিয়ার “transition from temporary to permanent migration” মডেলকে আরও শক্তিশালী করছে।
৩. অফশোর আবেদনকারীদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হবে
মাত্র ৫৫,১১০টি অফশোর স্থানের কথা বলা হয়েছে, এবং সেগুলোর বড় অংশ “high-skilled migrants”-দের জন্য বরাদ্দ করা হবে। ফলে:
• সাধারণ skilled migration offshore pathway কঠিন হতে পারে
• কম demand occupation-এ offshore invitation কমে যেতে পারে
• Employer sponsored এবং niche skill category বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে
৪. Net Overseas Migration কমানোর চেষ্টা
সরকার সরাসরি বলেছে এই পদক্ষেপ “net overseas migration”-এর উপর downward pressure তৈরি করবে। এর মানে:
• নতুন বিদেশি আগমন সীমিত করা
• Temporary migration pathways কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা
• WHM (Working Holiday) program tighter করা
• অনশোর transition বাড়ানো
সরকার মূলত housing crisis, infrastructure pressure এবং living cost concern সামাল দিতে migration growth নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
৫. Trades পেশাজীবীদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন
Electrician, plumber সহ trade occupation-এর জন্য বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ:
• Skills assessment দ্রুত হবে
• Licensing pathway সহজ হতে পারে
• Overseas qualification recognition উন্নত হবে
• Onshore trade workers দ্রুত workforce-এ প্রবেশ করতে পারবে
বিশেষ করে যারা Australia-তে trade background নিয়ে আছেন, তাদের জন্য এটি বড় ইতিবাচক সংকেত।
৬. Skills Assessment system আরও কঠোর কিন্তু স্বচ্ছ হবে
Assessing Authorities-এর উপর বেশি নজরদারি মানে:
• Processing accountability বাড়বে
• Inconsistent assessment কমতে পারে
• Fraud detection বাড়বে
• Transparency বৃদ্ধি পাবে
তবে একই সঙ্গে assessment standard কিছু ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে পারে।
৭. অ্যাডাল্ট মাইগ্রেন্ট ইংলিশ প্রোগ্রাম
বাজেটে অ্যাডাল্ট মাইগ্রেন্ট ইংলিশ প্রোগ্রাম (AMEP) সংস্কারের পরিকল্পনার কথা আরও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে; কোষাধ্যক্ষ জিম চালমার্স বর্তমান ব্যবস্থাটিকে সংস্কারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বলে বর্ণনা করেছেন।
২০২৯ সাল থেকে, নতুনভাবে ডিজাইন করা এই ইংরেজি ভাষা প্রোগ্রামটি আরও নমনীয় পাঠদান এবং শিক্ষার্থী সহায়তা পরিষেবা প্রদান করবে, যার লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং সামাজিক সংহতি উন্নত করা। এই আধুনিক প্রোগ্রামটি মূলত সেইসব অভিবাসীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হবে যাদের ইংরেজি ভাষার সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
অভিবাসন ব্যবস্থার অখণ্ডতা আরও জোরদার করার পদক্ষেপ হিসেবে, সরকার অনশোর (দেশের ভেতরে) এবং অফশোর (দেশের বাইরে) উভয় ধরনের স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনের কঠোর তদারকির জন্য চার বছরে ১৯.৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।
সার্বিক মূল্যায়ন
এই বাজেটের মাইগ্রেশন নীতিকে “Selective Skilled Migration Model” বলা যায়।
সরকারের বার্তা খুব পরিষ্কার: “কম সংখ্যক কিন্তু বেশি দক্ষ, তরুণ, অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর এবং অস্ট্রেলিয়ায় ইতোমধ্যে ইন্টিগ্রেটেড মাইগ্র্যান্ট চাই।” সবচেয়ে লাভবান হতে পারেন:
• Onshore skilled migrants
• Australian graduates
• Trade professionals
• High-demand occupation workers
• Younger skilled applicants
চাপ বাড়তে পারে:
• Offshore general skilled applicants
• Low-demand occupation applicants
• কম স্কিল বা কম যোগ্যতার আবেদনকারীদের উপর
সামগ্রিকভাবে এটি migration বন্ধ করার বাজেট নয়; বরং migration-কে আরও targeted, controlled এবং economically focused করার বাজেট।
