অয়ন ইসলাম: জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আব্বুকে আমি রোগীদের ভিড়ের ভেতরেই দেখে এসেছি। মানুষের ভিড়, তাদের আকুলতা, ওষুধটা হাতে পাওয়ার পর মুখে ফুটে ওঠা স্বস্তি – ছোটবেলায় এসবের মানে বুঝতাম না। যত বড় হয়েছি, একটু একটু করে বুঝেছি। কিন্তু সত্যিই কতটুকুই বা বুঝেছি!
আব্বু চলে গেছেন ২০১৮ সালের ২ মার্চ, চুরাশি বছর বয়সে। আট বছর পেরিয়ে গেছে, এখনো এই মানুষটাকে আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। একজন মানুষের ভেতরে কতখানি দরদ আর তাগিদ থাকলে চুরাশি বছর বয়সেও দিনের বড় একটা সময় অন্য মানুষের উপকারে কাটিয়ে দিতে পারেন, সেই হিসাবটা আমি আজও মেলাতে পারি না।
তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে দু’বার থামতে হয়েছে। কেন থেমেছি, সেটা ব্যাখ্যা করতে চাই না। তাই সেই সময়ের আব্বুকে শুধু নিজের স্মৃতি থেকে না এঁকে, অন্য একজনের দেখা আব্বুকে খানিকটা তুলে দিই। প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’-তে আব্বুকে নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছিল। লেখাটা যখন ছাপা হচ্ছে, আব্বু তখন বেঁচে আছেন, রোজ বিকেলে কাদিরগঞ্জের দাতব্য চিকিৎসালয়ে গিয়ে বসছেন। ষোলো বছর আগের ওই লেখার প্রতিটা বাক্য বর্তমান কালে বলা, পড়তে গেলে মনে হয় তিনি এখনো ওখানেই বসে আছেন।
রাজশাহী শহরের রেলগেট এলাকায় হঠাৎ একজন রিকশাচালক পড়ে গিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেলেন। পাশেই শ্রমিক ইউনিয়নের ছোট্ট একটা ঘরে ছিল `জননী দাতব্য হোমিও চিকিৎসালয়’। চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা ছুটে এলেন রিকশাচালকের কাছে। লক্ষণ দেখে ওষুধ খাইয়ে দিলেন। সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সাত দিন পর রিকশাচালক নিজেই রিকশা চালিয়ে দেখা করতে এলেন। ওষুধের দাম দেবেন। কিন্তু চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা কিছুতেই টাকা নেবেন না। তিনি শুধু তাঁর মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন। রিকশাচালক প্রাণভরে দোয়া করলেন, `আল্লাহ আপনার মাকে জান্নাতবাসী করুক।‘ এভাবে মায়ের আদেশে গোলাম মোস্তফা কলকাতা ন্যাশনাল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে ৫৩ বছর ধরে দুস্থ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মূলত দুস্থদের চিকিৎসক হলেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজের কিছু বিত্তশালী মানুষও তাঁর কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা নেন।
গোলাম মোস্তফার জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘি থানার শীতলপাড়া গ্রামে। ১৯৪১ সালে তাঁর বাবা সানোয়ার আলী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। টানা তিন দিন রোগযন্ত্রণায় ছটফট করে তিনি মারা গেলেন, কিন্তু তাঁর জন্য কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়নি। আশপাশের কয়েক গ্রামে কোনো চিকিৎসক ছিল না। শোকাহত মা আমেনা খাতুন সেদিনই ছেলের হাতে হাত রেখে একটা প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন যে ছেলে চিকিৎসক হয়ে গ্রামের দুস্থ মানুষের সেবা করবে। গোলাম মোস্তফা মায়ের কাছে করা সেই প্রতিজ্ঞা ভোলেননি।
