শীতের শহর অ্যাডিলেড। জুলাইয়ের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। বাইরে ঠান্ডা বাতাস, ধূসর আকাশ আর কুয়াশার হালকা পর্দা। কিন্তু শহরের একটি কমিউনিটি হলের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই যেন ঋতু বদলে যায়। লাল-সাদা শাড়ি, রঙিন পাঞ্জাবি, শিশুদের হাসি, বাংলায় কুশল বিনিময়, পরিচিত মুখের উচ্ছ্বাস—মুহূর্তেই মনে হয়, বাংলাদেশ আসলে কখনো দূরে সরে যায় না। মানুষই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও বাঙালির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এই—সে উৎসবকে হারিয়ে যেতে দেয় না। বরং সময়, দূরত্ব আর ভৌগোলিক সীমারেখাকে অতিক্রম করে নতুন দেশে নতুন করে গড়ে তোলে নিজের সাংস্কৃতিক ঠিকানা। সেই ঠিকানার নামই দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশি কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন (SABCA)।
ঈদ পুনর্মিলনী ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে আয়োজিত তাদের ২২তম বার্ষিক উৎসব শুধু একটি কমিউনিটি অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল স্মৃতি, শেকড়, পরিচয় আর ভবিষ্যৎকে একই সুতোয় গেঁথে রাখার এক আন্তরিক প্রয়াস। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন সাউথ অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশি কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন (SABCA)-এর উদ্যোগে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘SABCA ঈদ উৎসব এবং বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন’। স্থানীয় সময় শনিবার (৪ জুলাই, ২০২৬) প্রবাসের মাটিতে যেন নেমে এসেছিল মিনি বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুলের শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের চমৎকার এবং প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। নতুন প্রজন্মের এই খুদে শিল্পীদের গান, নাচ, এবং চমৎকার উপস্থাপনা পুরো অনুষ্ঠানস্থলে এক টুকরো বাংলাদেশের আবহ তৈরি করে। বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুলের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, নাচে লোকজ বাংলার ছোঁয়া, আবার কেউ সাবলীল বাংলায় উপস্থাপনা করছে। দর্শকসারিতে বসে থাকা অভিভাবকদের চোখে তখন গর্বের ঝিলিক। এই শিশুরা অনেকেই বাংলাদেশের মাটিতে বড় হয়নি, কিন্তু বাংলা ভাষা, গান আর সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের পরিচয় গড়ে উঠছে প্রবাসের এই ছোট্ট সাংস্কৃতিক পরিসরেই।
এই সফল আয়োজনের পেছনে স্কুলটির শিক্ষক, অভিভাবক ও স্বেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগের জন্য তাদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
পূর্ব নির্ধারিত ব্যস্ততার কারণে বহুসংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নাদিয়া ক্ল্যান্সি এমপি, বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাশটন হার্ন এমপি এবং সাবেক বহুসংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী জিং লি অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে অলঙ্কৃত করেন চার্লস স্টার্ট সিটির মেয়র এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘদিনের অকৃত্রিম বন্ধু মেয়র অ্যাঞ্জেলা ইভান্স। সাথে ছিলেন SABCA-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ তারিক, সংগঠনটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. এ.বি.