শৌভনিক দত্ত: একটি মানুষের জন্মের পেছনে কতজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন? হিসাবটা খুব সহজ। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বিস্ময়কর। আমাদের প্রত্যেকের জন্মের পেছনে আছেন দুজন মানুষ, বাবা ও মা। সেই বাবা ও মায়ের জন্মের পেছনে আছেন তাঁদের বাবা মা, অর্থাৎ চারজন। সেই চারজনের পেছনে আটজন। তারপর ষোলো, বত্রিশ, চৌষট্টি, একশো আটাশ। এভাবে প্রতি প্রজন্মে সংখ্যাটা দ্বিগুণ হতে থাকে। এই হিসাব ধরে কয়েকশো বছর, কিংবা হাজার বছর পেছনে গেলে একসময় সংখ্যাগুলো আর শুধু সংখ্যা থাকে না। মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের আজকের এই পৃথিবীতে এসে দাঁড়ানোর পেছনে রয়েছে মানুষের এক দীর্ঘ, বিস্ময়কর যাত্রা।
আমরা কেউ একা নই। আমাদের শরীরে, রক্তে, চেহারায়, স্বভাবে, হাঁটার ভঙ্গিতে, এমনকি কথা বলার ধরনেও হয়তো রয়ে গেছে বহু প্রজন্মের অদৃশ্য ছাপ। যাঁদের অনেকের নাম আমরা জানি না, মুখ দেখিনি, গল্পও শুনিনি। তবু তাঁদের জীবনের কিছু না কিছু এসে পৌঁছেছে আমাদের মধ্যে। আর সেই দীর্ঘ শিকলের সবচেয়ে কাছের কয়েকটি নামের একটি হলো বাবা।
একটি শিশুর কাছে অবশ্য বাবা কোনো বংশপরম্পরার হিসাব নন। বাবা প্রথমে খুব পরিচিত একজন মানুষ। যে মানুষটির আঙুল ধরে রাস্তা পার হওয়া যায়। যার কাঁধে চড়ে পৃথিবীটাকে একটু উঁচু থেকে দেখা যায়। যে সাইকেলের পেছনটা ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় নিঃশব্দে হাত ছেড়ে দেয়, অথচ শিশুটি বুঝতেই পারে না যে সে এখন নিজেই ভারসাম্য রাখতে শিখেছে।
সব বাবাই অবশ্য একই রকম নন। কেউ খুব কথা বলেন। কেউ কম। কেউ সন্তানকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা প্রকাশ করেন, কেউ হয়তো সারাজীবন সেই কথাটি মুখেই বলতে পারেন না। কেউ গল্প শোনান, কেউ অঙ্ক শেখান, কেউ মাঠে নিয়ে যান, কেউ দূরে কোথাও কাজ করেন। কারও হাতে বই, কারও হাতে কলম, কারও হাতে হাতুড়ি, কারও হাতে স্টিয়ারিং, কারও হাতে মাটি।
প্রকাশের ভাষা আলাদা হলেও একটি জায়গায় অনেক বাবার গল্প মিলে যায়। তাঁরা চান, সন্তান যেন তাঁদের চেয়ে একটু ভালো থাকে। হয়তো এই চাওয়াটাই পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো উত্তরাধিকারগুলোর একটি। একজন বাবা নিজের জীবনে যে পথটুকু হেঁটেছেন, তিনি চান তাঁর সন্তান যেন সেখান থেকে আরও একটু সামনে যেতে পারে। তিনি হয়তো বড় কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু রেখে যেতে পারেন সততা। দায়িত্ববোধ। পরিশ্রমের অভ্যাস। মানুষের প্রতি সম্মান। অন্যায়ের সামনে মাথা না নোয়ানোর শিক্ষা।
