আফ্রিকার রঙিন দুয়ার: মরক্কোর দিনগুলি—পর্ব ৭

রাবাত আগদাল স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডান দিকে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে আমার নতুন ঠিকানা। দার আল ফানুস, অর্থাৎ ‘লণ্ঠনের বাড়ি’। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপারে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর হঠাৎ খেয়াল হলো, অস্ট্রেলিয়ার অভ্যাসে হিসাবটা উল্টো করে ফেলেছি! মরক্কোয় গাড়ি চলে রাস্তার ডান পাশ দিয়ে; চালকের আসন বাঁ দিকে। অগত্যা আবার সেই ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে অন্য পাশে এসে দাঁড়ালাম।

হাত তুলতেই একটি লাল পেতি ট্যাক্সি থামল। আমার কাছেই বাইশ-তেইশ বছরের একটি মেয়েও ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনেই একই ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম। আগে যেমন বলেছি, এ দেশে একই ট্যাক্সিতে একই সময়ে একাধিক যাত্রী উঠতে পারে। গন্তব্য কাছাকাছি হলে চালক পথে অন্য যাত্রীও তুলে নেয়, আর প্রত্যেকের ভাড়া আলাদাভাবে হিসাব করা হয়।

সহযাত্রীর সঙ্গে কথা না বলে পাশাপাশি বসে থাকা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। বাসে, ট্রেনে, প্লেনে কিংবা জাহাজে, সুযোগ পেলেই দু-চার কথা বলার চেষ্টা করি। সেই সামান্য আলাপ কখনো কখনো আবার সারা জীবনের সম্পর্কেও গড়িয়েছে। আমার প্রিয় অনেক মানুষের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল পথেই।

সহযাত্রীর সঙ্গে কথা না বলে পাশাপাশি বসে থাকা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। বাসে, ট্রেনে, প্লেনে কিংবা জাহাজে, সুযোগ পেলেই দু-চার কথা বলার চেষ্টা করি। সেই সামান্য আলাপ কখনো কখনো আবার সারা জীবনের সম্পর্কেও গড়িয়েছে। আমার প্রিয় অনেক মানুষের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল পথেই।

সম্ভবত এই অভ্যাস (কিংবা বদভ্যাস!) পেয়েছি গ্রামের বাড়ি বরিশালের হওয়ার সুবাদে। বিশেষ করে আমার আম্মার কাছ থেকে। ছোটবেলায় ঢাকা-বরিশাল রাতের লঞ্চে যাতায়াতের সময় মেঝেতে চাদর বিছিয়ে আমরা যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য ছোট্ট সংসার পেতে বসতাম। লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে এগোতে না এগোতেই আম্মা পাশের পরিবারের সঙ্গে মধুর আলাপ জমিয়ে ফেলতেন; যেন কতকালের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়! আব্বা ছিলেন বেশ রিজার্ভড স্বভাবের। মাঝেমধ্যে চোখের ইশারায় আম্মাকে একটু মিতভাষী হতে বলতেন, কিন্তু আম্মা ওসব সতর্কতার খুব একটা পরোয়া করতেন না। এক ঘণ্টার মধ্যেই দুই পরিবারের নাড়ি-নক্ষত্রের খোঁজখবর নেয়া হয়ে যেত। কখনো কখনো আরও দু-একটি পরিবারও সেই আলাপচারিতায় যোগ দিত।

‘অমুককে চেনেন?’
‘আরে, উনি তো আমার চাচাতো বোনের দেবরের শ্বশুর!’
‘তাই নাকি! তাহলে তো আপনি আমার আত্মীয়ই হন। বেয়াই লাগেন!’

কখনো আবার—

‘আপনি কি আক্কেল আলী ফকিররে চেনেন? রুস্তমের বাপ। কাডাখালী বাড়ি।’
‘না, ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না।’
‘আরে, আপনে তারে চেনেন! তাগো বাড়িতেও আপনে গেছেন। নতুন টিনের ঘর, সামনে বড় একটা পুকুর আছে…।’

লঞ্চ পদ্মায় পড়তে পড়তে, অর্থাৎ চাঁদপুরের কাছাকাছি যাওয়ার আগেই, সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে যেত। টিফিন ক্যারিয়ারে করে আনা তরকারি বিনিময় হতো, সুখ-দুঃখের গল্প হতো, একে অন্যকে বাড়িতে যাওয়ার দাওয়াত দেওয়া হতো। আরও কত কী! আমার ধারণা, অচেনা মানুষের সঙ্গে সহজে আলাপ জমানোর এই স্বভাবটা আমি মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি।

পাশের মেয়েটিকেও জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি রাবাতের স্থায়ী বাসিন্দা?’

