পুরোনো বন্ধু, চেনা গান, এক থালা মেজবান: ২২ নভেম্বর অ্যাডিলেডে ফিরবে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ক্লাস শেষে একসঙ্গে ছুটে চলা আর শাটল ট্রেনের চিরচেনা শব্দ—এসব কি এত সহজে ভোলা যায়? যে ট্রেনে চড়ে একসময় প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন, সেই ট্রেন হয়তো এখন জীবনের অনেক দূরে। কিন্তু তার কামরায় গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব আর ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি আজও রয়ে গেছে মনের গভীরে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে বসেও তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। ব্যস্ত জীবনে হয়তো অনেক বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় না। কারও সঙ্গে বছরের পর বছর দেখাও নেই। অথচ হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে কিংবা পরিচিত কোনো গান শুনলে মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা! পুরোনো বন্ধুত্বে আবার প্রাণ ফেরাতে, স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসতে আর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে প্রবাসের মাটিতে তুলে ধরতে অ্যাডিলেডে আয়োজন করা হচ্ছে ‘সিইউ ডে অ্যান্ড গ্র্যান্ড মেজবান’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইন সাউথ অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগে আগামী ২২ নভেম্বর রোববার অনুষ্ঠিত হবে এই আয়োজন। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলন, স্মৃতিচারণা, সংগীতানুষ্ঠান আর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান, সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠবে স্মৃতি, সংস্কৃতি ও বন্ধুত্বের বিশেষ উপলক্ষ।

এবারের আয়োজনের পরিধিও বাড়ছে। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, এত দিন তাঁদের অনুষ্ঠানগুলো মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ঘিরে হলেও এবার বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটিকেও সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান তাঁরা। আয়োজকদের ভাষায়, ‘এত দিন শুধু অ্যালামনাইদের নিয়েই আমাদের সব অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার আমরা আমাদের পরিধি বাড়াচ্ছি। সমগ্র কমিউনিটিকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করতে চাই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে গড়ে উঠবে নতুন যোগাযোগের পথ এবং তৈরি হবে পেশাগত নানা সুযোগ।’

শাটল ট্রেন শুধু ট্রেন নয়, এক টুকরো জীবন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শাটল ট্রেন কেবল যাতায়াতের বাহন নয়। এটি তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তারুণ্যের এক টুকরো ইতিহাস। আবার কারও কাছে শাটল ট্রেন মানেই কোনো বিশেষ মানুষের সঙ্গে পরিচয়, জীবনের প্রথম ভালো লাগা কিংবা বন্ধুত্বের এমন এক গল্প, যা আজও মনে পড়লে মুখে হাসি ফোটে। সময় বদলেছে। সেই তরুণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কেউ শিক্ষক বা গবেষক, কেউ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে পরিবার নিয়ে থিতু হয়েছেন অনেকে। কেউ ছড়িয়ে পড়েছেন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। অ্যাডিলেডের এই মিলনমেলার আনন্দও ঠিক সেখানেই। বহু বছর পর কোনো বন্ধুকে সামনে পেয়ে হয়তো প্রথমে চিনতেই একটু সময় লাগবে। তারপর পরিচিত হাসি কিংবা কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই ফিরিয়ে দেবে পুরোনো দিনের চেনা অনুভূতি।

এক থালা মেজবানে ফিরে পাওয়া চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের কথা উঠলে মেজবানের প্রসঙ্গ আসবেই। মেজবানি মাংসের স্বাদ, বাড়িভর্তি অতিথি, একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ আর মানুষের প্রতি আন্তরিকতা—সব মিলিয়ে এটি চট্টগ্রামের সংস্কৃতির এক বিশেষ পরিচয়। প্রবাসে থাকা মানুষের কাছে মেজবান তাই শুধু খাবারের আয়োজন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশব, পারিবারিক উৎসব, আত্মীয়স্বজনের সমাগম আর নিজের শহরের প্রতি গভীর টান। দেশে থাকতে হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে মেজবানের দাওয়াত এসেছে। বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে বসেছেন লম্বা খাবারের সারিতে। সামনে ধোঁয়া ওঠা ভাত, পাশে মেজবানি গরুর মাংস আর চনার ডাল। খাওয়ার ফাঁকে চলছে গল্প, হাসি আর পরিচিত মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো। তাই প্রবাসে যখন মেজবানের আয়োজন হয়, তখন খাবারের স্বাদের সঙ্গে ফিরে আসে চেনা মানুষের মুখ, ফেলে আসা বাড়ির উঠান আর দেশের মাটির গন্ধ।

