পকেটের দুই নীল দাগের জাদু!

মামুন আলা: ১৯৮৪ সালের শেষের দিকের কথা। আব্বা বগুড়া থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় এলেন। সৌভাগ্যক্রমে মিরপুর এক নম্বরের আনসার ক্যাম্পের কাছে সরকারি ‘পাঁচতলা’ কোয়ার্টারে সাড়ে চারশো বর্গফুটের একটি বাসা বরাদ্দ পেলেন। মাথা গোঁজার কোনোরকম ঠাঁই! বিদ্যুতের ওয়্যারিং পর্যন্ত ঠিকঠাক ছিল না।

আব্বা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু চাকরি করতেন সাধারণ একটি পদে। তাঁর সমস্ত ধ্যানজ্ঞান ছিল সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে। একদিন আমাকে বললেন, ‘মিরপুর দুই নম্বরে মনিপুর নামে একটা ভালো স্কুল আছে। বিকেলে গিয়ে দেখে আসিস তো।’

সেই বিকেলে পাইকপাড়ার ভেতর দিয়ে ধানখেত, পাটখেত, সবজিখেত, ঝোপঝাড় আর বাঁশঝাড় পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছালাম সেই স্কুলে। পশ্চিম পাশে টিনশেডের একটি প্রশাসনিক ভবন। চালার ওপর বিরাট রঙিন ফুলে ভরা বুগেনভেলিয়া। উত্তর দিকে সেমিপাকা কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ। পূর্ব পাশে মুলি বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি আরও কয়েকটি বিষণ্ণ ক্লাসরুম। কাঁচা মেঝে। স্কুলের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটি রাস্তা!

আমি হতভম্ব! এত দিন পড়েছি ঐতিহ্যবাহী বগুড়া জিলা স্কুলে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল সম্ভ্রান্ত দালানকোঠা। কত নামডাক, কত আভিজাত্য! এ কোন স্কুল দেখতে এলাম!

বাড়ি ফিরে আব্বাকে বললাম, ‘আমি ওই স্কুলে পড়ব না। কিছুতেই না!’

আব্বা ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি দিয়ে বললেন, ‘আগে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেয়ে নে!’

১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে আমরা তিন ভাইবোনই মনিপুর স্কুলের ছাত্রছাত্রী হয়ে গেলাম। আমি নাইনে, ছোট বোন মেফতাহাতুন আলিয়া সিক্সে আর ছোট ভাই মাহমুদ উল আলা ফাইভে।

পাঁচতলা কোয়ার্টারে পাঁচটি ভবনে প্রায় দেড়শো পরিবারের বসবাস ছিল। সবাই সবাইকে চিনত। দক্ষিণ বিশিলের অনেক বাসিন্দাকেও আমরা চিনতাম, তাঁরাও আমাদের চিনতেন। ঢাকা শহর তখন এমনই ছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই টের পেলাম, আমাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদা হঠাৎ করে কেমন যেন বেড়ে গেছে! মাঝেমধ্যেই শুনতাম, একজন আরেকজনকে বলছেন, ‘ওরা তিন ভাইবোনই মনিপুরে পড়ে!’ আমরা যেন বিরাট কোনো কীর্তি করে ফেলেছি!

অনেক খালাম্মা-খালু এত দিন ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতেন। তাঁদের কেউ কেউ হঠাৎ ‘তুমি’ বলা শুরু করলেন!

এক প্রতিবেশীর বাসায় টেলিভিশনে ম্যাকগাইভার, টারজান আর হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখতে যেতাম। আগে মেঝেতে বসতাম। এখন সেই বাসায় গেলে খাটের ওপর বসতে বলা হতো! আঙ্কেল আগে মাঝেমধ্যে হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘এক প্যাকেট স্টার সিগারেট এনে দে।’ হঠাৎ করে সেই ফরমায়েশও বন্ধ হয়ে গেল!

দেড়শো পরিবারের মধ্যে এক প্রতিবেশীরই ফ্রিজ ছিল। বিরাট ব্যাপার! একদিন সেই আন্টি আম্মাকে বললেন, ‘ভাবি, দরকার লাগলে মাছ-মাংস রাইখেন আমার ফ্রিজে। আর বাচ্চাদের জন্য ঠান্ডা পানির বোতল নিয়া যাইয়েন।’

একদিন বাসায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান এলেন ঘরে লাইট-ফ্যান লাগানোর কাজে। যখন জানতে পারলেন, আমরা তিন ভাইবোন মনিপুর স্কুলে পড়ি, কাজ শেষে টাকা নিতে চাইলেন না। আব্বাকে বললেন, ‘আপনার ছেলেমেয়েরা অনেক বড় হবে।’ ভদ্রলোকের নাম ছিল জাহাঙ্গীর। ফ্রেঞ্চকাট কাঁচাপাকা দাড়ি। এত বছর পরও তাঁর মুখটা প্রায়ই মনে পড়ে।