বেশ ভালো ইংরেজিতে বলল,

‘না, এখানে পড়াশোনা করি। বাড়ি কাসাব্লাঙ্কার কাছের একটি শহরে।’

‘কী পড়ছ?’

‘ফিল্মমেকিং।‘

ফিল্মমেকিং!

আলাপের জন্য এর চেয়ে ভালো বিষয় আর কী হতে পারে!১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কলকাতায় থাকার সময় আমি আর্ট ফিল্মের প্রচণ্ড ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। পরে দেশে ফিরে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করি। দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিও বানিয়েছিলাম। চলচ্চিত্রের ইতিহাস আর নির্মাণকৌশল নিয়ে অসংখ্য বই ছিল আমার সংগ্রহে। ইতালীয় নিওরিয়ালিজম, ফরাসি নিউ ওয়েভ, জার্মান এক্সপ্রেশনিজম, সোভিয়েত মন্টাজ, এসব শব্দ তখন প্রায় মুখস্থ। আইজেনস্টাইন, কুরোসাওয়া, রেনোয়া, ফেলিনি, তারকোভস্কি, হিচকক, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক। কত পরিচালকের ছবি যে দৃশ্য ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেছি! কোনো এক কারণে ১৯৯৮ সালে সেই জগৎটা একেবারে ছেড়ে দিই। মেয়েটি ফিল্মমেকিং পড়ছে শুনে বহুদিন চাপা পড়ে থাকা সেই পুরোনো জগতটার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার হলো।

জিজ্ঞেস করলাম,
‘ইতালির ভিত্তোরিও দে সিকার বাইসাইকেল থিভস দেখেছ?’
‘অরসন ওয়েলসের সিটিজেন কেইন?’
‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন-এর সেই বিখ্যাত সিঁড়ির দৃশ্য?’

‘সত্যজিৎ রায়ের নাম জানো? তিনি বাঙালি ছিলেন। আমার মতোই।’ কণ্ঠে বেশ গর্বের সুর।

সে শুধু মাথা নাড়ল। হিচকক ছাড়া আর কারও নাম শোনেনি।

অন্যদের না চিনলেও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ফিল্মমেকিং নিয়ে পড়ছে অথচ সত্যজিৎ রায়ের নামও শোনেনি? মনটা খারাপ হলো। খানিকটা অভিমানের সুরে বললাম, ’সময় পেলে গুগলে সত্যজিৎ রায় নামটা খুঁজে দেখো।’

সিনেমার ইতিহাসের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহটা উবে গেল। মেয়েটি হয়তো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ছে; আর্ট ফিল্মের এইসব পুরোনো নাম জানা তার কাছে জরুরি নাও হতে পারে।

জানালার বাইরে তাকালাম। প্রশস্ত রাস্তা; অ্যাভিনিউ দ্য মাদাগাস্কার। দুপাশে সাদা রঙের আবাসিক ভবন, দোকানপাট, আধুনিক বাণিজ্যিক স্থাপনা; কোথাও কোথাও আবার বয়সের ছাপ ধরা বিবর্ণ দেয়াল। পুরোনো ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের স্পষ্ট প্রভাব। প্রচুর গাছপালা। বেশ পরিপাটি আর ছিমছাম। মরক্কোর যে দুটো বড় শহর এ পর্যন্ত দেখেছি, দুটোতেই পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিক শহুরে জীবনের মিশ্রণটা চোখে পড়েছে।

