আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমছে, আয় কমার শঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কঠোর ভিসানীতির অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার প্রকৃত শিক্ষার্থীদের অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ভিসার শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করার উদ্যোগ নিয়েছে লেবার সরকার।

সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য যাচাইয়ের নিয়ম পর্যালোচনা এবং ভিসার আবেদন মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে চায় না সরকার।

অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) জানিয়েছে, দেশটির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বছর নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ কমতে পারে। এর ফলে আগামী তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় প্রায় ২০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন যাচাই আরও কঠোর করতে ২০২৪ সালে নতুন একটি মন্ত্রিপর্যায়ের নির্দেশনা চালু করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, আবেদনকারীদের অস্ট্রেলিয়ায় আসার প্রধান উদ্দেশ্য সত্যিই পড়াশোনা কি না, তা আরও ভালোভাবে যাচাই করা। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আর্থিক সামর্থ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু এই নির্দেশনা চালুর পর শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গত অর্থবছরে শিক্ষার্থী ভিসার মোট আবেদনের ২৪ দশমিক ২ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন।

নেপাল থেকে করা শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনের ৫১ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ভারতীয় আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৪০ শতাংশের বেশি।

উচ্চ প্রত্যাখ্যানের হার নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, এতে প্রকৃত শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে অন্য দেশে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন।

অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল শিক্ষার্থী ভিসাব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তবে তাঁর মতে, ভিসা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন।

দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আর্থিক মানদণ্ড তৈরির কাজ করছে স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি ২০২৪ সালে চালু হওয়া মন্ত্রিপর্যায়ের নির্দেশনা ১০৬-এর পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে আগামী নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা এজেন্টদের সঙ্গে পরামর্শ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের বিবেচনায় থাকা একটি বিকল্প হলো আর্থিক যোগ্যতার শর্ত আরও স্পষ্ট করা, এমনকি প্রয়োজনে তা বাড়ানো। এতে যোগ্য আবেদনকারীর সংখ্যা কমে আসতে পারে, কিন্তু যারা আবেদন করবেন, তাঁদের আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছে আরও পরিষ্কার ধারণা থাকবে।

সরকারের প্রত্যাশা, নিয়ম আরও স্পষ্ট হলে ভিসা অনুমোদনের হার বাড়তে পারে এবং আবেদনকারীরাও তাঁদের ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত হতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তি কমে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা এ বছর প্রায় ১৮ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় প্রায় ২০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিলের মতে, এই ক্ষতির জন্য শুধু কঠোর ভিসানীতিকে দায়ী করা যায় না। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং অস্ট্রেলিয়ায় জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ও এর অন্যতম কারণ।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানি খাত। এ খাতের সঙ্গে প্রায় আড়াই লাখ কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে ভিসাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের আদলে একটি ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।

এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা তাঁদের টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় জমা রেখে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারবেন।

তবে এ ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে এটি কার্যকর হতে সময় লাগতে পারে।

সরকারের যুক্তি, শিক্ষার্থী ভিসার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পড়াশোনা। এই ভিসা ব্যবহার করে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা ঠেকানোও তাদের নীতির অংশ।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেছেন জুলিয়ান হিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আয় বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত উদ্বৃত্ত অর্থ শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করে।

সরকারের দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত রাখতে হলে এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি অস্ট্রেলীয় ও অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে বৈচিত্র্যময় শিক্ষার পরিবেশে অংশ নিতে পারেন।

এদিকে, প্রকৃত শিক্ষার্থী নন—এমন কিছু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কোর্স পরিবর্তন করে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন বলে আশঙ্কা করছে সরকার। এ কারণে নির্দিষ্ট একটি গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্সে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহীদের ভিসা আবেদনে আর্থিক সামর্থ্য প্রমাণের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

তবে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য আলাদা কোনো নতুন নিয়ম বা নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা এই প্রতিবেদনে ঘোষণা করা হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আর্থিক মানদণ্ড তৈরির কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা এজেন্টদের সঙ্গে পরামর্শ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অতএব, প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে ভিসা পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। একইভাবে, আর্থিক শর্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও নতুন নিয়ম চূড়ান্ত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না।

সরকারের সামনে এখন দুটি বিষয় একসঙ্গে সামলানোর চ্যালেঞ্জ: একদিকে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার সুযোগ বজায় রাখা, অন্যদিকে শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকানো।

ভিসাব্যবস্থার সংস্কার কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নিয়ম কতটা স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর।

মূল সূত্র: ABC News