এম. আলাউদ্দিন তালুকদার, বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুলের প্রিন্সিপাল আজমল হক পাপ্পু, বার্ষিক স্মারক ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক ও আমাদের কথা অষ্ট্রেলিয়ার প্রধান সম্পাদক মাহবুব সিরাজ তুহিন এবং স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ‘ডিস্টিনক্টিভ হোমস’-এর প্রতিনিধি রুমন তৈমুর।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে SABCA-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ তারিক সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এরপর মেয়র অ্যাঞ্জেলা ইভান্স তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সিটি অব চার্লস স্টার্টের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

চেয়ারম্যান মোহাম্মদ তারিক তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন, প্রবাসে একটি কমিউনিটি সংগঠনের কাজ কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, মানুষে মানুষে সম্পর্কের সেতুবন্ধন গড়ে তোলা এবং একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মেয়র অ্যাঞ্জেলা ইভান্সও বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের প্রশংসা করেন এবং বহুসাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়া নির্মাণে তাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুলের অধ্যক্ষ আজমল হক পাপ্পু তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা শেখানো মানে কেবল একটি ভাষা শেখানো নয়; বরং একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি এবং একটি পরিচয়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা। তাঁর কথায় যেন ধরা পড়ে বহু অভিভাবকের অদৃশ্য উদ্বেগ—সন্তান যেন বাংলাকে ভুলে না যায়।
এবারের উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল SABCA-এর বার্ষিক স্মারক ম্যাগাজিনের আনুষ্ঠানিক উন্মোচন। পরিবেশগত স্থায়িত্ব রক্ষা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের কথা মাথায় রেখে সংগঠনটি এবার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাগজের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশের ক্ষতি হ্রাস করার লক্ষ্যে SABCA-এর ২২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ স্মারক ম্যাগাজিন’ উদ্বোধন করা হয়। মেয়র অ্যাঞ্জেলা ইভান্স ও ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক মাহবুব সিরাজ তুহিন এই হাইব্রিড ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের ঘোষণা দিয়ে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করেন। এই ডিজিটাল প্রকাশনাকে সমৃদ্ধ করতে যাঁরা লেখা, কবিতা ও স্মৃতিচারণ পাঠিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ জানানো হয়। এটি শুধু একটি প্রকাশনা নয়; প্রবাসজীবনের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, সাহিত্যচর্চা, সৃজনশীলতা এবং কমিউনিটির ইতিহাস সংরক্ষণের এক মূল্যবান দলিল।

SABCA-এর ২২তম বার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক মিলনমেলায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘আমাদের কথা অষ্ট্রেলিয়া’ (Amader Kotha Australia)-এর গৌরবময় উপস্থিতি, যা এবারের উৎসবের অফিসিয়াল মিডিয়া পার্টনার হিসেবে অনুষ্ঠানটিকে দেশ ও প্রবাসের পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের কথা অষ্ট্রেলিয়ার প্রধান সম্পাদক মাহবুব সিরাজ তুহিন তাঁর বক্তব্যে ‘আমাদের কথা অষ্ট্রেলিয়া’র পত্রিকার পাঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং লেখা, গল্প ও কবিতা পাঠিয়ে যাঁরা এই উদ্যোগকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি আরো বলেন এটি কেবল একটি সংবাদপত্রই নয়, ‘আমাদের কথা’ মূলত অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের জীবনযাত্রার এক জীবন্ত দলিল। পারস্পরিক সংযোগ তৈরি, তথ্য আদান-প্রদান এবং উদযাপনের গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রকাশনাটি প্রবাসীদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার জীবনের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। ‘আমাদের কথা’ পত্রিকার মূল লক্ষ্য ও দর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই গণমাধ্যমটি বাংলাদেশী-অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রদায়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যেখানে প্রবাসীদের দ্বৈত পরিচয়ের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো অন্বেষণ করা হয়। তৃণমূলের উদ্যোগ থেকে শুরু করে এই উৎসবের মতো বড় আকারের মেলা—সবকিছুরই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে এবং প্রবাসে অর্জিত সাফল্য ও ইতিহাসের এক একটি আর্কাইভ বা ঐতিহাসিক রেকর্ড হিসেবে ‘আমাদের কথা’ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

স্পন্সর ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা: SABCA-এর ২২তম বার্ষিকী, বাংলা নববর্ষ ও ঈদ পুনর্মিলনীর এই বিশাল আয়োজনকে সফল করতে যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও নানাভাবে সহযোগিতা করেছে, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে প্রধান স্পন্সর ‘ডিস্টিনক্টিভ হোমস’, বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুল, সাউথ অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টি, মিডিয়া পার্টনার ‘আমাদের কথা’, ড্রাইভওয়াইজ এসএ, মেক্সিম অস্ট্রেলিয়া, সানবিম ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ব্রিকওয়ার্কস মেডিকেল সেন্টার এবং ডিপার্টমেন্ট অব দ্য প্রিমিয়ার অ্যান্ড ক্যাবিনেটসহ সকল দাতা ও স্টল মালিকদের ধন্যবাদ জানানো হয়। স্পন্সরশিপ সংগ্রহ ও অনুষ্ঠান সমন্বয়ে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রাখায় ড. এ.বি.এম. আলাউদ্দিন তালুকদারের বিশেষ প্রশংসা করা হয়।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন দ্বিতীয় পর্বের পর্দা উঠল, তখন হলরুম জুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। কিন্তু সে নীরবতা ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। প্রবাসী বাঙালিদের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে, তাঁদের শিকড়ের টানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে মঞ্চে হাজির হলেন আমাদের দলের গুণী শিল্পীরা। তাঁদের সুরের জাদুতে মুহূর্তের মধ্যেই মেতে উঠলেন উপস্থিত প্রবাসী দর্শকেরা। চমৎকার সব একক ও দ্বৈত পরিবেশনায় সাজানো এই সাংস্কৃতিক পর্বটি শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি যেন হয়ে উঠেছিল সুদূর প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ।
মঞ্চে এক এক করে পরিবেশিত দেশের গান ও মাটির সোঁদা গন্ধ মাখা লোকসংগীতের তালিকাটি ছিল এক কথায় অনবদ্য ও দারুণ আকর্ষণীয়:
সব সখীরে পার করিতে (সুদীপ্ত কর্মকার ও রত্না সাহা): উৎসবের লোকজ আমেজকে এক ধাক্কায় দ্বিগুণ করে তুলতে মঞ্চে আসেন সুদীপ্ত কর্মকার ও রত্না সাহা। তাঁদের চমৎকার ও মেলবন্ধনে ভরা দ্বৈত কণ্ঠে যখন এই কালজয়ী লোকগানটি ভেসে এলো, তখন পুরো হলরুম যেন গ্রামীণ বাংলার কোনো এক চেনা নদীর ঘাটে রূপ নিলো।
ওরে নীল দরিয়া (নয়ন রায়): আব্দুল জব্বারের গাওয়া এই অমর ও কালজয়ী গানটি ছাড়া প্রবাসীদের আবেগ যেন অপূর্ণ থেকে যায়। শিল্পী নয়ন রায়ের দরদভরা কণ্ঠে যখন গানটি বাজছিল, তখন হলভর্তি দর্শকদের চোখ ভিজে উঠছিল পরম মমতায়। ঘরের টানে ব্যাকুল প্রবাসীরা নিমেষেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন, ফিরে যান তাঁদের ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোতে।