জানালার বাইরে তাকালাম। প্রশস্ত রাস্তা; অ্যাভিনিউ দ্য মাদাগাস্কার। দুপাশে সাদা রঙের আবাসিক ভবন, দোকানপাট, আধুনিক বাণিজ্যিক স্থাপনা; কোথাও কোথাও আবার বয়সের ছাপ ধরা বিবর্ণ দেয়াল। পুরোনো ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের স্পষ্ট প্রভাব। প্রচুর গাছপালা। বেশ পরিপাটি আর ছিমছাম। মরক্কোর যে দুটো বড় শহর এ পর্যন্ত দেখেছি, দুটোতেই পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিক শহুরে জীবনের মিশ্রণটা চোখে পড়েছে।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্যাক্সি আমাকে নামিয়ে দিল মদিনার উল্টো পাশের রাস্তায়। বেলা তখন দুটো। গনগনে রোদ, আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। গরম বেশ, তবে অসহনীয় নয়। মদিনার সরু অলিগলির ভেতরে যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল নেই বললেই চলে, তাই সেখান থেকে বাকিটা পথ হেঁটেই যেতে হবে।

রাস্তা পার হয়ে স্যুটকেস টানতে টানতে গুগল ম্যাপ সামনে ধরে ঢুকে পড়লাম মদিনার ভেতর। স্যুটকেসের চাকাগুলো অসমান পাথরের ওপর কখনো গড়াচ্ছে, কখনো আটকে যাচ্ছে। সরু গলির দুই পাশে ছোট ছোট দোকান। কোথাও পোশাক, কোথাও জুতা, মসলা, কাবাব, রুটি, মাছভাজা, সুগন্ধি, ফল, দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র। অগণিত মানুষ এদিক-ওদিক ছুটছে, কেনাকাটা করছে, দোকান আর খাবারের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

আমাকে নতুন পর্যটক বলে চিনে ফেলে দোকানিরা কেউ কেউ হাতের ইশারায় ইংরেজি-ফরাসি মিশিয়ে ডাকছেন—’কাম, কাম!’, ‘গুড প্রাইস!’, ‘লুক, মাই ফ্রেন্ড!’, ‘বঁজুর, মসিয়্যু!’, ‘ভনে, ভনে!’, আমার অবশ্য কোনো ডাকেই সাড়া দেওয়ার ফুরসত নেই। একটাই কাজ; গুগল ম্যাপের নীল বিন্দুটাকে ঠিক পথে রেখে দার আল ফানুস খুঁজে বের করা।

এক গলি থেকে আরেক গলি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম দার আল ফানুসে। বাইরে থেকে প্রথম দেখায় জায়গাটিকে হোটেল বলে মনে হওয়ার উপায় নেই। বালুরঙা দেয়ালের মাঝে খিলান করা, জ্যামিতিক নকশায় সাজানো প্রবেশপথ; তার ভেতরে ভারী কাঠের দরজা। দরজা জুড়ে সারি সারি ধাতব পেরেক আর পুরোনো আমলের বড় কড়া। পাশে কাঠের কারুকাজ, ওপরে ঝোলানো একটি লণ্ঠন। নামফলকে আঁকা একটি আলাদিনের চেরাগ। আচ্ছা, এ জন্যই বাড়িটির নাম ‘দার আল ফানুস’! ভাষার ইতিহাস কত অদ্ভুত! বাংলাতেও ‘ফানুস’ শব্দটি আছে। ছোটবেলা থেকে শুনে আসা আমাদের পরিচিত ফানুস কাগজের তৈরি ঘুড়ির মতো হালকা এক ধরনের লণ্ঠন। ভেতরে ছোট্ট আগুন জ্বালালে ধীরে ধীরে আকাশে ভেসে ওঠে। গ্রিক phanós থেকে আরবিতে ‘ফানুস’ হয়ে, বহু পথ ঘুরে বাংলাতেও জায়গা করে নিয়েছে।

কড়া নাড়তেই দরজা খুলে স্বাগত জানাল হাসিমুখের এক ভদ্রমহিলা। মাথায় হিজাব।

‘আহলান!’

দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই লম্বা সরু করিডর। মেঝে জুড়ে রঙিন জেলিজ মোজাইক টাইলস, তার ওপর লাল কার্পেট। সাদা দেয়ালে কয়েকটি ছবি, মাথার ওপরে মেহগনি রঙের কাঠের বিম। এক পাশে রাখা মরক্কান ধাতব লণ্ঠন। করিডরের শেষ মাথায় দেয়ালের গায়ে নীল, সবুজ, হলুদ আর সাদা জেলিজ মোজাইকে সাজানো মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী ছোট্ট ফোয়ারা বা ওয়াশবেসিন। আলাদা কোনো রিসেপশন ডেস্ক চোখে পড়ল না।

ভদ্রমহিলার নাম ফাতিমা। অত্যন্ত বিনয়ী আর আন্তরিক। পাসপোর্ট দেখে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তাকে অনুসরণ করতে বলল। সরু, কারুকাজ করা খাড়া সিঁড়ি। কাঁধে ব্যাগ আর হাতে স্যুটকেস নিয়ে উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম। সেটা লক্ষ করে ফাতিমা স্যুটকেসটা ধরতে চাইল। বিনয়ের সঙ্গে ধন্যবাদ জানালাম। বয়স যে হচ্ছে, সেটা বুঝি; তবু যত দিন পারি এসব কাজ নিজে করতে চাই।

দোতলায়, সিঁড়ির কাছেই আমার রুম। ঘরটা লম্বাটে আর বেশ সরু। নিচু ছাদের ওপর সারি সারি গাঢ় কাঠের বিম। এক পাশে ছোট একটি সিঙ্গেল বেড, সাদা চাদরের ওপর লাল মরক্কান নকশার বেডকভার। মাথার কাছে ছোট্ট একটি জানালা। অন্য দেয়ালে টেলিভিশন, সাদা তাকের ওপর পরিপাটি করে রাখা তোয়ালে। সবকিছুই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কিন্তু ঘরটা দেখে মন ভরল না। ঢুকতেই নাকে এল একটা গুমোট, অচেনা গন্ধ। মনে হলো, বাতাস ঠিকমতো চলাচল করে না। নিজেকেই দোষ দিলাম। সস্তায় থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে ভুল করে ফেললাম না তো? যাক, কোনোভাবে রাতটা কেটে গেলেই হলো। পরদিন, ২৮ জুন, তাঞ্জেরের উদ্দেশে রওনা হব।

ফাতিমা বলল, ‘দশ মিনিট পর ছাদে এসো। তোমার জন্য চা বানাব।‘

যাক, ঘর দেখে মনটা একটু দমে গেলেও তার আন্তরিক আতিথেয়তায় বেশ ভালো লাগল।

দশ মিনিট অপেক্ষা করার ধৈর্য আমার হলো না। রুমের ভেতর কয়েক মুহূর্ত কাটিয়ে স্যুটকেসটা রেখে কাঁধের ব্যাগটা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এই ঘরে বসে থাকার চেয়ে ছাদে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে চটজলদি বেরিয়ে পড়াই ভালো। আজকের প্রধান গন্তব্য রাবাতের ইতিহাস ও সভ্যতা জাদুঘর, মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস। মরক্কোর প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে রোমান ও ইসলামি আমলের প্রত্নতত্ত্বের অনন্য এক সংগ্রহশালা। দার আল ফানুস থেকে হেঁটে প্রায় পঁচিশ মিনিট। ফেরার পথে আস-সুন্নাহ মসজিদ, দার আল-মাখজেন (মরক্কোর রাজার প্রাসাদ)।এরপর শেষ বিকেলে মদিনার ভেতর উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি। ব্যস, দিনটি ফুরিয়ে যাবে।

সরু, খাড়া সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে উঠলাম। তিনতলার অর্ধেকটা খোলা ছাদ, আর বাকি অর্ধেকের ওপর ছোট একটি ঘর। সেই ঘরের ছাদেই খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। নকশাদার শামিয়ানা টাঙানো আরামদায়ক বসার জায়গা। মেঝেজুড়ে রঙিন টাইলস, চারদিকে লোহার কারুকাজ করা রেলিং, তার বাইরে নলখাগড়ার বেড়া, কালো লোহার চেয়ার-টেবিল, তার ওপরও ছোট ছোট টাইলসের জ্যামিতিক নকশা। এদিক-ওদিক রাখা কয়েকটি সবুজ গাছের টব। লাল, সবুজ, হলুদ আর কালচে নানা রঙের মিশেল পুরো জায়গাটায়। চারদিকে ঘিঞ্জি লোকালয়; কোথায় যেন পুরান ঢাকার সঙ্গে বেশ মিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাতিমা এসে সামনে রাখলে রুপালি খোদাই করা চায়ের পাত্র, ছোট নকশা করা গ্লাসে পুদিনা চা, কয়েক ধরনের মিষ্টি বিস্কুট আর এক বোতল পানি। মরক্কোয় অতিথিকে পুদিনা চা দিয়ে আপ্যায়ন করার রীতি তাদের জাতীয় চরিত্রেরই একটি অংশ। ফাতিমার আন্তরিক আতিথেয়তায় সেই একই ছাপ।

