বিড়ালবাহিত পরজীবী রোগ নিয়ে জরুরি সতর্কতা: দৃষ্টিশক্তি হানি ও গর্ভাবস্থায় জটিলতার ঝুঁকি

বিশ্বের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে একটি নীরব পরজীবীর সংস্পর্শে এসেছেন বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডাই’ (Toxoplasma gondii) নামের এই আণুবীক্ষণিক পরজীবীর কারণে মানবদেহে ‘টক্সোপ্লাজমোসিস’ (Toxoplasmosis) নামের একটি সংক্রমণ তৈরি হয়। অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ সৃষ্টি না করলেও, গর্ভবতী নারী এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য এটি বয়ে আনতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) কাছে এই রোগটি নিয়ে এক বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসা গবেষকরা। অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি এবং ব্রাজিলের ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোর গবেষকরা যৌথভাবে দাবি তুলেছেন, টক্সোপ্লাজমোসিসকে যেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “Neglected Tropical Disease (NTD)” বা ‘অবহেলিত উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে এ রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

টক্সোপ্লাজমোসিস কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের বুসেলটন এলাকায় পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায়। প্রায় ৫,০০০ মানুষের ওপর চালানো ওই গবেষণার ফলাফল দেখে চিকিৎসকরা রীতিমতো উদ্বিগ্ন। দেখা গেছে, প্রতি ১৫০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জনের চোখের রেটিনায় টক্সোপ্লাজমোসিসজনিত ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। এই ক্ষত চিরতরে কেড়ে নিতে পারে মানুষের দৃষ্টিশক্তি, যার কোনো সহজ নিরাময় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

সাধারণত ধারণা করা হয়, এই রোগটি কেবল বিড়াল থেকেই ছড়ায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। শুধু বিড়াল পালন করলেই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে না, বরং এটি ছড়াতে পারে আরও বেশ কিছু উপায়ে:

  • কাঁচা মাংস: অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা বা কাঁচা মাংস খাওয়া।
  • বিড়ালের মল: সংক্রমিত বিড়ালের মল বা লিটার বক্স পরিষ্কার করার সময় অসাবধানতা।
  • দূষিত মাটি ও পানি: বাগানের মাটি স্পর্শ করা বা দূষিত পানি পান করা।
  • অপরিচ্ছন্ন খাবার: ভালোভাবে না ধুয়ে ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া।
  • মাতৃগর্ভে সংক্রমণ: গর্ভাবস্থায় মা নতুন করে সংক্রমিত হলে তা অনাগত শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়া।

অধিকাংশ সুস্থ মানুষের শরীরে এই পরজীবী প্রবেশ করলেও কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে:

  • মৃদু থেকে তীব্র জ্বর ও ক্লান্তি
  • লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
  • পেশিতে তীব্র ব্যথা ও মাথাব্যথা
  • তবে রোগটি গুরুতর রূপ নিলে তা সরাসরি মানুষের চোখ, মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র কিংবা ফুসফুসকে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় এই পরজীবীর আক্রমণ সবচেয়ে ভয়ংকর হতে পারে। গর্ভাবস্থায় কোনো নারী যদি প্রথমবারের মতো এই সংক্রমণে আক্রান্ত হন, তবে তা গর্ভপাত (Miscarriage) কিংবা মৃত সন্তান প্রসবের (Stillbirth) কারণ হতে পারে। এমনকি শিশু সুস্থভাবে জন্ম নিলেও তার চোখ ও মস্তিষ্কের গুরুতর ও স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই এই ভয়ংকর পরজীবী থেকে নিজেকে ও পরিবারকে মুক্ত রাখা সম্ভব।

  • যেকোনো মাংস খাওয়ার আগে তা উচ্চ তাপমাত্রায় খুব ভালোভাবে রান্না করুন। কাঁচা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানিতে ভালোমতো ধুয়ে নিন।
  • মাটি বা বাগানের কাজ করার সময় অবশ্যই হাতে গ্লাভস ব্যবহার করুন। কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন।
  • বিড়ালের লিটার বক্স পরিষ্কার করার পর অবহেলা না করে সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
  • পরিবারে কোনো গর্ভবতী নারী থাকলে, গর্ভাবস্থাকালীন সময়ে বিড়ালের লিটার পরিষ্কারের কাজটি পরিবারের অন্য কাউকে করতে দিন। গর্ভবতী নারীদের বিড়ালের মলমূত্রের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখুন।

চিকিৎসকদের স্পষ্ট বার্তা—বিড়ালকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিড়ালের সংস্পর্শের চেয়ে আমাদের অসচেতনতাই এই রোগ ছড়ানোর জন্য বেশি দায়ী। সচেতনতা আর সঠিক স্বাস্থ্যবিধিই পারে এই অদৃশ্য পরজীবীর হাত থেকে আমাদের চোখ ও অনাগত ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে।

সূত্র: 7NEWS Australia, Health direct Australia।