কাকতালীয়তা ও মাটির গল্প

মতিউর রহমান: ১৯৮৮ সালের বন্যায় ঢাকা শহর বিপর্যস্ত ও স্কুল – কলেজ বন্ধ ঘোষণার পর অতি কষ্টে গ্রামের পোঁছলাম। পরের দিন বোন আর ভাগ্নিদের দেখার অভিপ্রায়ে গ্রাম থেকে ৫ মাইল দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক সরকারি আবাসিকে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বোনের দরজায় হাজির। দুলাভাই এখানে রিলিফ কর্মকর্তার দায়িত্বে। এমন সময় দেখি বোন তার কান্নারত ছোট মেয়েকে নিয়ে পাশের বাসা থেকে বের হচ্ছে। আমাকে দেখে বোন খুশীর সাথে সাথে আশ্চর্যও হলো কারন এসময় আমার গ্রামে আসার কথা না। বোন বললো ‘ পাশের বাসার ভাবি আলু সিদ্ধ করে ছুলে রাখছিল আর তোর ভাগ্নি তা দেখে মিষ্টি খাবো মিষ্টি খাবো বলে কান্নাকাটি।” চমৎকার এক কাকতালীয় ঘটনা, ভাগ্নি মিষ্টি খাবো মিষ্টি খাবো করে কান্নাকাটি আর মামা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে হাজির।
দুপুরে খাবারের মাঝে এনালগ টেলিফোনের ক্রিংক্রিং
আওয়াজে দুলাভাই রিসিভার উঠিয়ে স্যার – জি স্যার- জি স্যার- স্যার- জি স্যার! এবং অতিরিক্ত চিন্তা নিয়ে আবার খাবার টেবিলে বসলো। টেলিফোনে উর্ধতন কর্মকর্তার নির্দেশ ছিলো, বন্যার্তদের রিলিফ হিসাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলার জন্য বরাদ্দকৃত ২০ মেট্রিক টন চাল তাকে রিসিভড সিগনেচার করতে হবে। ২০ মেট্রিক টন চাল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ঢুকবার আগেই বিদিরপুর নামক স্থানে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাবে। তবে উর্ধতন কর্মকর্তা বিতরন নিয়ে চিন্তা না করার জন্য দুলাভাইকে আশ্বস্ত করেছিলেন। আবুল মুনসুর আহমেদের ‘ ফুড কনফারেন্স ‘উপন্যাসটা উর্ধতন কর্মকর্তার পড়া ছিলো, তাই তো রিলিফের চাল রিলিফ ক্যাম্পে এনে ঝামেলা করেননি।

২০০২ সালের দিকে এআইটি, ব্যাংককে থাকাকালীন এক আড্ডায় ময়মনসিংহ এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের একজন
প্রাক্তন ছাত্রী নুপুর আপাকে জিজ্ঞাসার ভংগীতে বললাম ” আপা ইউনিভার্সিটিতে আপনাকে
প্রাকটিকালে ফেল করাই নাই”! আপা কুমিল্লার টোনে ” করাইছিলো, তাজুললা ফাস্ট ইয়ারে আমারে প্রাকটিকালে ফেল করাইছিলো কিন্তু আপনি জানলেন কেমনে? হেরপর নাবিলের আব্বা ব্যাপারটা বাদশাহ ভাইকে বললে বাদশাহ ভাই তাজুললাকে থ্রেট দিয়া হেটা উইথড্র করাইছে”। টিচার তাজুলের ব্যাচমেট পিএইচডিরত সমীরদার বর্ণনায় তাজুল টিচার হওয়ার পর গরমকালেও কোর্টের সঙ্গে টাই বেঁধে ক্লাসে যেতেন। আমি নুপুর আপাকে প্রশ্ন করলাম আর এটা কাকতালীয় ভাবে মিলে যাওয়ার পিছনে আছে আমার “এগ্রিদোস্ত” দের কাছে শোনা
ময়মনসিংহ এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির মাটির গল্প।
গল্পের ইন্ট্রোডাকশন হচ্ছে, টিচাররা ইউনিভার্সিটির সুন্দরী মেয়েদের সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয় আর কেউ প্রস্তাবে রাজি না হলে প্রাকটিকালে ফেল করিয়ে দেয়। তাইতো এগ্রিকালচারের জটিল পাঠক্রিয়াদির সহজ বৈতরণী পারের ইচ্ছায় অথবা
প্রাকটিকালে ফেল করার রিস্ক না নিয়ে অনেক সুন্দরী ছাত্রী হয়তোবা মনের বিরুদ্ধেই একই ডিপার্টমেন্টের টিচারকে বিয়ে করেন। এ মাটির আরও গল্প হচ্ছে – ব্রহ্মপুত্রের পাড়, ফুলের বাগান, আর সারিবদ্ধ গাছের সতেজ স্থাপত্য, সব মিলিয়ে এক রোমান্সময় পরিবেশ যা এখানে আগত অনেকের পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং মস্তিষ্কের মধ্যে বিবাদ ঘটিয়ে দিতে পারে।

খুব ছোটো বেলায় দাদী যেখানে যেতেন আমাকে সঙ্গে নিতেন। একদিন শুক্রবার বিকেলে দাদীর ভাতিজা ছইওয়ালা গরুর গাড়ি নিয়ে হাজির কারন উনার বড় মেয়ের আজ রাতেই বিয়ে পড়ানো হবে এবং তিনি তার ফুপুকে ছাড়া এ বিয়ে দিবেন না।চাচার ভাষ্যমতে, ভিনগ্রামের এক ডাবল টাইটেল প্রাপ্ত আলেম আজ তাদের মসজিদে চমৎকার জুম্মা র খুতবা দিয়েছে এবং জুম্মা শেষে তিনি বিয়ে করার জন্য পাএী খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন। তাই চাচা এমন যোগ্য আলেম পাএ হাতছাড়া করতে চান না এবং বিয়ের বড় অনুষ্ঠান পরে করবেন। দাঁড়িওয়ালা মর্ষকামী ইমাম বা ইসলামিক বক্তা পাএকে দেখে এসে আমি বারান্দায় বসা দাদীকে চুপিচুপি বললাম, এ শালার আগের কয়টা বহু আছে না জেনেই তোমরা বিহা দিচ্ছো’! দাদী- ‘ এ কি কহছিস, চুপ কর, চুপ কর, আর কহবি না। এত আদরের ছাইলা, এরা কি না জাইনা বিহা দিছে’। এর কয়েক দিন পর ধুমধাম অনুষ্ঠানের দিন বাড়ির পিছনে আম গাছের গুড়ির উপর বসে চাচীর গুমরে গুমরে কান্না। অনান্য সবাই মেনে নিলেও চাচী তার মেয়ের সতীনের ঘর মেনে নিতে পারছিলেন না। বিয়ে পড়ানোর দিন দাদীকে বলা আমার সতর্ক বার্তা কাকতালীয় ভাবে মিলে যাওয়ার পিছনে ছিলো আমার ছোট বেলার সোসাইটি কে দেখার অবজারভেশন। আমি দেখতাম হুজুরেরা খুব কম বয়সে বিয়ে করে এবং একাধিক বিয়ে করে।

এবার আসি শুধুই মাটির গল্পে। ঢাকা শহরে আসার প্রথম দিকে আমি আমার গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামের ( অলিখিত হাই স্কুল জোনের গ্রাম) যারা ঢাকায় থাকে তাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করতাম। আমার গ্রামের এক বড় ভাই বিডিআর পিলখানায় সৈনিক পদে কর্মরত তাই তার সঙ্গে দেখা করার জন্য
পিলখানার নিউমার্কেট গেইটে হাজির।
সিকিউরিটি হাটে ডিউটি গার্ড আমাকে প্রশ্ন করলো, বারী কোথায়? আমি বললাম, রাজশাহী। উনি বললেন, রাজবারী। আমি আবার বললাম, রাজশাহী। আমরা রাজশাহীর লোক ঠিক মত রাজশাহী উচ্চারন করতে পারিনা বলে উনি এনট্রি
খাতা এগিয়ে দিলেন। দেখলাম তারা ১০/১২ বছরের একটা মেয়েকে সিকিউরিটি হাটে আটকে রেখেছে। সাহসী মেয়েটি বার বার বলছে সে থাকবে না, সে যশোহোর চলে যাবে। একজন বিডিআর সদস্য তাকে কাউন্সিলিং করছে, ‘ হেই তুই তো মেজর সাবের বাসায় ভালো আছোত, যাবি কিল্রে। হঠাৎ দেখি মেজর সাব অন্য রকমের এক বিশাল মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির এবং বিডিআর সদস্যরা জোর করে মেয়েটিকে মেজরের পিছনে বসিয়ে দিলো। আমি রাস্তা ধরে ভিতরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। দেখলাম সামনের এক আবাসিক বিল্ডিংয়ের সামনে মেজর সাব থামলেন এবং এ আবাসিক ভবন অতিক্রম করার সময় রাগান্বিত মহিলা কন্ঠের চিৎকার আর বাচচা মেয়ের আর্তচিৎকার কানে আসলো। নিশ্চিত নয় তবে মনে হলো পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে মেজরের বৌ সেই মেয়ে টিকে পেটাচ্ছেন হয়তো। গ্রামের বড়ো ভাই আমাকে দেখে মহাখুশি এবং সে আমাকে সেনানিবাসের বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো।
একটা মাঠে গিয়ে বড় ভাই একটা মঞ্চ দেখিয়ে গল্প বলা শুরু করল এবং তার কথা শুনে মনে হলো একানখার মাটিরই প্রচলিত গল্প এটা। সুতরাং নতুন যে আসুক তাকে এ গল্প শুনতেই হবে। এক বিডিআর সপ্তাহের কালচারাল পোগ্রামে দেশের এক প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী উগ্র বসনে গান পরিবেশনকালে পিলখানা আধা ঘণ্টা ব্লাক আউট ছিলো। এ গল্পকে মনে হলো সিপাহিদের অসম্মান জনক কাজের পারিপার্শ্বিকতায় তৈরি হওয়া দমিত মানসিকতার ধারবহিক গল্প। আবার কেন জানি মনে হলো সে সময়টার কথা যখন মৌসুমি চ্যাটার্জির রিম ঝিম ঘিরে শাওন গানের সেই হাই গ্লামার স্টাইলে মসৃণ আর চিক্কণ জর্জেট বা শিফন শাড়ী পড়া যা অনুকরন করেই হয়তো বা আমার দেশের মহিলারা এক অদ্ভুত কস্টিউম ফ্যাশনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলো।

এবার অন্য এক মাটির গল্প। বিসিআইসির নিয়োগ পত্র নিয়ে নতুন কর্ম স্থল কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড (কেপিএম) চন্দ্রঘোনায় যোগদান রিপোর্টের পর এডমিন ম্যানেজার গেষ্ট হাউজের সুপার ভাইজার কে ফোন করে – একটা ভাংগা চোরা জিপ গাড়ি দিয়ে পাহাড়ের উপরে গেষ্ট হাউজে পাঠিয়ে দিলেন। সেদিন রাতে ডিনারের পর সোফায় বসে টিভি দেখাকালীন সুপার ভাইজারের কাছে এলাকার সবকিছু জানতে চাইলে সে কেপিএম এর মাটির গল্প শুনানো শুরু করলো। শিল্পের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার ওয়াইফের ইচ্ছা হলো তিনি কোন এক দরগাহতে শিন্নি অর্থাৎ চার ডেকচি ফিরনি দিবেন এবং এটা তিনি কেপিএম এর গেষ্ট হাউজ থেকে নিবেন। নির্ধারিত দিনের আগের রাতে উনি কেপিএম গেষ্ট হাউজে হাজির এবং প্রটোকলে আছেন জেনারেল ম্যানেজার, এডমিন । চার ডেকচি ফিরনি রেডি এবং পরিবহনের গাড়িও রেডি। কোয়ালিটি পরীক্ষার জন্য উনি এক চামচ ফিরনি মুখে দিয়েই সবার সামনে
এডমিন জেনারেল ম্যানেজারের গালে কোষে এক থাপ্পড়। এ ফিরনি দরগায় দেয়া যাবে না। তখন গল্পকারী গেষ্ট হাউজের সুপার ভাইজার অতি দ্রুততার সাথে বাজারে অবস্থিত তার মালিকাবাধীন মুদি দোকান থেকে মাল সামালা সংগ্রহ করে এবং এডমিন জেনারেল ম্যানেজারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে
আবার চার ডেকচি ফিরনি রান্না করা হয়। যা হোক গল্প শুনে রাতে ঘুমাতে গেলাম। এর আগে কোনো দিন রেষ্ট হাউজ বা হোটেলে থাকি নাই তাই সাদা বেড কাভার, সাদা বালিশের কাভার, সাদা তোয়ালে আর গায়ে দেয়ার জন্য সাদা চাদর- এত সব সাদার পবিত্রতায় মনটা ভারী হয়ে গেলো। চিত্পটান হয়ে গায়ে চাদর জড়ানোর সময় খেয়াল করলাম, রুমের কর্নারে এক বিরাট ফাটল। ছোট বেলায় দাদী বলত, পেত্নীরা অশরীরী আত্মা তাই তারা ঘরের ফাটল বা ফাঁকের মধ্যেই বাস করতে পারে। ঘুমের মধ্যে ভয়ার্ত সপ্নে বুকে চাপ ধরার উপক্রম। শিল্পের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার ওয়াইফের হঠাৎ কেপিএম গেষ্ট হাউজে হাজির এবং উনার হুকুম – সবাই কে গেষ্ট হাউজ ছেড়ে দিতে হবে। এখানে কেউ থাকতে পারবে না। দরজায় আঘাতের শব্দ। সপ্নের ভয়ার্ততা থেকে রক্ষা পেতে জোর করে ঘুম থেকে জেগে ওঠার চেষ্টা করতেই সুপার ভাইজারের কন্ঠ,’ স্যার তাড়াতাড়ি উঠেন, অফিসের গাড়ি পাহাড়ের উপর একবারেই আসে, এটা মিস করলে বিপদ’!