কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের জীবন কেবল নিজের জন্য বেঁচে থাকার গল্প নয়; তাঁদের পথচলায় মিশে থাকে শৈশবের স্মৃতি, শেকড়ের টান, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মমতা আর সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর প্রয়াস। জাফরীন জলিল তিথি তেমনই এক নাম।
নাম তাঁর জাফরীন জলিল। তবে পরিচিতজনদের কাছে তিনি তিথি। সংগীত, সাহিত্য, লেখালেখি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটির জীবন যেন এক দীর্ঘ সুরের যাত্রা, যে সুরের শুরু বাংলাদেশের নদীবিধৌত জনপদে, যার বিস্তার রাজধানী ঢাকার কর্মমুখর জীবনে, আর যার অনুরণন আজও শোনা যায় সুদূর অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে। গোপালগঞ্জের পারিবারিক শিকড়, বরিশালের স্মৃতিমাখা শৈশব, ঢাকায় পেশাগত জীবনের সূচনা এবং অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসজীবন, প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার গল্প। সময় বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, জীবনের প্রয়োজন বদলেছে; কিন্তু বদলায়নি শিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা আর মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার সহজাত প্রবণতা। জাফরিন জলিল তিথির জীবন তাই কেবল একজন সংগীতশিল্পী বা লেখিকার ব্যক্তিগত পথচলার বিবরণ নয়; এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি জীবনের নানা বাঁক পেরিয়েও নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

শেকড়ের কাছে ফেরা: পরিবার, শৈশব ও স্মৃতির শহর: জাফরিন জলিল তিথির পৈতৃক নিবাস মধুমতি নদীর তীরঘেঁষা ঐতিহ্যবাহী গোপালগঞ্জ জেলা সদরে। তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে ছিল একটি শিক্ষিত পরিবার, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। তাঁর বাবা এম এ জলিল ছিলেন সরকারি কলেজের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। মা সেজুতি জলিলের মধ্যেও ছিল সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক চেতনা। বাবার শিক্ষকতার সুবাদে শৈশবের একটি সময় কেটেছে রাজধানী ঢাকার আজিমপুর ও নিউ পল্টন এলাকায়। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ঐতিহ্যবাহী আজিমপুর গার্লস স্কুলে। তবে শৈশবের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি, কৈশোরের উচ্ছ্বাস আর বেড়ে ওঠার আবেগময় দিনগুলোর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বরিশাল শহরের নাজির মহল্লায় অবস্থিত নানা-নানির ‘বিশ্বাস বাড়ি’। শৈশবের কিছু বাড়ি কেবল বসবাসের ঠিকানা হয়ে থাকে না; সময়ের সঙ্গে সেগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতির আশ্রয়। সেখানে জমে থাকে পরিচিত মানুষের মুখ, পারিবারিক স্নেহ, উঠোনের গল্প, উৎসবের আনন্দ আর ফেলে আসা দিনের এক অদ্ভুত মায়া। তিথির জীবনে বরিশালের সেই বাড়িও তেমনই এক স্মৃতির ঠিকানা।
বরিশালের পরিবেশেই তাঁর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সম্পন্ন হয়। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শৈশব ও কৈশোরের এই সময়েই তাঁর ব্যক্তিত্বে গড়ে উঠতে থাকে সাহিত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গভীর অনুরাগ। পরিবারের শিক্ষামুখী পরিবেশ তাঁকে জ্ঞানচর্চার পথে অনুপ্রাণিত করেছে, আর মায়ের সাংস্কৃতিক সান্নিধ্য তৈরি করেছে শিল্পের প্রতি এক স্বাভাবিক আকর্ষণ। এই দুই ধারার সম্মিলনেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে তিথির মননশীল ও সৃজনশীল সত্তা।
মায়ের হাত ধরে সুরের ভুবনে: তিথির জীবনে সংগীতের গল্প বলতে গেলে প্রথমেই আসে তাঁর মা সেজুতি জলিলের কথা। সংগীতের প্রতি ভালোবাসার যে বীজ শৈশবে তাঁর হৃদয়ে রোপিত হয়েছিল, তার পরিচর্যায় মায়ের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সরাসরি সান্নিধ্যে সংগীতে হাতেখড়ি। পরবর্তী সময়ে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও পণ্ডিতদের কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতের তালিম নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীতচর্চা আরও সমৃদ্ধ হয়। নজরুলসংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান ও শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতিও ছিল তাঁর আগ্রহ। বরিশালের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মা ও মেয়ের কণ্ঠের পরিচিতি ছিল প্রশংসনীয়। সংগীতের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা কেবল ব্যক্তিগত অনুশীলনে সীমাবদ্ধ ছিল না; মঞ্চে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁরা সেই ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতেন শ্রোতাদের কাছে।