বন্ধু বিনা প্রাণ বাঁচে না (রত্না সাহা): বিরহ আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মায়াজাল বুনেছিলেন শিল্পী রত্না সাহা। তাঁর একক কণ্ঠের এই চমৎকার ও দরদী পরিবেশনাটি উপস্থিত শ্রোতাদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন সেই সুর।
মা গো মা (সুদীপ্ত কর্মকার): প্রবাসে বসে মায়ের জন্য আকুলতা কার না থাকে? সুদীপ্ত কর্মকারের গভীর ও আবেগঘন গায়কীতে যখন “মা গো মা” গানটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন হলরুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। এই গানটি প্রবাসীদের হৃদয়ের সবচেয়ে নরম কোণে আঘাত করে এবং এক গভীর আবেগের আবহ তৈরি করে।
বন্দে মায়া লাগাইছে (নিশি): বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের এই চিরসবুজ ও জনপ্রিয় গানটি নিয়ে মঞ্চে আসেন শিল্পী নিশি। নিজের চেনা ঢঙে, দারুণ এনার্জি আর সাবলীলতায় তিনি গানটি পরিবেশন করেন, যা দর্শকদের মাঝে এক অন্যরকম আনন্দের দোলা দিয়ে যায়।
ওরে চিকন কালা (তারিক আনজাম): তারিক আনজামের ভরাট কণ্ঠের জাদুতে এই গানটির সুরের ডালি দর্শকদের মনের গভীরে পৌঁছে যায়। তাঁর চমৎকার পরিবেশনা উপস্থিত সবাইকে এতটাই আলোড়িত করেছিল যে, পুরো হলরুম মুখরিত হয়ে উঠেছিল দর্শকদের করতালি আর উল্লাসে।
আমার মন মজাইয়া রে (সুদীপ্ত কর্মকার): অনুষ্ঠানের একেবারে শেষলগ্নে এসে সুদীপ্ত কর্মকার আবারও মঞ্চ মাতান এই চেনা লোকসংগীতটি দিয়ে। তাঁর কণ্ঠের জাদুকরী স্পর্শে পুরো হলরুমের সুরের আবহাওয়া এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। দর্শক-শ্রোতারা যেন গানের মাঝেই নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন।
গানগুলো শুধু কণ্ঠের জোরেই নয়, বরং বাদ্যযন্ত্রের নিখুঁত সংগত ছাড়া এতটা শ্রুতিমধুর হয়ে উঠতো না। শিল্পীদের প্রতিটি সুরকে আরও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন নেপথ্যের যন্ত্রশিল্পীরা। লিপন সাহার বাঁশির মন মাতানো ও উদাসী সুর যেন বুকের ভেতর হাহাকার তুলছিল, সুদীপ্ত চক্রবর্তীর তবলার ছন্দময় বোল পুরো হলরুমকে নাচিয়ে তুলছিল, আর ড. তাসমিরুল জলিল তন্ময়ের গিটারের মায়াবী তারের তান পুরো পরিবেশনার সাথে আধুনিক ও ধ্রুপদী আবেগের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিল। সুর আর বাদ্যের এই যুগলবন্দী শুধু প্রবাসীদের বিনোদনই দেয়নি, বরং কয়েক ঘণ্টার জন্য তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রিয় মাতৃভূমির কোলে। অনুষ্ঠান শেষ হলেও সেই সুরের রেশ যেন দর্শকদের মনে রয়ে গেল এক দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হয়ে।
অ্যাডিলেডের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘প্রবাসী’ এবং ‘তাল অষ্ট্রেলিয়া’-এর সুরের মূর্ছনায় মেতে ওঠেন প্রবাসী দর্শকেরা। বিশেষ করে ব্যান্ড ‘প্রবাসী’র শিল্পীদের একে একে পরিবেশন করা জনপ্রিয় গানগুলো দর্শকদের স্মৃতিকাতর ও উজ্জীবিত করে তোলে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে ব্যস্ত যান্ত্রিকতার মাঝে এ যেন ছিল এক টুকরো চেনা বাংলাদেশ, এক পশলা সংস্কৃতির বৃষ্টি। গভীর রাত পর্যন্ত হলভর্তি দর্শক গান উপভোগ করেন এবং করতালি দিয়ে শিল্পীদের উৎসাহিত করেন।

বিশেষ করে ব্যান্ড ‘প্রবাসী’র দুর্দান্ত ও প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স পুরো হলরুমে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করে। তাদের গানগুলো দর্শকদের একই সাথে স্মৃতিকাতর ও দারুণভাবে উজ্জীবিত করে তোলে। একের পর এক পরিবেশিত জনপ্রিয় গানের বিবরণ এবং শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো:
