নগরনটী থেকে হানি ট্র্যাপ কুহকের ইতিহাস, ডিজিটাল প্রতারণার নতুন মুখ

নাজমীন মর্তুজা: নগরনটী হলো মায়া ও বাসনার সংযোগস্থল। মানুষ, মোহ ও মায়ার বাজারও বলা যায় । নগরনটী আসলে শুধু একজন নারী নয়। নগরনটী একটি প্রতীক। সে প্রতীক মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা , মানুষ জানে বোঝে সামনে আগুন তবুও হাত বাড়ায়।
মানুষ এই প্রতীক বা মোহের পেছনে ছোটে যা সত্যকে নয় সত্যের সাজানো সংস্করণকে ভালোবাসে। মানুষের ভেতরে দুটি শক্তি সবসময় কাজ করে একটি তাকে টানে স্থিতির দিকে যেখানে নৈতিকতা, দায়িত্ব, সম্পর্ক, দীর্ঘমেয়াদি অর্থ। আরেকটি টানে উত্তেজনার দিকে নতুনত্ব,কামনা,স্বীকৃতি,অহংকারের তৃপ্তি। আর নগরনটী সিনড্রোম হলো এই দ্বিতীয় শক্তির বহির্প্রকাশ। মানুষের দুর্বলতা নতুন কিছু নয় সহজাত প্রবৃত্তি! নতুন হলো তার প্ল্যাটফর্ম।
একসময় নগরের অলিগলিতে যে কুহক বাস করত, আজ তা চলে এসেছে হাতের মুঠোয় মোবাইল স্ক্রিনে, ইনবক্সে, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টে, ভিডিও কলে, ফিল্টার করা ছবিতে, সাজানো গল্পে।

তবে ইতিহাসের প্রতি ন্যায় করতে হলে একটি কথা শুরুতেই বলা জরুরি অতীতের নগরনটী তাওয়াইফ, বাইজি বা গণিকাদের আমরা আজকের চোখে বিচার করলে ভুল হবে।
মুঘল আমলে তাওয়াইফরা শুধু ভোগের বস্তু ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন রিফাইন্ড কালচারের ধারক। তাঁদের আখড়ায় শিখানো হতো সঙ্গীত, নৃত্য, কাব্য, ভাষা, আচার, কথোপকথনের সৌন্দর্য। অনেক নবাব, জমিদার, এমনকি রাজনীতিকও সেখানে যেতেন কেবল শরীরী আকর্ষণের জন্য নয় সংস্কৃতি, শিল্প আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্যও।

পেয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া গানটির কথা মনে আছে তো সবার , না থাকার কোনো কারণ নেই এসব লিরিক ইতিহাসকে সম্বৃদ্ধ করে রাখবে জেনারেশন টু জেনারেশন । সেই আনারকলি নামটি কিংবদন্তির আলোয় ঘেরা। ইতিহাস আর লোককথার সীমারেখা ঝাপসা হলেও, তিনি মুঘল দরবারে সৌন্দর্য, প্রেম ও ট্র্যাজেডির প্রতীক হয়ে আছেন।
বেগম সমরু এক অনন্য চরিত্র নৃত্যশিল্পী থেকে ক্ষমতাবান শাসক; কূটনীতি, সামরিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেন।
গওহর জান ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে এক বিপ্লবী নাম ভারতের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ডিং শিল্পীদের একজন। তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা, মাই নেম ইজ গওহর জান, আজও সঙ্গীত ইতিহাসে অমর।
নটী বিনোদিনী বাংলা নাট্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। থিয়েটারের জন্য তাঁর শ্রম, শিল্পবোধ ও আত্মত্যাগ তাঁকে কিংবদন্তি করে তুলেছে।
মালকা জান এবং তাঁর কন্যা জাদ্দানবাই সংগীত ও পারফর্মিং আর্টসে গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
রসুলান বাই, বেগম আখতার ঠুমরি, দাদরা, গজলকে জনমানসে পৌঁছে দিয়েছেন। গাঙ্গু বাই কে তো সন্জয়লীলা নতুন রূপেই চিহ্নিত করেছেন তাঁর সিনেমার গল্পে । রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সাফল্যের সাক্ষী থেকেছেন তাঁর সাহসী ব্যক্তিত্ব। বাঘা বাঘাদের সাথে লড়েছেন বুদ্ধিদীপ্তি দেখিয়ে ।