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে যখন ব্যান্ডসংগীতের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছিল, তখনও তিথি নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন শাস্ত্রীয়, নজরুল, রবীন্দ্র ও আধুনিক সংগীতের চর্চায়। বিভিন্ন মঞ্চে গান পরিবেশন করে তিনি শ্রোতাদের ভালোবাসা অর্জন করেন। তাঁর সংগীতচর্চার বিশেষ তাৎপর্য ছিল এই যে, গান তাঁর কাছে নিছক বিনোদন ছিল না; এটি ছিল অনুভূতি প্রকাশের ভাষা, আত্মার প্রশান্তি এবং মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে জীবনের অগ্রাধিকার বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে, এসেছে নতুন পরিবেশ ও নতুন বাস্তবতা। তবু সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সুতোটি কখনো পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। বরং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
শিল্পের পাশাপাশি মানুষের পাশে: শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিথি ছিলেন প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী। সংগীতের পাশাপাশি স্কাউট, গার্লস গাইড এবং রেড ক্রিসেন্টের মতো স্বেচ্ছাসেবী ও সমাজকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি শিখেছেন শৃঙ্খলা, সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মূল্য। শিল্পের সৌন্দর্য আর মানবিকতার এই সমন্বয় তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের কাছে তিথি ছিলেন আন্তরিক, প্রাণখোলা ও সহজে আপন করে নেওয়ার মতো একজন মানুষ। তাঁর হাসিমুখ, মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাঁকে পরিচিত মহলে আলাদা অবস্থান দিয়েছিল।
মানুষের জীবনে সাফল্যের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম। কারও কাছে তা পেশাগত অর্জন, কারও কাছে সামাজিক পরিচিতি। কিন্তু তিথির জীবনপথের দিকে তাকালে বোঝা যায়, নিজের ভালো লাগার জগৎকে ধরে রাখার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চশিক্ষা, আত্মপরিচয় ও কর্মজীবনের সূচনা: চার বোনের মধ্যে সবার বড় তিথিকে নিয়ে বাবা এম এ জলিলের ছিল বিশেষ স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন, বড় মেয়ে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা অর্জন করুক। বাবার সেই প্রত্যাশা ও উৎসাহের ধারাবাহিকতায় তিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন। শিক্ষাজীবনে তিনি একদিকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন, অন্যদিকে সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যম নয়; বরং নিজেকে জানার, চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করার এবং জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। নিজের পায়ে দাঁড়ানো, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং পেশাগত পরিচয় গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় খুলে দেয়।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বরিশালের পরিচিত পরিমণ্ডল ছেড়ে তিনি পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। ছোট শহরের চেনা মানুষ, পরিচিত পরিবেশ আর স্মৃতিমাখা দিনগুলো পেছনে ফেলে মহানগরের ব্যস্ত জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যাত্রা শুরু হয়। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী হিসেবে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি লাভ করেন। ঢাকায় তাঁর পেশাগত জীবনের সূচনা ছিল আত্মনির্ভরশীলতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জীবনের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিজের পরিচয় নির্মাণের পথ সব সময় সরল হয় না। পরিবার, শিক্ষা, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে মানুষকে নিজের জন্য একটি অবস্থান তৈরি করতে হয়। তিথিও সেই পথেই এগিয়েছেন, নিজের অর্জিত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যকে সঙ্গী করে।
এক নতুন মহাদেশে, এক নতুন জীবনের শুরু: ২০০২ সালের দিকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে পাড়ি জমান তিথি। তাঁর পড়াশোনার বিষয় ছিল হিউম্যান রিসোর্সেস বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর মধ্যে যেমন থাকে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি, তেমনি থাকে অনিশ্চয়তা, মানিয়ে নেওয়ার চাপ এবং পরিচিত পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাওয়ার এক নীরব কষ্ট। নিজের ভাষা, পরিচিত মানুষ, শৈশবের শহর, পরিবারের সান্নিধ্য এবং বহুদিনের সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে দূরে এসে নতুন সমাজে নিজের জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। প্রবাসজীবনের প্রথম দিনগুলোতে মানুষকে একসঙ্গে অনেক কিছু শিখতে হয়, নতুন পরিবেশের নিয়ম, সামাজিক সম্পর্কের ধরন, জীবনের বাস্তবতা এবং নিজের সামর্থ্যের নতুন পরিচয়। তিথিও এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনকে নতুনভাবে সাজিয়েছেন।