তারায় তারায় (কণ্ঠ: পিয়াস): জেমসের কালজয়ী এই রক গানটি দিয়ে পিয়াস যখন মঞ্চে আসেন, তরুণ প্রজন্মের দর্শকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। গানটির দুর্দান্ত ড্রামস ও গিটার কর্ডের সাথে পুরো হলের দর্শক সমস্বরে গেয়ে ওঠেন।
পুরানো সেই দিনের কথা (কণ্ঠ: রামীন): ‘প্রবাসী ফিচারিং নিউ জেনারেশন’। মূলত প্রবাসের মাটিতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের বাংলা গানের চিরচেনা সুর আর ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই বিশেষ উদ্যোগ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চিরন্তন গানটি রামীন যখন তাঁর মায়াবী কণ্ঠে পরিবেশন করছিলেন, তখন মিলনায়তনে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। অনেক প্রবীণ প্রবাসীর চোখে এ সময় স্মৃতিকাতরতার জল দেখা যায়। সুদূর অস্ট্রেলিয়াতে থেকেও শিকড়ের টানে বাংলা গানকে বুকে ধারণ করে চলেছে প্রবাসী, তারই ধারাবাহিতকায় এবার তারা হাজির হয়েছিলো সম্পূর্ণ নতুন একটি কোলাবোরেশন নিয়ে—রামীনের গানটিও ছিলো তারই একটা অংশ।দে দে পাল তুলে দে (কণ্ঠ: মওলা): আধ্যাত্মিক ভাবধারার এই লোকসংগীতটি শুরু হতেই শ্রোতাদের মাঝে এক অন্যরকম দোলা লাগে। মওলার চমৎকার গায়কী দর্শকদের করতালি দিতে বাধ্য করে।
ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে (কণ্ঠ: পিয়াস): পিয়াসের কণ্ঠে এই মরমী গানটি প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো মাটির সুবাস নিয়ে আসে। গানের মূল ভাব ও সুর দর্শকদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে।
বসন্ত বাতাসে ও দোতারা (কণ্ঠ: মওলা): বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের এই তুমুল জনপ্রিয় গানটির সাথে যখন দোতারার ঝংকার উঠছিল, তখন দর্শক সারির অনেকেই নিজেদের আসন ছেড়ে নাচতে শুরু করেন। দোতারার লোকজ সুর প্রবাসের আধুনিক মঞ্চকে যেন এক নিমিষেই গ্রামীণ উৎসবে রূপান্তর করে।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (কণ্ঠ: মওলা): গ্রাম-বাংলার সম্প্রীতি আর অতীত স্মৃতির এই গানটি গাওয়ার সময় মওলা দর্শকদেরও তাঁর সাথে গলা মেলাতে আহ্বান জানান। “গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান…” লাইনের সাথে হলভর্তি প্রায় ১৫০ জন দর্শক একসাথে গেয়ে ওঠেন।
ফিরিয়ে দাও (কণ্ঠ: মওলা): ব্যান্ড মাইলসের এই এভারগ্রিন পপ-রক গানটি দিয়ে মওলা যখন পরিবেশনা শেষ করেন, তখন পুরো হলরুম করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। গিটারের অনবদ্য সোলো এবং মওলার হাই-নোট পারফরম্যান্স দর্শকদের দারুণভাবে নাড়া দেয়।
অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের মাঝে ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। অনুষ্ঠান উপভোগ করতে আসা অ্যাডিলেডের স্থানীয় এক প্রবাসী বাঙালি দম্পতি বলেন, “অনেক দিন পর এত চমৎকার একটি অনুষ্ঠান দেখলাম। বিশেষ করে ‘বসন্ত বাতাসে’ গানের সাথে দোতারার লাইভ পারফরম্যান্স এবং ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি আমাদের একদম দেশের সেই পুরোনো দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মনেই হচ্ছিল না আমরা বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় আছি।“
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী এবং তরুণ দর্শক জানান, “আমরা তো ‘তারায় তারায়’ আর ‘ফিরিয়ে দাও’ গানের সাথে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছি। প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশি ব্যান্ডের এমন পেশাদার পরিবেশনা আমাদের সত্যিই গর্বিত করে।“