কলকাতা ন্যাশনাল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ থেকে তিনি এইচএমবি ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর থেকেই তিনি শেখদিঘি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করার পাশাপাশি মায়ের নির্দেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন। তখনো ঐ অঞ্চলে চিকিৎসক নেই। সকালে তাঁর বিদ্যালয়েই মানুষ ওষুধের জন্য ভিড় করতে লাগল। বাধ্য হয়ে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তিনি বিদ্যালয়েই চিকিৎসা শুরু করেন। বাড়ি ফিরে আবার অনেক রাত পর্যন্ত চলত তাঁর এই দাতব্য চিকিৎসা। এভাবে তিনি প্রতিদিন ৪০০-৫০০ রোগীর চিকিৎসা দিতেন। তাঁর মা মারা যাওয়ার আগেই ছেলের চিকিৎসার এই দৃশ্য দেখে গেছেন।
পরবর্তীতে তিনি রাজশাহীতে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে রেলগেটে, পরে কাদিরগঞ্জে ঘর ভাড়া নিয়ে তাঁর চিকিৎসাসেবা চলছে। এখানেও প্রতিদিন দেড় থেকে দুইশ রোগীর চিকিৎসা দেন তিনি। প্রতিদিন বিকেলে তাঁর ওষুধের দোকানে রোগীর ভিড় লেগেই থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করার কারণে রাজশাহী শহরের স্বল্প আয়ের মানুষ ও শ্রমজীবীদের পরিবারের চিকিৎসক হয়ে উঠেছেন তিনি।
তাঁর দোকানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলেই দেখা যাবে, দলে দলে মানুষ আসছে। ধারাবাহিকভাবে তাঁর পাশের চেয়ারে গিয়ে বসছে, রোগের বিবরণ দিচ্ছে আর ওষুধ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ টাকার কোনো প্রসঙ্গই তুলছে না। গত মঙ্গলবার বিকেলে গিয়ে এ দৃশ্য দেখে বোঝা গেল, যে রোগীরা দোকানে ভিড় করছে, এরা সবাই তাঁর নিয়মিত রোগী। কারও অসুখ-বিসুখ হলেই ছুটে আসে চিকিৎসক গোলাম মোস্তফার কাছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।
উপশহর নিউমার্কেট এলাকার রিকশাচালকের স্ত্রী রেণু বেগম (৪০) ওষুধ নিয়ে যাচ্ছিলেন। কত দিন ধরে এখান থেকে ওষুধ নেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই পরিবারের যার যখন সমস্যা হয়, তখনই এখানে ওষুধ নিতে আসেন। নগরের কাদিরগঞ্জ এলাকার রিকশাচালকের স্ত্রী শরীফা খাতুন (৩৫) নিজের কোমরের ব্যথার জন্য ওষুধ নিতে এসেছেন। সঙ্গে ছয় বছরের মেয়ে হাফিজার সর্দি-জ্বরের জন্যও ওষুধ নিচ্ছেন। শরীফা জানালেন, তাঁর পরিবারের চিকিৎসক হচ্ছেন এই গোলাম মোস্তফা।
ভিড় শেষ হলেও এক ভদ্রলোক পাশের টুলে বসে আছেন ওষুধ নেওয়ার জন্য। তিনি বাংলাদেশ বেতারের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক। নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, তিনিও ওষুধ নেওয়ার জন্য বসে আছেন। তিনি জানান, শারীরিক কোনো সমস্যায় প্রথমেই তিনি গোলাম মোস্তফার কাছে আসেন। তিনি জানান, গোলাম মোস্তফা যাদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, তাদের সিংহভাগই দুস্থ মানুষ। তবে তাঁর মতো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।“ (ছুটির দিনে, ৮ মে ২০১০, ২৫ বৈশাখ ১৪১৭, পৃষ্ঠা ২১)
লেখাটা ছাপা হওয়ার পর আব্বু আরও প্রায় আট বছর বেঁচে ছিলেন, আর ওই আট বছরে দৃশ্যটা একটুও বদলায়নি। একই দাতব্য চিকিৎসালয়, একই চেয়ারে বসা মানুষটি, রোগীদের একই রকম ভিড়। শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে আসছিল, তবু প্রতিদিন বিকেল হলে তিনি বেরিয়ে যেতেন। হেঁটে যাওয়া-আসা করতে কষ্ট হচ্ছিল, একটা নিয়মিত রিকশা ঠিক করে দিয়েছিলাম। কোনোদিন রিকশাটা নিতেন, কোনোদিন নিতেন না। বলতেন হাঁটলে আমার শরীর ভালো থাকবে। কিন্তু জননী দাতব্য হোমিও চিকিৎসালয়ে যাওয়া আর রোগী দেখায় ভাটা পড়েনি।