‘এ টেস্ট অব চিটাগং, এ বন্ড ফর লাইফ’: ‘এ টেস্ট অব চিটাগং, এ বন্ড ফর লাইফ’ (A Taste of Chittagong, A Bond for Life)—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সাজানো হয়েছে এবারের আয়োজন। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ গ্র্যান্ড মেজবান। আয়োজনে থাকছে সুগন্ধি ভাত, ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস ও মশলাদার চনার ডালসহ চট্টগ্রামের পরিচিত খাবার। এক টেবিলে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হবে নতুন পরিচয়, আরও দৃঢ় হবে পুরোনো সম্পর্ক। কারণ, খাবারের সঙ্গে মানুষের স্মৃতির সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত। কোনো পরিচিত স্বাদ কখনো কখনো মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিতে পারে জীবনের বহু বছর আগের কোনো দিনে।
সিইউ ডে উদ্যাপনের আরেকটি আকর্ষণ সংগীতানুষ্ঠান। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে সরাসরি সংগীত পরিবেশন করবে ‘অগ্নিবীণা—ফায়ার ল্যুট’ (Agnibina—Fire Lute) ব্যান্ড। ব্যান্ডটির সদস্যরা হলেন লিড গিটার ও কণ্ঠে রায়হান, কিবোর্ডে ববি, বেজ গিটারে সাজিদ এবং ড্রামসে ইমন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সংগীত, স্মৃতিচারণা ও আড্ডার মধ্য দিয়ে দিনটি হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা গান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরারও সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু পুনর্মিলন নয়, কমিউনিটিরও মিলনমেলা: এবারের আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অ্যাডিলেডের বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিবারগুলোকেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিবারগুলোর মধ্যেও অনুষ্ঠানটি ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন কমিউনিটির অনেক পরিবার ইতিমধ্যে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেছেন এবং আয়োজনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

আয়োজকদের পরিকল্পনায় তাই স্মৃতিচারণা ও সাংস্কৃতিক আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বৃহত্তর কমিউনিটির মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ভাবনাও। তাঁদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্ম আরও বিস্তৃত হবে এবং বিভিন্ন পেশা ও প্রজন্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে। সেই অর্থে এই আয়োজন শুধু অতীতকে ফিরে দেখার নয়, ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি উপলক্ষ।

কখন, কোথায় এই আয়োজন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ১৮ নভেম্বর। দিনটিকে ঘিরে স্মৃতি ও ঐতিহ্য উদ্যাপনের ধারাবাহিকতায় আগামী ২২ নভেম্বর ২০২৬, রোববার অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত হবে ‘সিইউ ডে অ্যান্ড গ্র্যান্ড মেজবান’। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানটি হবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার টাসমোরে অবস্থিত বার্নসাইড বলরুমে (Burnside Ballroom, 401 Greenhill Road, Tusmore SA 5065)। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলবে সাত ঘণ্টার এই আয়োজন। অনুষ্ঠানে থাকছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলন, স্মৃতিচারণা, সংগীত পরিবেশনা ও ঐতিহ্যবাহী মেজবান।

অনুষ্ঠানের তথ্য
• অনুষ্ঠান: সিইউ ডে অ্যান্ড গ্র্যান্ড মেজবান ২০২৬
• তারিখ: ২২ নভেম্বর ২০২৬, রোববার
• সময়: বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা
• স্থান: বার্নসাইড বলরুম, ৪০১ গ্রিনহিল রোড, টাসমোর, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ৫০৬৫

স্পনসরবৃন্দ: মেল্যান্ড হোমস, ফাইভ পার্লস প্রপার্টি ফান্ড, এইচটি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট, আউসবাংলা ফুড ও ডি ইয়ংস। আর মিডিয়া পার্টনার: আমাদের কথা অস্ট্রেলিয়া।

দেশ থেকে দূরে থাকা যায়, কিন্তু শেকড় থেকে কি সত্যিই দূরে থাকা যায়? অ্যাডিলেডের এই আয়োজন যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজে, একটি শাটল ট্রেনের স্মৃতি, এক থালা মেজবান আর একসঙ্গে গাওয়া কয়েকটি বাংলা গানের মধ্য দিয়ে।