এই নারীরা সমাজের চোখে প্রান্তিক ছিলেন, কিন্তু সংস্কৃতির ইতিহাসে প্রান্তিক নন। ভীষণ সাহসী এবং সংবেদনশীল, সংগ্রামী এবং রুচিশীল ,সংস্কৃতির চর্চা করতেন । তার নজির আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টোতেই দেখতে পাই ।
অন্ধকার গলিতে থেকেও তাঁরা শিল্পের আলো জ্বালিয়েছেন।
অপমানের ভেতর থেকেও মর্যাদা সৃষ্টি করেছেন। তাঁদের পেশা বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু তাঁদের শিল্প, মেধা, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক অবদান অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু আজকের সময় অন্যরকম।
আজ আর কাউকে নগরের অন্ধকার গলিতে যেতে হয় না।
ফাঁদ নিজেই এসে দরজায় কড়া নাড়ে। একটি হাই একটি ইনবক্স, একটি রিল, একটি সুন্দর ছবি , কিংবা একটি মিষ্টি কথার হতে পারে কবিতা গানের ক্লিপ , বয়স এতটুকুই যথেষ্ট।
এখানেই অতীত আর বর্তমানের মৌলিক পার্থক্য।

আগেকার অনেক নগরনটি অন্তত একটি শিল্পচর্চার, নন্দনতত্ত্বের, কিংবা সামাজিকসফিস্টিকেশনের প্রতিনিধিত্ব করতেন। একটা ক্লাস ছিল । স্ট্যান্ডার্ড ছিল ।
আজকের বহু হানি ট্র্যাপের কেন্দ্রবিন্দু শিল্প নয় ম্যানিপুলেশন। কথার মায়াজাল , পোশাক পরিচ্ছদের শো আপ , জীবন যাপনের আধুনিকতার ঝলক , এখানে অ্যাট্রাকশনকে ওয়েপন হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

সমস্যা শুধু প্রলোভনে নয়। সমস্যার গভীরতা প্রতারণার পরিশীলিত কৌশলে।
আজকের হানি ট্র্যাপ কেবল শরীর দিয়ে কাজ করে না এটি কাজ করে মনস্তত্ত্ব দিয়ে। প্রথমে ভ্যালিডেশন, তারপর ইমোশনাল বন্ডিং, তারপর ডিপেন্ডেন্সি, তারপর কন্ট্রোল। এই ধাপ গুলো ভীষণ সচেতন ভাবে এরা পার করতে সাহায্য করে ।
মানুষ ভাবে এই মানুষটা আমাকে বুঝছে। ভাবতে ভাবতে সে ভুলে যায় সে আসলে একজন মানুষকে নয়, বরং কেয়ারফুলি কিউরেটেড একটি পারসোনাকে বিশ্বাস করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা মানুষকে দেখি না আমরা দেখি মানুষ যা দেখাতে চায়।
সেখানেই বিপদ।
একজন ভদ্র, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত মানুষও এই ফাঁদে পড়তে পারেন। কারণ প্রতারণা বোকাদের জন্য তৈরি হয় না বরং তৈরি হয় মানুষের দুর্বল মুহূর্তের জন্য। একাকীত্ব, অপূর্ণতা, অস্বীকৃতি, বয়সজনিত ইনসিকিউরিটি, সম্পর্কের ক্লান্তি এই ফাটলগুলোর ভেতর দিয়েই হানি ট্র্যাপ ঢুকে পড়ে। আর একবার ঢুকে গেলে ক্ষতি শুধু অর্থের নয়। হারিয়ে যায় মান। হারিয়ে যায় সম্মান। হারিয়ে যায় ট্রাস্ট। অনেক সময় হারিয়ে যায় আত্মপরিচয়ও।
একটি স্ক্রিনশট, একটি কল রেকর্ডিং, একটি প্রাইভেট ছবি এক সেকেন্ডের ভুলকে আজীবনের জিম্মিদশায় পরিণত করতে পারে।
আমরা মিথিলা কিংবা প্রভাকে দেখেছি কি করে তিলে তিলে মানষিক রোগী করে তুলেছে কিছু অসভ্য মানুষ । ডিজিটাল যুগের নির্মমতা এখানেই ভুলের স্থায়িত্ব এখন প্রায় চিরস্থায়ী।
আগে ভুলের সাক্ষী ছিল কয়েকজন , এখন তার সাক্ষী হতে পারে হাজার, লাখ, কখনো কোটি মানুষ। মানুষ ভিউ বাড়ায় , লাইক কমেন্ট সিক করেন । কিচ্ছু যায় আসে না , মানুষের মানসিকতার সম্মান করা , বা সহানুভূতিশীল হওয়ার । সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো অনেক সুন্দর ঘর-সংসার ভেঙে যাচ্ছে এমন কিছুর কারণে, যা শুরু হয়েছিল সামান্য কিউরিওসিটি থেকে।
একটি ইনোসেন্ট কথোপকথন, একটু ইমোশনাল এস্কেপ, সামান্য অ্যাটেনশন ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে অ্যাডিকশন। আস্তে আস্তে নেশাগ্রস্থ হয় মানুষ । কান্ড জ্ঞান লোপ পায় ।