চা-বিস্কুট খেয়ে শরীরটা বেশ হালকা লাগল। ফাতিমাকে অসংখ্যবার ‘শুকরান, শুকরান’ বলে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আবার মদিনার অলিগলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠে অ্যাভিনিউ মোহাম্মদ পঞ্চম ধরে হাঁটা শুরু করলাম মিউজিয়ামের দিকে।

পুরোনো মদিনার ব্যস্ত বাজারের তুলনায় রাবাতের এই অংশ অনেক প্রশস্ত, পরিকল্পিত ও আধুনিক। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সুন্দর সহাবস্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে এই এলাকাসহ রাবাতের ঐতিহাসিক নগরাঞ্চল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।রাস্তার দুপাশে আধুনিক দোকানপাট, সারিবদ্ধ উঁচু পামগাছ, সাদা ও বালুরঙা সুদৃশ্য ভবন। বিভিন্ন ভবনের মাথায় পতপত করে উড়ছে মরক্কোর লাল পতাকা। এই সড়কের দুপাশেই রয়েছে দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও প্রশাসনিক স্থাপনা।

রাস্তার পাশে রাবাতের ঐতিহাসিক প্রধান ডাকঘর। একটু এগিয়ে মরক্কোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক আল-মাগরিবের ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত বিশাল ভবন। কিছুটা এগিয়ে ডান দিকে মরক্কোর পার্লামেন্ট ভবন। সামনে কড়া নিরাপত্তা। খাকি পোশাকে সশস্ত্র প্রহরীরা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। চোখেমুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় গা ছমছম করে উঠল। কেমন এক অজানা ভয়! অজান্তেই হাঁটার গতি বেড়ে গেল!

ছোটবেলা থেকেই জাদুঘর আমার ভীষণ প্রিয়। বাংলাদেশের সব উল্লেখযোগ্য জাদুঘরেই আমার পা পড়েছে। শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে যে কতবার গিয়েছি, তার হিসাব নেই। আমার বরাবরই মনে হয়েছে, মানুষের কল্পনাশক্তি আর মানসিক উদারতা বাড়ানোর জন্য বই আর জাদুঘরের তুলনা নেই। বই নিয়ে যায় অদেখা জগতে, আর মিউজিয়াম চোখের সামনে তুলে ধরে সেই জগতের বাস্তব নিদর্শন।

ছোটবেলা থেকেই জাদুঘর আমার ভীষণ প্রিয়। বাংলাদেশের সব উল্লেখযোগ্য জাদুঘরেই আমার পা পড়েছে। শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে যে কতবার গিয়েছি, তার হিসাব নেই। আমার বরাবরই মনে হয়েছে, মানুষের কল্পনাশক্তি আর মানসিক উদারতা বাড়ানোর জন্য বই আর জাদুঘরের তুলনা নেই। বই নিয়ে যায় অদেখা জগতে, আর মিউজিয়াম চোখের সামনে তুলে ধরে সেই জগতের বাস্তব নিদর্শন।

