মতিউর রহমান: আমার জন্ম: ১৮৯৫, জন্মস্থান: বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে খরাপ্রবণ এলিভেটেড বরেন্দ্র অঞ্চলের ‘দিগ্রাম’ মৌজা। জন্মদাতা: মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী, পুঠিয়া রাজবাড়ী, লোকাল কাচারী-বাসুদেবপুর।

পুঠিয়া রাজবংশের অন্যতম রানী, মহারানী (ব্রিটিশ খেতাবপ্রাপ্ত) হেমন্তকুমারী দেবী মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুঠিয়া এস্টেট পরিচালনা করতে থাকেন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ শুরু করেন। যেমন—রাজশাহী শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের বিখ্যাত ‘ঢোপকল’ স্থাপন তারই অবদান। বরেন্দ্র অঞ্চলে নিয়মিত বৃষ্টি না হলে হালচাষ, চারা রোপণ ও চারা বৃদ্ধি—এই চেইন মেইনটেইন হতো না এবং কৃষকের ঘরে ফসল উঠত না। এদিকে বিভিন্ন কাচারি বাড়ির নায়েবরা যে কোনো উপায়ে খাজনা পরিশোধের জন্য তাদের পাইক-পেয়াদা দিয়ে কৃষকের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকত, যা মহারানী হেমন্তকুমারী দেবীকে ভাবিয়ে তোলে। তাই তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলে পুকুর খননের উদ্যোগ নেন, যাতে বৃষ্টির পানি পুকুরে ধরে রাখা যায়। পুকুরের জায়গা নির্ধারণের জন্য রানীমা নিজেই ঘোড়ার গাড়ি আর পালকিতে চেপে বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখলেন এবং বেশ কয়েকটি জায়গা নির্ধারণ করলেন। কয়েকটি গাছের ছায়াবৃত টিলার পাশে আমার জন্মস্থান নির্ধারিত হলো।
একদিন স্থানীয় বাসুদেবপুর কাচারি বাড়ির ব্রিটিশীয় চেহারার নায়েব খানদানি বেশভূষায় তার স্থানীয় দিগ্রাম মৌজার পেয়াদা ও সঙ্গে গোটা পঁচিশেক কালো, তামাটে বর্ণের নাকচ্যাপ্টা অর্ধবসন পরিহিত সাঁওতালি লোকজন নিয়ে হাজির। সাঁওতালদের হাতে কোদাল, খুন্তি আর শক্ত ছোট ছোট ডালা। নায়েব হুকুম করল আর সবাই “দেলাবু দেলাবু” (চলো চলো), “এতোহোবিয়া” (শুরু করি) বলে আমাকে জন্ম দেওয়ার কাজে নেমে পড়ল। দিগ্রাম মৌজার পেয়াদা খননকার্য তদারকি করে আর দিনশেষে সবার হাতে একটা করে আধুলি ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়।
একদিন কর্মরত সাঁওতালের হেড রাগান্বিত হয়ে সেই পেয়াদার হাতের শক্ত বিশেষ বাঁশের লাঠি (যা মারামারির কাজে ব্যবহৃত হয়) কেড়ে নিয়ে মণ্ডু ভাষায় গালাগালি শুরু করল। কারণ, এক কুড়ির (সাঁওতালি মেয়ে) স্বামী হেডম্যানের কাছে বিচার দিয়েছে যে, পেয়াদা তার সঙ্গে নিয়ে আসা ভালো খাবার কুড়িকে দিয়েছে এবং এটা তাদের জন্য অসম্মানের। যাহোক, এভাবেই খননকার্য শেষ হয়ে পরের বর্ষায় ধরণী আমাকে পানিতে পূর্ণ করে আমার জন্মের পূর্ণরূপ দান করল এবং একই সাথে আমার চারপাশের জমির কৃষকের মুখের হাসি ও গান আনার জন্মকে সার্থক করে তুলল।