‘প্রবাসী’ ব্যান্ডের লাইন-আপ:মওলা: কণ্ঠ ও রিদম গিটার, পিয়াস: কণ্ঠ, রাবীব: লিড গিটার, আরেফিন: রিফ গিটার, অ্যান্থনি: দোতারা ও কিবোর্ড, দিপু: বেজ গিটার ও সলোমন: ড্রামস

রেশ কাটতে না কাটতেই মঞ্চে পপ ও মেটাল রকের ঝড় তোলে তাল অষ্ট্রেলিয়ার আরেকটি অনবদ্য পারফরম্যান্স। তাল অষ্ট্রেলিয়া ব্যান্ড প্রধান ও প্রধান কণ্ঠশিল্পী নুয়াশ আমীন ইমনের নেতৃত্বে গানের দলটি মঞ্চে আসতেই পুরো হলের আবহাওয়া বদলে যায়। একের পর এক জনপ্রিয় রক গান গেয়ে তারা দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন।
তাদের সেটলিস্টে ছিল জেমসের কালজয়ী ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘লাইস ফিতা লাইস’ এবং ‘সুলতানা বিবিয়ানা’। গানগুলোর চেনা বিট ও গিটার সোলোর সাথে দর্শকেরা সমস্বরে গলা মেলান। এছাড়াও শিরোনামহীনের ‘ইচ্ছে ঘুড়ি’, হ্যাপী আকন্দের ‘চলো না ঘুরে আসি’ এবং গুরু আজম খানের ‘আসি আসি বলে তুমি’ গানগুলোর অনবদ্য পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিতে এক দুর্দান্ত গতি এনে দেয়। ড্রামস ও গিটারের অনবদ্য যুগলবন্দী পুরো হলরুমকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
(এই পরিবেশনায় অংশ নেন: নুয়াশ আমীন ইমন (কণ্ঠ ও টিম লিড), ওয়াসি আমির (বেজ গিটার), ইথান গুডফেলো (ড্রামস), বিরাট শর্মা (লিড ও রিফ গিটার) এবং অতিথি শিল্পী হিসেবে গিটার সোলোতে ঝড় তোলেন ফায়জান জাবীর (লিড ও রিফ গিটার)।)
গভীর রাত পর্যন্ত হলভর্তি দর্শক এই গানগুলো উপভোগ করেন এবং প্রতিটি গানের শেষে করতালির মাধ্যমে শিল্পীদের চমৎকার পরিবেশনাকে সাধুবাদ জানান। উপস্থিত দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় এবং তাদের উচ্ছ্বসিত মন্তব্যই প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক না কেন, প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে দেশের গান আর সংস্কৃতি কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকেরা বলেন, “আমরা হয়তো ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে বসবাস করছি, কিন্তু আমাদের হৃদয়, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের ভালোবাসা এখনো বাংলাদেশকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।” সবশেষে উপস্থিত সবাইকে ‘শুভ নববর্ষ ১৪৩৩’ এবং ‘ঈদ মোবারক’ জানিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন ধন্যবাদ জ্ঞাপন চলছিল, তখন করতালির শব্দের মাঝেও অনুভব করা যাচ্ছিল এক ধরনের নীরব আবেগ। কারণ, প্রবাসের মানুষ জানেন—এমন একটি সন্ধ্যা শেষ হওয়া মানে আবারও ব্যস্ত জীবনে ফিরে যাওয়া।
তবু এই ধরনের আয়োজন মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়। এটি একটি ভাষা, একটি গান, একটি উৎসব, একটি স্মৃতি এবং সবচেয়ে বড় কথা একটি অনুভূতি।
সমাপনী বক্তব্যের একটি বাক্য যেন পুরো সন্ধ্যার সারাংশ হয়ে ওঠে, “আমরা হয়তো ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে, কিন্তু আমাদের হৃদয়, সংস্কৃতি এবং ভালোবাসা এখনো বাংলাদেশকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।”

অনুষ্ঠান শেষে কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করছিলেন, কেউ আবার সন্তানকে নিয়ে ধীরে ধীরে পার্কিংয়ের দিকে হাঁটছিলেন। বাইরে তখনও অ্যাডিলেডের শীতল রাত। কিন্তু উপস্থিত মানুষের মনে ছিল এক অন্যরকম উষ্ণতা।
হয়তো এটাই প্রবাসের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা—দেশ থেকে অনেক দূরে থেকেও মানুষ এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি করে নিতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের আকাশ, বাংলার গান আর শেকড়ের টান নিঃশব্দে এসে বসে থাকে সবার হৃদয়ে।