২০২৬- ২৭ মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম: বাজেট পেপার থেকে:
সরকার ২০২৬–২৭ সালের স্থায়ী মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পরিকল্পিত সংখ্যা ১,৮৫,০০০ স্থানে নির্ধারণ করবে এবং এর মধ্যে ১,৩২,২৪০টি স্থান (৭০ শতাংশের বেশি) স্কিল স্ট্রিমে বরাদ্দ করবে। স্থায়ী মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের স্কিল ও ফ্যামিলি — উভয় স্ট্রিমেই সরকার অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে অবস্থানরত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেবে। এ জন্য ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য ১,২৯,৫৯০টি স্থান বরাদ্দ করা হবে এবং অতিরিক্ত ৩০০টি স্থান “Special Eligibility” ক্যাটাগরির জন্য রাখা হবে। বাকি ৫৫,১১০টি অফশোর স্থান মূলত উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসীদের দেওয়া হবে, যারা অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে। এই পদক্ষেপের ফলে নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন কমার সম্ভাবনা থাকবে।
সরকার স্থায়ী মাইগ্রেশনের পয়েন্টস টেস্টে সংস্কার আনবে, যাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সক্ষম অভিবাসীদের আরও কার্যকরভাবে নির্বাচন করা যায়। বর্তমানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্থায়ী স্কিলড মাইগ্র্যান্ট পয়েন্টস-ভিত্তিক ভিসার মাধ্যমে নির্বাচিত হন। নতুন পদ্ধতিতে আরও শিক্ষিত, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন এবং তুলনামূলক কম বয়সী আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সরকার Working Holiday Maker (WHM) প্রোগ্রামেও সংস্কার আনবে, যাতে আবেদনকারীর সংখ্যা আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কমানো যায়, WHM ভিসা বণ্টন আরও ন্যায়সঙ্গত করা যায় এবং অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা যায়। এর অংশ হিসেবে WHM প্রোগ্রামে ব্যালট পদ্ধতির ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে, যাতে প্রোগ্রামটি আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
অভিবাসীদের দক্ষতার স্বীকৃতি দ্রুত ও আরও নমনীয়ভাবে দেওয়ার জন্য সরকার ২০২৬–২৭ সাল থেকে চার বছরে ৮৫.২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করবে, যা Department of Employment and Workplace Relations পরিচালনা করবে। এর মধ্যে রয়েছে:
২০২৬–২৭ সাল থেকে চার বছরে ৭৫.১ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে Trades Recognition Australia (TRA)-এর জন্য একটি আধুনিক স্কিলস অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম চালু করা হবে, যাতে পেশাগত লাইসেন্সিং আরও সহজে সংযুক্ত করা যায়। এর মধ্যে রাজ্য ও টেরিটরিগুলোর সঙ্গে কাজ করে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বারের মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ট্রেড পেশার জন্য দ্রুত অ্যাসেসমেন্ট-থেকে-লাইসেন্সিং পথ চালুর পাইলট প্রকল্প থাকবে। এই খরচ ভবিষ্যতে বিদ্যমান ফি ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হবে।
২০২৬–২৭ সাল থেকে তিন বছরে ৫.৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে TRA অনশোর ভিসাধারীদের জন্য নতুন স্কিলস অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করবে, যাতে তাদের বিদ্যমান যোগ্যতা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা স্বীকৃতি পায় এবং তারা কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণে অংশ নিতে পারেন। এই খরচও ভবিষ্যতে নতুন ফি কাঠামোর মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হবে।
২০২৬–২৭ সাল থেকে চার বছরে ৪.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে Assessing Authorities-এর উপর নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা হবে, যাতে আরও ভালো পারফরম্যান্স, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এর অংশ হিসেবে ২০২৭ সাল থেকে প্রতিটি Assessing Authority-কে বার্ষিক Performance Report প্রকাশ করতে হবে।