১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলে সঞ্চয়ী কৃষকেরা তাদের অর্থের বিনিময়ে কিছু জমির মালিকানা পেল, আর অন্যদিকে পেয়াদারা তাদের প্রভুভক্তির প্রতিদান প্লাস কিছু টাকার বিনিময়ে বেশিরভাগ জমির মালিকানা নিয়ে নিল। তৎকালীন বাসুদেবপুর কাচারি বাড়ির নায়েব ইমরান চৌধুরী রাজশাহী শহরের বিশাল জায়গা কিনে সেখানে বসবাস শুরু করলেন। নিজের মালিকানায় জমি পেয়ে আমার চারপাশের জমির কৃষিকাজের তৎপরতা বেড়ে গেল। ওদিকে পুঠিয়ার চারআনি রাজবংশের শেষ পুরুষ রাজা নরেশ নারায়ণের কথিত স্ত্রী রানী কমর বেগম (যিনি কলকাতার মেয়ে) রাজবংশের অন্য সদস্যদের মতো কলকাতায় স্থানান্তরিত না হয়ে বরং এলিট মুসলিম নারী হিসেবে চারআনি রাজবাড়ীতেই থেকে গেলেন। সঞ্চিত টাকা শেষ হলে রানী কমর বেগম রাজবাড়ীর ভিতরের গাছ, গাছের ফল, এমনকি আসবাব ও অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রি করে নিজের আভিজাত্য ধরে রাখার চেষ্টা করে গেলেন। রানী কমর বেগম নাকি তার শখের কেনাকাটার জন্য পুঠিয়া থেকে মাঝে মাঝে রাজশাহীর সাহেববাজারে যেতেন এবং রাজশাহী কলেজে বিএ, বিএসসি পড়তে আসা কেউ ভাগ্যক্রমে রানীকে দেখলে সে হোস্টেলে ফিরে এসে রুমমেট এবং আশেপাশের রুমের সবাইকে রানী দেখার ক্ষণ বর্ণনা করত।
রাজশাহীতে বসবাসরত নায়েব ইমরান চৌধুরীর ছোট ছেলে এখন ষাটের দশকের শহুরে এলিট মাস্তান এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পিস্তলের অধিকারী, আর বাসুদেবপুর এলাকায় পেয়াদারা সম্মানজনক “মিয়া” উপাধি নিয়ে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সবাই একাধিক দোনলা বন্দুকের মালিক। রানী কমর বেগমের সঙ্গে সাহেববাজারে আসা এক মাদ্রাজী তরুণীকে দেখে নায়েব ইমরান চৌধুরীর মাস্তান ছেলে তাকে বিয়ে করবে বলে রানীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সত্যি সত্যি বিয়ে করে ফেলল। মাদ্রাজী তরুণীকে সবাই রানীর মেয়ে হিসেবে জানত।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রানী কমর বেগম লোকমারফত বা রেডিওতে “মুক্তিযোদ্ধা খতম হো গিয়া” শুনলেই খুশিতে অট্টহাসি দিত এবং রাজবাড়ীর কিছু অংশে বসবাসরত সরকারি কর্মচারীদের বাচ্চাদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করত। এলিট মাস্তানের বৌ সেই মাদ্রাজী তরুণী যুদ্ধকালীন সময়ে এক পাক আর্মি অফিসারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়লে মাস্তান ছোট চৌধুরী তার মাদ্রাজী বৌকে গলা টিপে পরপারে পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে একমাত্র বংশপ্রদীপ দুধের বাচ্চাকে নিয়ে সীমান্তের ওপারে চলে গেল।