২০০৬ সালে তিনি স্থায়ীভাবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। অ্যাডিলেড তাঁর কাছে শুধু নতুন ঠিকানা হয়ে থাকেনি; ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠেছে তাঁর জীবন, অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্র। বাংলাদেশের স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছেন নতুন এক পরিসর, যেখানে ব্যক্তিগত জীবন ও প্রবাসী সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।
প্রবাসে থেকেও শেকড়ের টান: প্রবাসজীবনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখা। নতুন দেশের জীবনযাত্রা, কাজের ব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের ভিড়ে অনেক সময় নিজের ভাষা, গান, সাহিত্য ও ঐতিহ্য চর্চার সুযোগ সীমিত হয়ে আসে। তবু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা জানেন- সংস্কৃতি কেবল স্মৃতির বিষয় নয়; এটি বেঁচে থাকার, পরিচয় নির্মাণের এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজের শেকড় পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। জাফরিন জলিল তিথি তাঁদেরই একজন।
অ্যাডিলেডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর থেকেই তিনি স্থানীয় বাংলাদেশি সমাজের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছেন। নিজের আয়োজনে ও বাসা, সাবকা সহ বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে তাঁর অংশগ্রহণ প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁকে পরিচিত মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কণ্ঠে গান, আবৃত্তি এবং নান্দনিক পরিবেশনা প্রবাসের মঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে। হাজার মাইল দূরে থেকেও যখন কোনো পরিচিত বাংলা গান ভেসে আসে, তখন তা শুধু সুর হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে ফেলে আসা দিনের স্মৃতি, মাটির গন্ধ, প্রিয়জনের মুখ আর নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আবেগময় মুহূর্ত।
প্রবাসী বাঙালির কাছে এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের গুরুত্ব অনেক। এগুলো একদিকে যেমন কমিউনিটির সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্প্রীতি গড়ে তোলে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, গান ও ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। তিথির সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা তাই নিছক ব্যক্তিগত শখের প্রকাশ নয়। এর মধ্যে রয়েছে নিজের পরিচয়কে ধারণ করার আনন্দ, সমষ্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতিকে প্রবাসের মাটিতে জীবন্ত রাখার আন্তরিক প্রয়াস।

লেখালেখি, মনন ও সৃজনশীলতার আরেক জগৎ: সংগীতের পাশাপাশি সাহিত্য ও লেখালেখির সঙ্গেও তিথির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। তিনি একজন লেখিকা হিসেবে চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাকে শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতে আগ্রহী। গান ও লেখালেখি, দুটি মাধ্যমের প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও তাদের অন্তর্নিহিত সুর অনেক সময় একই জায়গায় এসে মেলে। সংগীত যেখানে সুর ও কণ্ঠের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়, লেখালেখি সেখানে শব্দ ও চিন্তার মধ্য দিয়ে অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। তিথির জীবনেও এই দুই সৃজনশীল ধারার উপস্থিতি তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।
প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা মানুষের ভাবনার জগৎকে বিস্তৃত করে। নিজের দেশকে দূর থেকে দেখা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মেশা, নতুন সমাজের বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং পরিচিত জীবনের সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতার তুলনা, এসবই মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশের শৈশব, বরিশালের স্মৃতি, ঢাকার কর্মজীবন এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসজীবন, তিথির অভিজ্ঞতার এই বৈচিত্র্য তাঁর মননশীলতার জন্য একটি বিস্তৃত পটভূমি তৈরি করেছে। তাঁর সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততার মধ্যে তাই এক ধরনের যোগসূত্র রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে অনুভূতির প্রকাশ, মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ।