বিদেশে যেখানেই গিয়েছি, সুযোগ পেলেই ঢুঁ মেরেছি কোনো না কোনো জাদুঘরে। এসব জায়গায় ঢুকলে মনে হয়, কোনো তীর্থস্থানে এসেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কীভাবে কেটে যায়, টেরই পাই না। পরিচিত কেউ যুক্তরাজ্য ঘুরে এলে প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, ‘লন্ডনে কোন কোন মিউজিয়াম দেখলেন?’ কেউ কেউ অবাক হয়ে বলেন, ‘আরে, ওসব জায়গায় যাব কেন? সারা দুনিয়া থেকে জিনিসপত্র চুরি করে এনে সাজিয়ে রেখেছে!’ কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন ফেরত দেওয়ার দাবি নিয়ে আজও বিতর্ক চলছে। কিন্তু একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে, ঐতিহাসিক নিদর্শন কীভাবে যত্ন করে সংরক্ষণ করতে হয়, তা ব্রিটিশদের কাছ থেকে শেখার আছে।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সরকার যখন হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেয়, তখন গবেষকদের সামনে বড় সমস্যা ছিল আসল মসলিনের নমুনা সংগ্রহ করা। সেই অমূল্য নমুনার সন্ধান মিলেছিল লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে! বাংলাদেশি গবেষকেরা সেখানে সংরক্ষিত মসলিনের নমুনাগুলো পরীক্ষা করে এর বুননশৈলী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পান। পরে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশেই খুঁজে পাওয়া যায় মসলিন তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ জাতের তুলা ‘ফুটি কার্পাস’। সেই তুলার সুতো দিয়ে তাঁতশিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আবার তৈরি হয় হারিয়ে যাওয়া ঢাকাই মসলিন।

অবশেষে পৌঁছে গেলাম রাবাতের ইতিহাস ও সভ্যতা জাদুঘরে। বাইরে থেকে সাধারণ সাদা রঙের ভবন। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম। চারদিকে শান্ত, নীরব পরিবেশ। নিরাপত্তা রক্ষীদের কড়া নজরদারি। প্রথম দিকের কক্ষগুলোতে সাজানো রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ব্যবহৃত পাথরের ছুরি, ধারালো অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, পোড়ামাটির পাত্র, কঙ্কাল ও সমাধির নিদর্শন। একেকটি জিনিসের সামনে দাঁড়িয়ে কল্পনায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম হাজার হাজার বছর আগের পৃথিবীতে। তখন মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকত? কী দিয়ে খাবার তৈরি করত, কীভাবে শিকার করত, কেমন ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবন?

আমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল মেকনেস শহরের কাছে অবস্থিত প্রাচীন রোমান নগরী ভলুবিলিস (Volubilis) এবং রাবাতের চেল্লা (Chellah) থেকে উদ্ধার করা শিল্পকর্মগুলো দেখার। কেন্দ্রীয় হলে মৌরিতানিয়ার শেষ রাজা টলেমির বিশাল এক মার্বেলের মূর্তি। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়েছিল চেল্লার ধ্বংসাবশেষ থেকে। একটি হাত ভাঙা, অন্য হাতেরও কিছু অংশ নেই। শরীরের পেশি, মুখের অবয়ব আর কাঁধে জড়ানো পোশাকের ভাঁজ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা। দুই হাজার বছর আগে মানুষের হাতে এমন অসাধারণ শিল্পকর্ম তৈরি হয়েছিল কীভাবে!

এরপর গেলাম জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশে। বিখ্যাত ডিম্বাকৃতির ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য কক্ষে, যার নাম ‘হল অব ব্রোঞ্জেস’। মৃদু আলোয় কাঁচের বাক্সের ভেতর সাজানো প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো অসাধারণ সব ব্রোঞ্জের মূর্তি। প্রাচীন মৌরিতানিয়ার রাজা দ্বিতীয় জুবার আবক্ষ মূর্তি, রোমান ব্যক্তিত্ব ক্যাটোর মূর্তি – আরও কত কী! তারপর নজর কাড়ল ১৯৩২ সালে ভলুবিলিস থেকে উদ্ধার করা আইভি পাতার মুকুট পরা এক তরুণের ব্রোঞ্জমূর্তি, যার ফরাসি নাম ‘এফেব কুরোনে দ্য লিয়ের’। প্রায় দেড় মিটার উঁচু এই মূর্তিটির শরীরের পেশি, দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি এতটাই নিখুঁত যে চোখ ফেরানো কঠিন। এর সামনে একটি কুকুরের ভাস্কর্য, নাম ‘ভলুবিলিসের কুকুর’ (শিয়াঁ দ্য ভলুবিলিস)। কুকুরটির শরীরের পেশি, পায়ের ভঙ্গি আর সতর্ক দৃষ্টি এত জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে যে মনে হয়, এই বুঝি লাফিয়ে উঠবে!এত শতাব্দী আগে ব্রোঞ্জ দিয়ে কী করে এমন জীবন্ত ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন সেকালের শিল্পীরা!

