মেট্রিক পাশের পর প্রায় ৩.৫ যুগ আগের কোন এক বর্ষাস্নাত দিনে বাবার তত্ত্বাবধায়ন ছাড়াই রাজশাহী কলেজে ভর্তিফর্ম জমা দেয়ার উদ্দেশ্যে রাজশাহী গমন। নানারকম কল্পনা ও পরিকল্পনায় গতরাতে ভালো ঘুম হয় নাই। রাজশাহী যাওয়া অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক প্রতিবেশী গতরাতে আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে কিভাবে রাজশাহী কলেজ (পরি + অন্ত) পর্যন্ত পোঁছানো যাবে। বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যাওয়া যাবে না, বাস লেফট টার্ন নিয়ে গ্রেটার রোড ঢুকার আগেই সি এন্ড বি মোড়ে নেমে যেতে হবে। তারপর সোজা সামনের দিকে হাঁটতে হবে এবং হাঁটতে হাঁটতে
যখন হাতের ডানদিকে লাল বিল্ডিং দেখবে এটাই রাজশাহী কলেজ। খুব ভোর বেলায় মায়ের হাতে তৈরি কলাই এর রুটি খেয়ে, মেট্রিক পরীক্ষার সময় বানানো জাপানি কাপড়ের বেল-বটম প্যান্ট আর বড় কলার ওয়ালা টাইট শার্ট ( যা এখনকার মেয়েদের
কস্টিউম ডিজাইন) পরে, দরজায় মা বিদায় দিতে এসে লক্ষ্য করলো শার্টের ঘাড়ের সেলাই এমনকি প্যান্টের পকেটের সেলাই বিচ্যুত হয়ে গেছে। গ্রামের স্কুল শিক্ষক আমার বাবা এ প্যান্ট ও শার্টের পিস কাপড় রাজশাহীর সাহেব বাজারের কোনো এক দোকান থেকে কিনেছিলেন উনার এক বন্ধুর সহায়তা য়। রাজশাহী কাষটমস অফিসের সুপারভাইজার বাবার বন্ধুটির সঙ্গে সাহেব বাজারের কাপড়ের দোকানের মালিকের সখ্যতায় আমার বাবা কিছুটা কম দামেই জাপানি কাপড়ের পিস কিনেছিলেন। এতোদিনে ” মেইড ইন জাপান” সীল যুক্ত লো গ্রেডেড পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে এটা আমার
স্কুল শিক্ষক বাবার জানা ছিলো না। যা হোক, এক হাতে বোর্ড পেপারের তৈরী অফিস ফাইল আর অন্য হাতে একটা ছাতা নিয়ে মুড়ির টিন বাসে উঠে পড়লাম। সি এন্ড বি মোড়ে পোঁছা মাত্র বাসের হেলপার সিএনবি, সিএনবি বলে চিতকার, তাই সঠিক জায়গায় নামতে ভুল হলো না এবং সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। অনেক দূর হাঁটার পরও লাল বিল্ডিং না দেখে কিছুটা চিন্তায় পড়লাম। ফুটপাত থেকে দুই /তিন মিটার দূরে সাত আট জনের এক গুচ্ছ মেয়ে দেখে গুচ্ছের কাছে জানতে চাইলাম, রাজশাহী কলেজ আর কতদূরে! গুচ্ছের একটি মেয়েও কোন উত্তর দিলো না। ক্ষেত থেকে উঠে আসা এক যুবকের জন্য কারোই মনে একটু ভদ্রতার উদ্রেক হলো না দেখে অবাক হলাম। এটা কি তাহলে মফস্বল নগরায়ন মানসিকতায় নেতিবাচক মনস্তাত্বিকতায় তৈরি বিচ্ছিন্নতার বহিঃপ্রকাশ যা মানুষের ভিতর সহমর্মিতা কমিয়ে দেয়। আবার
হাঁটা শুরু করলে ‘রাজশাহী বিশব্বিদ্যালয়’ লেখা প্রগতির তৈরি একাধিক বাস হর্ন বাজিয়ে- কাঁদা পানি ছিটিয়ে – বাসের জন্য অপেক্ষামান মেয়েদের অহংকারের সঙ্গে মিল রেখেই বীরদর্পে আমাকে ক্রস করলো। হাতের ডানদিকে লাল বিল্ডিং দেখে খুশি হলাম। হাতে তৈরি সার্টিফিকেট ও মার্কশীটের কপি সত্যায়িত করার জন্য টিচার্স রুমে ঢুকতেই একজন শিক্ষক বললেন, আসো এবং উনি অতি যত্ন সহকারে
সত্যায়িত করে দিলেন। এর প্রায় ২.৫ বছর পরের কথা, ঢাকা বিশব্বিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক গুচ্ছ ছেলেমেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম,’ পোস্ট অফিস টা কোথায়? ‘ গুচ্ছের মধ্য থেকে এক মেয়ে বললো, আমার সঙ্গে আসো এবং সে আমাকে পোস্ট অফিস পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ২০ টাকার ক্রসড পোস্টাল অর্ডার কিনতে সাহায্য করেছিলো।
চিন্তা ও কল্পনায় রাজশাহী ইউনিভার্সিটি নিয়েই রাজশাহী ইন্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি ফর্ম জমা দিয়েই কাজলা গেইট দিয়ে রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে
প্রথম পদার্পণ। কোন দিকে হাঁটছি জানি না তবে মনোরম পরিবেশের পারিপার্শ্বিকতায় সুন্দর এক রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তা অনুভব করলাম। সম্ভবত ক্লাসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শাড়ী পরা দুজন মেয়ে খাতাপত্র হাতে রোকেয়া হলের দিক থেকে হেঁটে আসছে যা দেখে কিছুটা হতাশ হলাম। সবশেষ সবুজ লনে ফুলের বাগান বেষ্টিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বিপরীতে আমবাগানের এক টং দোকানে ৫০ পয়সার সিংগাড়া ও ৫০ পয়সার চা খাওয়ার কথা এখনো মনে পড়ে।
এবার আসি রাজধানীতে পদার্পণের গল্পে। সকাল পাঁচটায় বিআরটিসি বাসে রওয়ানা হয়ে পথিমধ্যে দুবার চাকা পাংচার আর নগরবাড়ী ঘাটের অপেক্ষার বিড়ম্বনা পেরিয়ে প্রায় রাত নয়টার দিকে সাইন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে নেমে পড়লাম। আমার সঙ্গের বন্ধু মফিজ হলে উপগেষ্ট হিসাবে থাকবে না। কারন তার নিজের চাচাতো বোন আজিমপুরের পলাশী ব্যারাকে থাকে এবং তার বাসায় না থাকলে চাচাকে অপমান করা হবে। তাই বন্ধুকে পলাশী ব্যারাকে রাখতে অগ্রজ শফিক ভাই সহ আমরা তিনজন এক রিক্সায় উঠে অবাক বিস্ময়ে দু’পাশের সুসজ্জিত ও আলোকিত শপিং মল দেখতে দেখতে পলাশী ব্যারাকে হাজির। শফিক ভাই আমাকে সারিবদ্ধ ব্যারাকের মাঝে কংক্রিটের তৈরি রাস্তায় রেখে বন্ধু মফিজকে নিয়ে বাসার নম্বর খুঁজতে গেলেন। মেইন রাস্তার দিক থেকে দুটি মেয়ে এত রাতে হেঁটে আসা আসা দেখে আমি অবাক বিস্ময়ে তাদের দিকে চেয়ে আছি। আমাক ক্রস করার সময় একটা মেয়ে বললো, ‘ দেখ দেখ নিপা কিভাবে চেয়ে আছে’। তার কথা শুনে কিছুটা ভয় পেলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখি তারা আবার আমার দিকে ফিরে আসছে। এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম আর ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে ব্যারাকের মধ্যের রাস্তা ছেড়ে মেইন রোডে এসে পলাশী ফায়ার ব্রিগেডের সামনে অবস্থানকে নিরাপদ মনে করলাম। তাদের ফিরা দেখে আমার মনে হয়েছিল “তাকানোর অপরাধে” তারা আমাকে গ্রামের কায়দায় শায়েস্তা করার জন্য লোকবল নিয়ে ফিরে আসছে, ঠিক ছোট বেলায় বড় চাচাতো বোনদের বডি গার্ড থাকাকালীন যে একশান গুলো আমি নিজেই নিয়েছি। দুর্ধর্ষ বড়বোন নাজলী আপার দিকে কেউ সামান্য অন্য নজরে তাকানোর সাহস করতো না। শান্তশিষ্ট আরেক বোনকে কেউ কিছু বললে তাকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব ছিলো আমার। সুযোগের অপেক্ষায় থেকে ঠিক সুযোগ পেলেই পিছন থেকে ইট বা লাঠি দিয়ে আচমকা এক ঘা মেরেই দৌড় এবং পরের কিছু দিন বাড়ি থেকে না বেরোনো। এদিকে শফিক ভাই বন্ধু মফিজকে তার বোনের বাসায় রেখে আমাকে জায়গামত না পেয়ে চিন্তায় পড়ে। এরপর অনেক দিন ঢাকায় বাস করে তৎকালীন ঢাকার জীবন যাত্রা দেখে বুঝতে পারলাম, পলাশী ব্যারাকের সেই মেয়ে দুটো তাদের রাত্রি কালীন ভাত খাবারের পর পুষ্টিবিজ্ঞানের ক্যালরি শক্তি ক্ষয়ের অভিপ্রায়ে হাঁটা হাঁটি করছিলো।
এবার বানিজ্য রাজধানী চট্টলা বা চাটগাঁও এ
পদার্পণের করে একটা রেস্তোরাঁয় এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে আছি। হোটেল বয় দুধের ছানার ফ্লোক ভাসমান এক কাপ চা আর দুটি পরাটা নিয়ে আমার সামনে রেখে দিলো। আমি তো শুধু চায়ের অর্ডার দিয়েছি বললে, হোটেল বয় অবাক ভংগীতে যার অর্থ শুধু চা খাওয়া লোক সে জীবনে দেখে নাই এরকম এক ভাব করে পরাটার প্লেট ফেরত নিয়ে গেলো। দেখি পাশের টেবিলের সবাই চা এর মধ্যে পরাটা ডুবিয়ে খাচ্ছে আবার কেউ পেঁয়াজু ও চায়ের মধ্যে ডুবিয়ে খাচ্ছে। ব্যাপারটা তখন অস্বস্তির কারণ হলেও ধীরে ধীরে আমি বেলা বিসকুট আর ছানার ফ্লোক ভাসানো চায়ের ভক্ত হয়ে গেলাম। আর চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া আমার মেয়ে তো রীতিমতো চায়ের মধ্যে আপেল ডুবিয়ে খাওয়া শুরু করলো। বর্তমানে এডিলেডে অভিজাত মারটিল ব্যাংক এলাকায় বসবাসকারী চট্টলার দম্পতি,ডলি মইন দম্পতির বাসায় মাঝে মাঝে বেলা বিসকুট আর মালাই চা খাওয়া হয়। চট্টগ্রামে থাকাকালীন বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিলো। সিডনি তে মেজবানের আয়োজন ইউ টিউবে দেখেছি।সিডনির মত এখানে এডিলেডে মেজবানের আয়োজন হলে ডলি মইন দম্পতির দাওয়াতের অপেক্ষায়।