অস্ট্রেলিয়ায় সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

অস্ট্রেলিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা আবারও বাড়ছে। কয়েক দশক ধরে সড়ক নিরাপত্তায় উন্নতি এবং দুর্ঘটনা কমানোর নানা উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। চলতি বছর দেশটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে সড়কে মৃত্যুর ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনারও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশটি সেই লক্ষ্যের বিপরীত দিকে এগোচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল ব্র্যাডলি এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, গাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উন্নত হয়েছে। সড়ক অবকাঠামোতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। তারপরও দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু বাড়তে থাকা একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ছয় বছর ধরে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা: ১৯৭০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এরপর সিটবেল্ট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে আইন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থার ফলে প্রায় চার দশক ধরে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। কিন্তু ২০২০ সালে সেই প্রবণতা পাল্টে যায়। এরপর থেকে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা গত ১৫ বছরের মধ্যে একই সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে টানা ষষ্ঠ বছরের মতো মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সড়ক নিরাপত্তা গবেষক মিলাদ হাঘানি মনে করেন, কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় অর্জিত অগ্রগতির একটি অংশ ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। তাঁর মতে, পথচারী, সাইকেল আরোহী ও মোটরসাইকেল চালকদের মতো অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি বাড়ছে। সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় তাঁদের সুরক্ষাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
একটি মৃত্যু বদলে দেয় পুরো পরিবার: সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। দুর্ঘটনায় প্রিয়জনকে হারানোর শোক অনেক পরিবারের জীবনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বদলে দেয়।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বর্দি সম্প্রদায়ের নারী ইয়োভন সাম্পি এমনই এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০১৭ সালে পরিবারের একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যাওয়ার পথে গাড়ি চালানোর সময় তাঁর ছেলে মারভিন ডেভি দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁর বয়স ছিল ৩১ বছর। মাছ ধরা ও ক্যাম্পিং করতে ভালোবাসতেন মারভিন। তিনি রেখে গেছেন একটি ছোট ছেলে। ছেলেকে হারানোর বেদনা স্মরণ করে ইয়োভন সাম্পি বলেন, সন্তান হারানো মায়েরা সাধারণত ভাবেন, কেন এমন ঘটনা ঘটল। তাঁর ভাষায়, এই ক্ষতি ভয়াবহ। এমন শোক কখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না।
আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তায় পিছিয়ে অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধিরও ভূমিকা রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, শুধু জনসংখ্যা বাড়ার বিষয়টি দিয়ে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় না।

প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও মোট মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তার বিভিন্ন সূচকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানের অবনতি হয়েছে।

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর রোড সেফটি রিসার্চের প্রধান অধ্যাপক তেরেসা সেনসেরিক বলেন, দুই দশকেরও কিছু বেশি সময় আগে অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সড়ক নিরাপত্তায় শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় ছিল। বর্তমানে দেশটি কোনোমতে শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে রয়েছে। স্পেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ শহরাঞ্চলে গাড়ির গতিসীমা কমানো, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগ জোরদার করে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমাতে পেরেছে। স্পেন শহরাঞ্চলের অনেক সড়কে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিসীমা চালু করেছে।

অধ্যাপক সেনসেরিকের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় গতিসীমা নির্ধারণের নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। অথচ এ সময়ে জনসংখ্যা, যানবাহনের সংখ্যা এবং গাড়ির আকার সবই বেড়েছে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও গতিসীমা ও সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এসব এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে তা প্রাণঘাতী হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
মদের চেয়ে মাদক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে: একসময় অস্ট্রেলিয়ায় প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান ঝুঁকি ছিল মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো। এখন সেই জায়গায় মাদক গ্রহণ করে গাড়ি চালানোর বিষয়টি বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।

অধ্যাপক মিলাদ হাঘানির মতে, প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের প্রায় ১৭ শতাংশের শরীরে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে বড় ও ভারী গাড়ির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পথচারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে। এ ধরনের গাড়ি চালকের জন্য কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়াতে পারে, কিন্তু পথচারীর সঙ্গে সংঘর্ষ হলে গুরুতর আঘাত বা মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যায়।
অধ্যাপক হাঘানি সহগবেষকদের সঙ্গে এ বছর প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, গাড়ির উচ্চতা প্রতি ১০ সেন্টিমিটার বাড়লে পথচারীর মৃত্যুর আশঙ্কা ১১ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, তুলনামূলকভাবে যুক্তিসংগত আকারের গাড়ি কেনার জন্য উৎসাহ এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু না করলে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তথ্যের ঘাটতি, নীতিনির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন: সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক অবকাঠামোয় সরকারি ব্যয়ের তথ্য এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য। বিভিন্ন অনলাইন ড্যাশবোর্ডে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও সড়ক উন্নয়নের তথ্য পাওয়া যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে।

অস্ট্রেলিয়ান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল ব্র্যাডলির মতে, গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের তথ্য প্রকাশে প্রায় তিন বছরের বিলম্ব রয়েছে। ফলে কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর জাতীয় লক্ষ্য থাকলেও প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে এত দীর্ঘ বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে, তা প্রমাণভিত্তিক তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা দরকার।

অস্ট্রেলিয়ার অবকাঠামো, পরিবহন, আঞ্চলিক উন্নয়ন, যোগাযোগ, ক্রীড়া ও শিল্পবিষয়ক বিভাগ জানিয়েছে, নিরাপদ যানবাহন বাজারে প্রবেশের তদারকি, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ এবং অন্যান্য সড়ক নিরাপত্তা উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার দুর্ঘটনা কমাতে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্বয়ংক্রিয় ও সংযুক্ত যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসব যানবাহন প্রযুক্তির সাহায্যে পথচারী ও অন্যান্য বিপদের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারবে। তবে নতুন প্রযুক্তির গাড়ি প্রচলিত গাড়ির বড় অংশের জায়গা নিতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ফলে শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বর্তমানের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।

অধ্যাপক তেরেসা সেনসেরিকের মতে, স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এখনই কার্যকর সড়ক নিরাপত্তানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—উন্নত গাড়ি, উন্নত সড়ক এবং বিপুল সরকারি বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষের মৃত্যু বাড়ছে, তা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা। সেই সঙ্গে গতিসীমা, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং পথচারীদের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায়, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সুত্র: ABC News