আমাদের স্কুলের ইউনিফর্ম ছিল নেভি ব্লু প্যান্ট আর সাদা শার্ট, পকেটে দুটি নীল স্ট্রাইপ। আনসার ক্যাম্প থেকে মিনিবাসে উঠতাম। নামতাম মিরপুর দুই নম্বর থানার সামনে। শার্টের পকেটে দুটি নীল দাগ দেখেই বাসের স্টাফরা বেশ সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। একদিন এক কন্ট্রাক্টর বললেন, ‘ভাইয়া, মনিপুরে পড়েন? ভাড়া লাগব না।’ মিরপুর এক নম্বর বাজারের পেছনে, এশিয়া ফটো স্টুডিওর কাছে বড় একটি স্টেশনারির দোকান থেকে কাগজ-কলম কিনতাম। নিউজপ্রিন্ট কাগজ আর সেই বিখ্যাত ইকোনো বলপেন! কখনো টাকা কম পড়লে দোকানদার বলতেন, ‘মনিপুরে পড়ো? সমস্যা নাই, পরে দিয়া দিও।’

আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ের নিচতলায় রূপসা নামে একটি মেয়ে থাকত। আমার একতরফা ভালোবাসার প্রথম নায়িকা! ফাইভ-সিক্সে পড়ত। মাঝেমধ্যে বিকেলে ওদের বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। যদি একবার বেরোয়! একনজর দেখতাম! একদিন ওর কলেজপড়ুয়া ভাই হনহন করে বাইরে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ওই, এইখানে কী চাস? আরেকদিন দেখলে হাড্ডিগুড্ডি ভাইঙ্গা মেলামাইনের কারখানায় পাঠাইয়া দিমু!’ ছেলের চেঁচামেচি শুনে একটু পরেই তার মা বেরিয়ে এলেন। ‘ওই রাব্বি, কারে কস এগুলা? ও মনিপুরে পড়ে!’ মুহূর্তেই রাব্বি ভাইয়ের সুর পাল্টে গেল। ‘যাও ছোট ভাই, মাঠে গিয়া খেলোগা।’

এক বাসায় একজন মাওলানা সাহেব ভাড়া থাকতেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণে গিয়ে পেয়েছিলেন ছোট একটি কালো হোমিওপ্যাথির ওষুধের বাক্স। বাক্সের ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট ওষুধের শিশি, কিছু পাউডার আর প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম। সঙ্গে একটি বই। রোগের নাম, লক্ষণ আর কোন রোগে কী ওষুধ দিতে হবে, সব লেখা।

মাওলানা সাহেব একদিন বাক্সটা আমাকে দিয়ে দিলেন। ‘তুমি মনিপুরে পড়ো, তোমার ব্রেন ভালো। এটা তোমার কাজে লাগবে।’ মুশকিল হলো, রোগী খুঁজে পাচ্ছিলাম না!

একদিন দেখি, পিডব্লিউডির এক বয়স্ক কর্মচারী মাঠের এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আঙ্কেল, কী হয়েছে?’ বললেন, ‘জ্বর আর মাথাব্যথা।’ সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ছুটে গিয়ে আমার ওষুধের বাক্স নিয়ে এলাম। বই খুলে রোগের লক্ষণ মিলিয়ে কয়েকটি বড়ি দিলাম। দু-একদিনের মধ্যে তিনি ভালো হয়ে গেলেন।

এরপর থেকে দেখা হলেই আশপাশের লোকজনকে বলতেন, ‘ভাতিজা মনিপুরে পড়ে। ভালো ডাক্তার!’

১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সমবয়সীরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা ঘটা করে কোয়ার্টারে একুশে ফেব্রুয়ারী পালন করব। আয়োজনের জন্য ফুল দরকার। বিশে ফেব্রুয়ারী রাতে বেরিয়ে পড়লাম ফুলের সন্ধানে। এক বিল্ডিংয়ের নিচতলায় এক আঙ্কেল থাকতেন। ব্যালকনির সামনের কিছুটা জায়গা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফুল-সবজির বাগান করেছিলেন। সেখানে মুরগিও পালতেন।

রাত বারোটার পর আমরা কয়েকজন বাঁশের বেড়া টপকে বাগানে ঢুকলাম। কিন্তু বিধি বাম! খোপে থাকা মুরগিগুলো তারস্বরে ডাকাডাকি শুরু করল। আঙ্কেল সম্ভবত ব্যালকনিতেই ঘুমাতেন। ধড়মড় করে উঠে ‘মুরগিচোর! মুরগিচোর!’ বলে ধপ করে লাফ দিয়ে বাগানে নেমে এলেন। আমার সঙ্গীরা ততক্ষণে সব কেটে পড়েছে। ধরা পড়ে গেলাম আমিই। তাঁর চিৎকারে সারা পাড়া ততক্ষণে জেগে উঠেছে। বিভিন্ন বাসা থেকে লোকজন ছুটে এলেন। শক্ত করে আমার হাত পাকড়াও করে সবার সামনে অভিযোগ করলেন, ‘ও আমার মুরগি চুরি করতে ঢুকছিল!’ আমি যতই বলি, ‘আঙ্কেল, আমরা মুরগি চুরি করতে যাইনি, ফুল নিতে গিয়েছিলাম’, তিনি কিছুতেই কানে তুলছেন না।

এমন সময় আরেক আঙ্কেল এগিয়ে এসে দাঁতে জিভ কেটে তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘এই মিয়া, কী বলেন? ও মনিপুরে পড়ে!’ তারপর আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ‘যাও বাবা, এত রাইতে বাইরে থাইকো না। বাসায় যাও।’

ভাগ্যিস মনিপুরের ছাত্র ছিলাম, তা না হলে পরদিন মুরগিচুরির অপবাদে পাড়ায় মুখ দেখানো কঠিন হয়ে যেত!

ছবি: সংগ্রহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *