অবৈধ সিগারেট বিক্রি, বাড়িওয়ালারও হতে পারে এক বছরের জেল

অবৈধ সিগারেট ও তামাকের ব্যবসা বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়া রাজ্য সরকার। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, অবৈধ তামাকের ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১৭ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আর কোনো বাড়িওয়ালা জেনেশুনে তাঁর ভাড়া দেওয়া দোকানে অবৈধ তামাকের ব্যবসা চলতে দিলে এবং এ অপরাধে দ্বিতীয়বার দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক পরিমাণে অবৈধ তামাক মজুত বা সরবরাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ কোটি ১০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবৈধ তামাক বিক্রির সঙ্গে জড়িত দোকান দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এটিএম মেশিন নিষিদ্ধ করা এবং বাড়িওয়ালাদের দায়িত্ব বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও রয়েছে প্রস্তাবে।

গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সাউথ অস্ট্রেলিয়া সরকার এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের প্রস্তাব ঘোষণা করে। চলতি সপ্তাহে রাজ্য পার্লামেন্টে প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের কথা রয়েছে। খবর এবিসি নিউজের।
অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধ তামাকের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং এর সঙ্গে জড়িত সংগঠিত অপরাধী চক্রের কার্যক্রম বন্ধ করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। রাজ্য সরকারের ভাষ্য, অবৈধ তামাকের ব্যবসা শুধু রাজস্ব হারানোর কারণ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার অবৈধ তামাকের বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। এ পরিস্থিতিতে শুধু অবৈধ পণ্য জব্দ বা দোকান সাময়িকভাবে বন্ধ করে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বন্ধ হওয়া কিছু দোকান আবার কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ পাচ্ছে। রাজ্য সরকারের নতুন উদ্যোগে তাই ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী, দোকান পরিচালনাকারী এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকার বলছে, নতুন বিধানগুলো কার্যকর হলে অবৈধ তামাকের ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে অপরাধে ব্যবহৃত দোকানঘর বন্ধ রাখা এবং বাড়িওয়ালাদের মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসা বন্ধে চাপ তৈরির সুযোগ বাড়বে।

প্রস্তাবিত আইনে অবৈধ তামাকের ব্যবসায় জড়িত অপরাধীদের জন্য পাঁচ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হবে। বাণিজ্যিক পরিমাণে অবৈধ তামাক সরবরাহ বা মজুতের ক্ষেত্রে জরিমানাও বাড়ানো হচ্ছে। বড় বাণিজ্যিক পরিমাণের অবৈধ তামাকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৬৬ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ১০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, সরবরাহ ও মজুতসংক্রান্ত নির্দিষ্ট অপরাধে জরিমানা ২০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭৫ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার করা হবে। এখানে উল্লেখ্য, সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে এক নয়। অপরাধের ধরন, তামাকের পরিমাণ এবং আইনের নির্দিষ্ট বিধানের ওপর শাস্তি নির্ভর করবে। নতুন প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাড়িওয়ালাদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো। এত দিন ভাড়া দেওয়া কোনো দোকানে অবৈধ তামাকের ব্যবসা চললে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাদের ভূমিকা নিয়ে আইনি সীমাবদ্ধতা ছিল বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।

নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো বাড়িওয়ালা জেনেশুনে তাঁর সম্পত্তি অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ দিলে এবং একই অপরাধে দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে যুক্তিসংগত পদক্ষেপও প্রত্যাশা করা হবে। উদাহরণ হিসেবে, ভাড়া দেওয়া জায়গায় অবৈধ ব্যবসার বিষয়ে জানতে পারলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত কর্মকর্তাকে জানাতে হতে পারে। এ ধরনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ১ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে এ ছাড়া কোনো দোকানের বিরুদ্ধে বন্ধের আদেশ কার্যকর থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালা সেই দোকানের ভাড়ার চুক্তি বাতিল করতে পারবেন। আগে এ সুযোগ মূলত দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের আদেশের ক্ষেত্রে সীমিত ছিল।

রাজ্যটির পুলিশমন্ত্রী মাইকেল ব্রাউন বলেন, বাড়িওয়ালাদের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের দায়িত্বও বাড়ানো হচ্ছে। অবৈধ তামাকের ব্যবসা চলতে দেখেও যাঁরা ব্যবস্থা নেবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। অবৈধ তামাক বিক্রির অভিযোগে দোকান বন্ধ রাখার সময় বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে নতুন আইনে। বর্তমান ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদে ২৮ দিনের জন্য দোকান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া যায়। নতুন প্রস্তাবে সর্বোচ্চ ১৩০ দিনের মধ্যমেয়াদি বন্ধের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা যুক্ত হবে। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে সাত দিনের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ এবং ২৮ দিনের স্বল্পমেয়াদি আদেশের ব্যবস্থাও থাকবে। আদালতের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের সর্বোচ্চ সময় ১২ মাস রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের যুক্তি, স্বল্প সময়ের জন্য দোকান বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ীরা আবার দোকান চালু করতে পারেন। দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ রাখার সুযোগ থাকলে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

তবে নতুন ক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অবৈধ তামাকবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সাবেক ফেডারেল পুলিশ কর্মকর্তা রোহান পাইক। তাঁর মতে, কঠোর আইন প্রণয়ন এবং সেই আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়। দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ রাখার বিধান থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল ও নজরদারি না থাকলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

অবৈধ তামাকের ব্যবসায় নগদ লেনদেনের ব্যবহার কমাতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া তামাক বিক্রি বা নিষিদ্ধ পণ্য সরবরাহে জড়িত হিসেবে শনাক্ত কোনো খুচরা বিক্রেতার প্রতিষ্ঠানে এটিএম মেশিন রাখা নিষিদ্ধ করা হবে। সরকারের ধারণা, নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল অবৈধ ব্যবসার কার্যক্রম সীমিত করতে এ পদক্ষেপ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া গেলে পরিদর্শনের সময় সেখানে থাকা সব তামাক ও ই-সিগারেটজাত পণ্য জব্দ করার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পণ্যগুলো বৈধ না অবৈধ, তা আলাদাভাবে প্রমাণের অপেক্ষা না করেই নির্দিষ্ট আইনি শর্তে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তামাক বিক্রির নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি দোকানের অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি একটি লাইসেন্সধারী তামাক বিক্রির দোকানের কাছাকাছি আরেকটি দোকান স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

অবৈধ তামাকবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা রোহান পাইক মনে করেন, আগের পদক্ষেপগুলো অবৈধ ব্যবসা ঠেকাতে যথেষ্ট হয়নি। তাঁর ভাষ্য, নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, রাজ্য সরকারগুলো অবৈধ তামাকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ক্রমাগত কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। তবে শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিলেই অপরাধ কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে ১৩০ দিনের দোকান বন্ধের আদেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পর্যাপ্ত সম্পদ ও জনবল না থাকলে নতুন বিধান বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে রাজ্যটির বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাশটন হার্ন অবৈধ তামাকের ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অল্প সময়ের জন্য দোকান বন্ধ করে দেওয়ার পর সেগুলো আবার চালু হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। তবে প্রস্তাবগুলো পার্লামেন্টে উত্থাপিত হলে তাঁর দল বিস্তারিত পর্যালোচনা করবে।

অবৈধ তামাকের বাজার নিয়ন্ত্রণে বৈধ সিগারেটের ওপর কর কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সাউথ অস্ট্রেলিয়া সরকার। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, বৈধ তামাকের ওপর কর কমানোর সিদ্ধান্ত ফেডারেল সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। তা ছাড়া সিগারেটের দাম কমালে ধূমপানের হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

রাজ্যটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্লেয়ার বয়্যার এ বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ক্যানসার কাউন্সিল সাউথ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ক্রিস্টিন মরিসও মনে করেন, সিগারেট সস্তা হলে ধূমপানের হার বাড়তে পারে।
এদিকে অবৈধ সিগারেট কেনার জন্য ধূমপায়ীদের জরিমানা করার প্রস্তাবও আগে আলোচনায় এসেছিল। তবে রাজ্য সরকার আপাতত ক্রেতাদের জরিমানা করার পরিকল্পনা করছে না বলে জানিয়েছে। সরকারের মতে, বর্তমান পর্যায়ে ধূমপায়ীদের জরিমানা করা যুক্তিসংগত হবে না।

সাউথ অস্ট্রেলিয়া সরকার ১৩ অক্টোবর আইন সংশোধনের প্রস্তাব ঘোষণা করেছে। প্রস্তাবগুলো রাজ্য পার্লামেন্টে উত্থাপনের কথা রয়েছে। ফলে ঘোষণার দিনেই সব বিধান কার্যকর হয়ে গেছে—এমন নয়। পার্লামেন্টে প্রস্তাবগুলোর পরবর্তী অগ্রগতি এবং আইন হিসেবে অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে নতুন বিধান কবে থেকে কার্যকর হবে। প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে অবৈধ তামাকের ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি বাড়বে, দোকান বন্ধ রাখার সময় দীর্ঘ হবে এবং বাড়িওয়ালাদের দায়িত্বও আরও স্পষ্ট হবে। তবে অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে এসব পদক্ষেপ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আইন প্রয়োগ, নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতার ওপর।

সূত্র: এবিসি নিউজ, ১৩ অক্টোবর ২০২৬; সাউথ অস্ট্রেলিয়া সরকারের কনজিউমার অ্যান্ড বিজনেস সার্ভিসেস বিভাগ।