জাদুঘরটিতে শুধু রাজা-বাদশাহ কিংবা দেবদেবীর মূর্তি নয়, রয়েছে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ব্রোঞ্জ, পাথর আর পোড়ামাটির তৈরি নানা জিনিসপত্রও। আসবাবপত্রের অংশ, রান্না ও খাবার পরিবেশনের পাত্র, তেলের প্রদীপ, অলংকার, ধর্মীয় উপাসনায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম—কত কী! এসব জিনিসের নকশা ও কারুকাজে আধুনিকতা ও রুচির স্পষ্ট ছাপ। দুই হাজার বছর আগে দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীতে সৌন্দর্য আর ব্যবহারিক প্রয়োজনের এমন চমৎকার সমন্বয় ঘটানো নিশ্চয়ই সহজ কাজ ছিল না। আমরা নিজেদের আধুনিক মানুষ বলে কত গর্ব করি। অথচ আমাদের আধুনিকতার অনেক শিকড়ই লুকিয়ে আছে সুদূর অতীতে, সেই প্রাচীন যুগের মানুষের শিল্পবোধ, সৃজনশীলতা আর অসাধারণ কারিগরি দক্ষতার মধ্যে।

অপেক্ষাকৃত ছোট জাদুঘর, অথচ কী অমূল্য তার সংগ্রহ! গভীর মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখতে দেখতে দুই ঘণ্টা কেটে গেল। তবে রোমান সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় এখানেই শেষ নয়। আগামীকাল সকালে তাঞ্জেরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে যাব রাবাতের প্রাচীন রোমান নগরী চেল্লায়। আর দুদিন পর মেকনেসের কাছে ভলুবিলিসে। এসব প্রাচীন নগরীর মাটি খুঁড়েই উদ্ধার করা হয়েছে এই জাদুঘরের অনেক অমূল্য নিদর্শন। আজ কাঁচের বাক্সে সাজানো যে শিল্পকর্মগুলো দেখলাম, সেগুলোর আদি ঠিকানায় পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াব, ভাবতেই শরীর-মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগল।

মনে পড়ে গেল পবিত্র কোরআনের সেই বাণী, ‘তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন।’ (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:২০)। ভ্রমণ শুধু নতুন নতুন দেশ দেখা নয়, সৃষ্টির বিস্ময়, মানুষের ইতিহাস আর সভ্যতার বিবর্তনকে জানার এক অসাধারণ সুযোগ। আমার জীবনে আরও একটি বিশেষ তীর্থস্থান দর্শন শেষ হলো। আলহামদুলিল্লাহ! মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল। সেই অনুভূতি নিয়েই জাদুঘর থেকে বেরিয়ে পা বাড়ালাম ঐতিহাসিক আস-সুন্নাহ মসজিদের দিকে। ইনশাআল্লাহ, আজ আছরের নামাজ পড়ব এই ঐতিহাসিক মসজিদে।

মনে পড়ে গেল পবিত্র কোরআনের সেই বাণী, ‘তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন।’ (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:২০)। ভ্রমণ শুধু নতুন নতুন দেশ দেখা নয়, সৃষ্টির বিস্ময়, মানুষের ইতিহাস আর সভ্যতার বিবর্তনকে জানার এক অসাধারণ সুযোগ। আমার জীবনে আরও একটি বিশেষ তীর্থস্থান দর্শন শেষ হলো। আলহামদুলিল্লাহ! মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল। সেই অনুভূতি নিয়েই জাদুঘর থেকে বেরিয়ে পা বাড়ালাম ঐতিহাসিক আস-সুন্নাহ মসজিদের দিকে। ইনশাআল্লাহ, আজ আছরের নামাজ পড়ব এই ঐতিহাসিক মসজিদে।