হায়রে, আমি আমার কথা না বলে অন্যের কথা কেন বলছি! আসি আমার কথায়। যুদ্ধকালীন মে’র দিকে এক গভীর অমাবস্যার রাতে আমার পাড়ে একটা গরুর গাড়ি এসে থামল। শশ্রুমণ্ডিত, সুঠাম দেহের অধিকারী দুজন লোক গাড়ির ওপরে রাখা একটি লোহার বাক্স টেনে নিয়ে আমার পাড়ের পানির ধারে এনে শক্ত কিছু দিয়ে বাক্সের লক ভাঙতে শুরু করল। অনেক চেষ্টার পরে তারা ভিতরের টাকা ও সোনার গহনা দুজনের মধ্যে ভাগাভাগি শুরু করল। আমি টের পেলাম ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না। হঠাৎ একজন এক গুপ্ত দেশী ধারালো অস্ত্র দিয়ে অন্যজনকে উপর্যুপরি আঘাত করতেই বেচারা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়ল। জয়ী লোকটি পরাজিত লোকের অসাড় দেহ থেকে পরনের লুঙ্গি খুলে নিয়ে সব টাকা ও গহনাদি লুঙ্গির কাপড়ে বেঁধে অসাড় দেহটাকে আমার বুকে ডুবিয়ে এবং সেই সঙ্গে লোহার বাক্সটাকেও পানিতে ডুবিয়ে গরুর গাড়ি নিয়ে চলে গেল। বুঝতে পারলাম জয়ী লোকটাই আসল পরিকল্পনাকারী এবং গরুর গাড়ির মালিক সে-ই। আমি ছাড়া এই নির্মম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দুটি গরুর চুপ করে থাকা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
যুদ্ধ শেষ হলো! দেশ স্বাধীন হলো! আমি আমার মতই আছি। বারো মাসে আমার কয়েকটি ভিন্ন রূপ। খরায় পানি শুকিয়ে আমার তলদেশ যেমন চৌচির, আবার বর্ষার পরে পদ্মফুলে শোভািত আমি ষোড়শী যৌবনা তরুণীর মতোই আকর্ষণীয়। কৃষকেরা আমার পানি উত্তোলন করে তাদের জমিতে নিয়ে যায়, আবার তারা নিজেরাও আমার পানি পান করে, রান্নার কাজে ব্যবহার করে। আমি সরকারের খাস পুকুর অর্থাৎ আমার মালিক সরকার। আশপাশের জমির মালিকরা শুধু আমার পানি ব্যবহার করতে পারবে, তবে আমার মাঝে বসবাসকারী কৈ, শিং, মাগুরের মালিক তারা নন। বছরে একবার ইউনিয়ন বোর্ডে আমার নিলাম হয় এবং প্রতিবারই দিগ্রাম মোজার সেই পেয়াদার উত্তরসূরী হুসেন মিয়া নামমাত্র মূল্যে আমার পানির কৈ, শিং, মাগুরগুলোকে কিনে নেয়।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে জমির মালিকরা তাদের গোলায় ধান বোঝাই শেষে মাঘ মাসের দিকে আমার আশপাশের বেশিরভাগ জমির মালিক, তার পরিবার নিয়ে আমার পাশের টিলায় পিকনিক করতে এলেন। টিলার ওপরে চাষাবাদ কৃষকদের থাকার জন্য তৈরি বাথানবাড়িতে তাদের পিকনিক। উত্তর দিক থেকে বহমান মাঘ মাসের মৃদু বাতাসে আমার বুকের ওপরের খুব ছোট ছোট ঢেউগুলো যেন জমির মালিকের টেপরেকর্ডারের উচ্চস্বরের সন্ধ্যা ও লতার গানের সাথে তাল মিলিয়ে নাচার চেষ্টা করছে। জমির মালিক বিপদে পড়ল যখন তার বড় ছেলে মুরগি পোলাও খাওয়া শেষে বলল যে, আমার পানি সে খাবে না। কারণ সে নাকি আমার পানিতে অন্য একজনকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেখেছে।