মা মারা যাওয়ার পরে, আমি দেশের বাইরে চলে আসার পরে তিনি যেন আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিলেন সেটাকে। নিয়মিত ফোনে কথা হতো। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে সবসময় বলতেন, ভালো আছি। আমার ভাগ্নে প্রায় প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করত, কী দরকার আমাকে জানাত, আর আমি সেগুলোর ব্যবস্থা করে দিতাম। আব্বু নিজে কোনোদিন মুখ ফুটে বলতেন না তাঁর কিছু লাগবে কি না। আমাকে অন্যদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে বুঝতে হতো, তারপর জোর করে সেটার ব্যবস্থা করতে হতো।
প্রথম আলোর লেখাটায় একটা তথ্য আছে যেটার সত্যিকারের অর্থ বড় হয়ে বুঝতে শিখেছি। রেলগেটের ওই ছোট্ট ঘরটার নাম ছিল ‘জননী দাতব্য হোমিও চিকিৎসালয়’। যে রিকশাচালক সাত দিন পর নিজে রিকশা চালিয়ে টাকা দিতে এসেছিলেন, আব্বু তাঁর কাছ থেকে টাকা নেননি, চেয়েছিলেন শুধু তাঁর মায়ের জন্য দোয়া। ১৯৪১ সালে নিজের বাবাকে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে দেখে যে ছেলেটির হাত ধরে তার মা একটা প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, সাতাত্তর বছর পর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সেই ছেলেটি প্রতিজ্ঞাটা রেখে গেছে। ইত্তেফাক পত্রিকার সাংবাদিককে আব্বু বলেছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই কাজ চালিয়ে যেতে চান। সেটাই করেছিলেন।
আব্বু চলে যাওয়ার পর প্রথম আলোর লেখাটার কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে, তবে অন্য একটা কারণে। রেণু বেগম, শরীফা খাতুন, শরীফার ছয় বছরের মেয়ে হাফিজা – নামগুলো একটা পত্রিকার পাতায় থেকে গেছে, কিন্তু মানুষগুলো তো কোথাও না কোথাও আছে। হাফিজার এখন বাইশ-তেইশ বছর বয়স, হয়তো নিজেরই সংসার হয়েছে। শরীফা খাতুনের কোমরের ব্যথা কমেছে কি না আমি জানি না। না কমে থাকলে তিনি এখন কার কাছে যান, সেটাও জানি না। রাজশাহী শহরের কয়েক হাজার মানুষের কাছে ‘ডাক্তার’ শব্দটার মানে ছিল একজন নির্দিষ্ট মানুষ, একটা নির্দিষ্ট চেয়ার, বিকেলবেলার একটা নির্দিষ্ট ঘর। ২ মার্চ ২০১৮-এর পর ওই চেয়ারটা শূন্য পড়ে আছে। দাতব্য চিকিৎসালয়টার জায়গায় এখন কী আছে? হয়তো বহুতল ভবন উঠেছে সেখানে, কিংবা হয়তো কোনো একটা মোবাইল ফোনের দোকান বসেছে। আমি জানি না, জানতে চাইও না। আমার স্মৃতিতে রাজশাহী শহরের ওই জায়গাটা আজীবন জননী দাতব্য হোমিও চিকিৎসালয় হয়েই থাকুক।
আমার কাছে মনে হয়, পৃথিবীতে যতদিন আছি, প্রতিটি দিনই বাবা দিবস, প্রতিটি দিনই মা দিবস। যাঁদের কারণে আমার এই পৃথিবীতে আসা, যাঁদের ত্যাগ, শ্রম আর মমতার মধ্যে দিয়ে আমার বড় হয়ে ওঠা, তাঁদের উপস্থিতি কিংবা তাঁদের স্মৃতি ক্যালেন্ডারের একটি তারিখে এসে শুরু বা শেষ হয় না। তাঁদেরকে আমি প্রতিদিনই স্মরণ করি। এ ছাড়া আর একটা কাজ করতে পারি – নিজের মতো করে, ভালোভাবে বাঁচতে পারি। আব্বু বেঁচে থাকলে ওটাতেই সবচেয়ে খুশি হতেন, তাই ওটাই আমার তরফ থেকে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।

(ছবিটি ইত্তেফাক পত্রিকায় আব্বুকে নিয়ে ছাপা হওয়া একটা লেখার ছবি।)
বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small