সময়ের কাছে নয়, নিজের ভালোবাসার কাছে দায়বদ্ধ: জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষের অনেক পরিচয় তৈরি হয়। কেউ পরিবারের সদস্য, কেউ পেশাজীবী, কেউ শিল্পী, কেউ লেখক, আবার কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিচিত মুখ। সময়ের সঙ্গে এসব পরিচয়ের গুরুত্ব ও পরিসর বদলে যেতে পারে। কিন্তু কিছু ভালোবাসা থাকে, যা মানুষের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে। জাফরিন জলিল তিথির জীবনেও সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তেমনই এক স্থায়ী অনুষঙ্গ।
বাংলাদেশে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল পরিবারের সান্নিধ্যে, বিশেষ করে মায়ের হাত ধরে। বরিশালের মঞ্চ তাঁকে দিয়েছিল নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ। উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবন তাঁকে শিখিয়েছে দায়িত্ব ও আত্মনির্ভরতার পাঠ। আর প্রবাসজীবন তাঁকে দিয়েছে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজের শেকড়কে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা। এই দীর্ঘ পথচলায় হয়তো জীবনের অনেক পরিকল্পনা বদলেছে, অনেক পরিচিত পরিবেশ পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু শিল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজও তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর গল্পের সৌন্দর্য এখানেই, তিনি কেবল অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকেননি; বরং অতীতের অর্জন ও অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমানেও নিজের সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করে চলেছেন।

অ্যাডিলেডের আকাশে বাংলার সুর: গোপালগঞ্জের শেকড়, বরিশালের শৈশব, ঢাকার কর্মজীবন আর অ্যাডিলেডের প্রবাস, জাফরিন জলিল তিথির জীবন যেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ভূগোল ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি সেতুবন্ধ। তাঁর জীবনকে শুধু একজন সংগীতশিল্পী, লেখিকা কিংবা কমিউনিটি ব্যক্তিত্বের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো গল্পটি ধরা পড়ে না। এর ভেতরে রয়েছে একজন শিক্ষিত নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা, পরিবারের মূল্যবোধে গড়ে ওঠা এক মননশীল মানুষের বিকাশ, শিল্পের প্রতি দীর্ঘদিনের ভালোবাসা এবং নতুন দেশে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার নিরন্তর প্রয়াস।
প্রবাসের জীবন মানুষকে নতুন ঠিকানা দেয়, কিন্তু পুরোনো স্মৃতিগুলো মুছে দেয় না। বরং কখনো কখনো দূরত্বই মানুষকে নিজের শেকড়ের প্রতি আরও গভীরভাবে সংবেদনশীল করে তোলে। নিজের ভাষা, গান ও সাহিত্য তখন হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। তিথির জীবনেও সেই শেকড়ের টান স্পষ্ট। বাংলাদেশের মাটি থেকে উঠে আসা তাঁর শিল্পীসত্তা আজ অ্যাডিলেডের সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজের মতো করে বেঁচে আছে। তাঁর গান, লেখালেখি ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে সেই সত্তা যুক্ত হচ্ছে অন্য মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে। জীবনের সব গল্পের শেষ বাক্য লেখা হয় না। কিছু গল্প সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়, নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়, নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ খুঁজে পায়। জাফরিন জলিল তিথির পথচলাও তেমনই এক চলমান গল্প। যে গল্পের শুরুতে ছিল মায়ের কণ্ঠে সুরের প্রথম পাঠ, বরিশালের পরিচিত আকাশের নিচে সাংস্কৃতিক জীবনের উন্মেষ; আর যার বর্তমান অধ্যায়ে রয়েছে অ্যাডিলেডের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বাংলা ভাষা, গান, সাহিত্য ও কমিউনিটির সঙ্গে নিবিড় সংযোগ।
দেশ থেকে দূরে থাকা যায়, কিন্তু দেশকে হৃদয় থেকে দূরে রাখা যায় না। হয়তো এই সত্যটিই তিথির জীবনপথের সবচেয়ে সুন্দর উপলব্ধি।
গান, শব্দ, স্মৃতি আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা, এই চারটি অনুষঙ্গকে সঙ্গী করে তাঁর পথচলা আজও অব্যাহত। আর সেই পথচলার প্রতিটি বাঁকে যেন নীরবে বেজে ওঠে এক চিরচেনা সুর, যে সুরে মিশে আছে বাংলাদেশ, শৈশব, মায়ের স্নেহ, শিল্পের সাধনা আর প্রবাসের আকাশে নিজের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।
Photo credit: Protik & Shuvo