এখানে প্রশ্ন আসে এই অবক্ষয় রোধ করা যায় কীভাবে?
সমস্যা থাকলে সমাধানের উপায় অবশ্যই থাকে ।
প্রথমত, ডিজিটাল লিটারেসি এখন বিলাসিতা নয় এটি আত্মরক্ষার দক্ষতা। সবাইকে বুঝতে হবে অনলাইনে ট্রাস্ট করতে হলে ভেরিফিকেশন জরুরি। যা দেখা যায় তা সবসময় সত্য নয় । বাজার সাজানো পণ্যের মতো হতে পারে ।

দ্বিতীয়ত, ইমোশনাল ডিসিপ্লিন দরকার। যে মানুষ নিজের শূন্যতা চেনে না, যে নিজের সীমাবদ্ধতা নিজের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ব্যপারে উদাসীন সে খুব সহজে বাহ্যিক ভ্যালিডেশনের শিকার হয়।
তৃতীয়ত, পরিবারে কমিউনিকেশন বাড়াতে হবে। অনেক মানুষ বাইরে ট্র্যাপে পড়ে, কারণ ঘরের ভেতরের গোপনতা তারা শোনায় না, বোঝা যায় না কোন মানষিক দ্বন্দ্বে মানুষ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে ।
ভবিষ্যৎ আরও জটিল হতে যাচ্ছে। ডিপ ফেইক এআই ,জেনারেটেড ভয়েস, সিনথেটিক ইনটিমেসি প্রতারণা আরও সফিস্টিকেটেড হবে।
তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তি নয় মানবিক সতর্কতা।

শেষ পর্যন্ত, প্রলোভন পৃথিবী থেকে যাবে না।
অতীতে তার রূপ ছিল নগরনটি।
আজ তার নাম আধুনিক শব্দে হানি ট্র্যাপ।
আগামীকাল হয়তো নাম বদলাবে আবার। কিন্তু মূল ফাঁদ একই
মানুষের অচেনা ক্ষুধা, অচেনা শূন্যতা, আর অচেনা মোহ।
প্রলোভনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ বাইরে নয়, নিজেদের ভেতরে তৈরি করতে হয়। কারণ যে মানুষ নিজের মূল্য বোঝে, নিজের সীমা জানে, এবং মুহূর্তের উত্তেজনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মর্যাদাকে বড় মনে করে তাকে ফাঁদে ফেলা সবচেয়ে কঠিন। নগরনটী কেবল আয়না।
সে দেখিয়ে দেয়,
মানুষ আসলে কোথায় দুর্বল, কোথায় নগ্ন, কোথায় অপূর্ণ।
মোহের দর্শন হলো মানুষ নিজের অজানা অংশের কাছেই সবচেয়ে বেশি বন্দী হয়।
প্লেটোর ভাষায় বললে, আমরা অনেক সময় বাস্তবকে নয়, ছায়াকে ভালোবাসি।
নগরনটী সেই ছায়া যেখানে মানুষ প্রকৃত ইনটিমেসি নয়, ইনটিমেসি এর ইলিউশন কিনে।
বৌদ্ধ দর্শনে তৃষ্ণা ক্রেভিং হলো দুঃখের মূল। নগরনটী সেই তৃষ্ণার বাজার।
এখানে শরীর বিক্রি হয়, কিন্তু আরও বেশি বিক্রি হয় কল্পনা, ফ্যান্টাসি, ইগো, অনুমোদন ।

সুফি দর্শনে দুনিয়াকে বলা হয় এক পরীক্ষার ময়দান। যা ঝলমলে, তা সবসময় সত্য নয়।
যা মধুর, তা সবসময় কল্যাণকর নয়।
এই দৃষ্টিতে নগরনটি হলো দুনিয়ার চাকচিক্যের রূপক। সে জিজ্ঞেস করে
তুমি কি তোমার নফস এর দাস, নাকি চেতনার অধিপতি?