আশির দশকের মাঝামাঝিতে এপ্রিল মাসের দিকে কিছু লোক এসে আমাকে কোদালি দিয়ে আঁচড়ানো শুরু করল এবং আঁচড়ানো মাটি দিয়ে তারা আমার ঠিক মধ্যতলদেশ থেকে কোণ বা গম্বুজ আকৃতির কিছু একটা তৈরি করল, যা তাদের ভাষায় “সাক্ষী”। বারবার তারা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে সতর্কতার তাগিদ দিচ্ছে যাতে গম্বুজের উচ্চতা আমার পাড়ের সঙ্গে ম্যাচ করে। আমাকে নিয়ে কী হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। পরের দিন দুটি জিপ গাড়ি আমার পাড়ে এসে থামল এবং গরমের দিনেও সুটেড-বুটেড লোকজন গাড়ি থেকে নেমে আমাকে পরিদর্শন করতে লাগল। তাদের সঙ্গে আছেন চোরাকারবারি ও তথাকথিত সাংবাদিক আলম মিয়া এবং তিনি খুব গম্ভীর ভাব নিয়ে আমার ছবি তুললেন। পায়ে স্যান্ডেল পরে বিশ্রীভাবে প্যান্ট-শার্ট ইন করা এবং মুখে পান চিবানো এক লোক চিৎকার করে মাপামাপির কাজ শেষ করল এবং সবাই খুশি মনে ফিরে গেল। এটা ছিল নাকি আমার জন্ম এবং এবার আমার জন্মদাতা স্বয়ং সরকার ও তার বিরাট বাজেটের এক বহুমুখী প্রকল্প এবং আমার জন্মব্যয় মাত্র তিন কোটি টাকা!
নতুন শতাব্দীর প্রথম দিকে সরকারের এক মন্ত্রীর দোয়ায় এবং দলীয় আমলাতান্ত্রিকতার নতুন মহাসমারোহে উপজেলার এক ছাত্রনেতা ১০০ বছরের জন্য আমাকে লিজ নিল। এটা আবার পাশের উপজেলার প্রভাবশালী এমপির লোকজন মেনে নিতে পারল না। আমাকে দখলের জন্য তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর লোকজনই জিতল এবং তারা আমার বেশ পরিচর্যা করে আমার পানিতে রুই-কাতলার পোনা ছেড়ে দিল। এখন থেকে কেউ আর আমার পানি ব্যবহার করতে পারবে না। পিকনিক করতে আসা জমির মালিকের সেই ছেলেটি, যে আমার পানি খেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, সে নাকি কোনো পেপার মিলের ইঞ্জিনিয়ার। সে তার নিজ গ্রামে বাবাকে দেখতে আসলে বৃদ্ধ বাবা ছেলের কাছে দুঃখ করে বলল, “বাবা, ডিপের পানি কিনে জমিজমা আর করা যাবে না!” বৃদ্ধ বাবা ছেলেকে আরও বলল, “বাবা, এবার আর এদেরকে কেউ ভোট দেবে না।” বৃদ্ধ বাবার দিকে বেকুবের মতো চেয়ে থাকা ছাড়া ইঞ্জিনিয়ার ছেলের আর কিছুই করার ছিল না।
২০১০ সালের দিকে এক রাতে কিছু লোক বড় বড় জাল নিয়ে এসে আমার পানির সব মাছ ধরে নিয়ে গেলে পরের দিন অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে আমার পানির মাছ চুরির ঘটনা নিউজ আকারে আসল এবং ক্ষমতাসীন দলের লোক চুরির কাজ কেমন করে বলে সবাই ছি-ছি করল। এরপর থেকে তাদেরকে আর চুরি করতে হয় না, কারণ তারাই এখন আমাকে দখল করে নেওয়া মালিক। পিকনিক করতে আসা জমির মালিকের সেই ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা নাকি পরিবারসহ দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া নামক কোনো এক দেশে বসবাস করে।
আমার কথা এখানেই শেষ! আমি আর আমার কথা বলব না! কোনো দিনও বলব না!