প্রকাশের ভাষা আলাদা হলেও একটি জায়গায় অনেক বাবার গল্প মিলে যায়। তাঁরা চান, সন্তান যেন তাঁদের চেয়ে একটু ভালো থাকে। হয়তো এই চাওয়াটাই পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো উত্তরাধিকারগুলোর একটি। একজন বাবা নিজের জীবনে যে পথটুকু হেঁটেছেন, তিনি চান তাঁর সন্তান যেন সেখান থেকে আরও একটু সামনে যেতে পারে। তিনি হয়তো বড় কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু রেখে যেতে পারেন সততা। দায়িত্ববোধ। পরিশ্রমের অভ্যাস। মানুষের প্রতি সম্মান। অন্যায়ের সামনে মাথা না নোয়ানোর শিক্ষা। কখনও রেখে যান একটি বই। কখনও একটি গান। কখনও বাড়ির উঠোনে লাগানো একটি গাছ। কখনও এমন একটি বাক্য, যার অর্থ সন্তান বুঝতে পারে বহু বছর পরে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার সংজ্ঞাটাও তাই বদলে যায়। শৈশবে বাবা শক্তির প্রতীক। মনে হয়, বাবা সব পারেন। কৈশোরে কখনও মনে হয়, বাবা অনেক কিছুই বোঝেন না। তারপর জীবন একটু একটু করে নিজের দায়িত্ব আমাদের হাতে তুলে দেয়। সংসার আসে, সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ভুল হয়, আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করি, বাবার বলা কোনো কথাই হয়তো আমরা পরের প্রজন্মকে বলছি। যে কথায় একসময় বিরক্ত হয়েছিলাম, সেই কথাই এখন নিজের মুখে। তখন হয়তো প্রথম বুঝতে শুরু করি, বাবা আসলে কী দিতে চেয়েছিলেন।
সব বাবার গল্পের শেষটাও এক নয়। কারও বাবা পাশে আছেন। কেউ দূরে থাকেন। কারও সঙ্গে প্রতিদিন কথা হয়। কারও সঙ্গে বছরে কয়েকবার। আবার কারও বাবা এখন শুধুই স্মৃতিতে। কারও জীবনে বাবার উপস্থিতি ছিল খুব অল্প সময়ের। কেউ হয়তো বাবাকে দেখার সুযোগই পাননি। তবু দেখা হোক বা না হোক, স্মৃতি থাকুক বা না থাকুক, বাবা থেকে যান।
আমাদের শরীরে তাঁর উত্তরাধিকার থাকে। কখনও চেহারায়, কখনও কণ্ঠস্বরে, কখনও শক্তিতে, কখনও স্বভাবে। আর যাঁরা বাবাকে কাছে পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এর সঙ্গে থেকে যায় তাঁর স্পর্শ, শিক্ষা, অভ্যাস, মূল্যবোধ আর ভালোবাসা। হয়তো এভাবেই একজন বাবা তাঁর নিজের জীবনের সীমানা পেরিয়ে আরও অনেক দূর পর্যন্ত থেকে যান।
যাঁদের বাবা আর নেই, তাঁদের কাছে একটি পুরনো ছবি কখনও সময়ের দরজা হয়ে ওঠে। ছবির মানুষটি আর বয়স বাড়ান না। তাঁর চুল আর পাকে না। মুখে নতুন বলিরেখা পড়ে না। তিনি ছবির ভেতরে একই বয়সে থেকে যান। শুধু ছবির বাইরে থাকা মানুষগুলোর বয়স বাড়তে থাকে।
কখনও নিজের কোনো আচরণে, কোনো সিদ্ধান্তে, কোনো কথায় হঠাৎ বাবার ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। কখনও পরের প্রজন্মের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে মনে পড়ে বহু বছর আগের আরেকটি হাতের কথা। এইভাবেই কি মানুষ থেকে যায়? এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের হাতে জীবন তুলে দেয়। শুধু জীবন নয়, সঙ্গে দেয় ভাষা, স্মৃতি, অভ্যাস, মূল্যবোধ, স্বপ্ন এবং অসমাপ্ত কিছু ইচ্ছা।
আবার সেই সংখ্যার হিসাবটায় ফিরে যাওয়া যাক। দুই থেকে চার। চার থেকে আট। আট থেকে ষোলো। সংখ্যাগুলো একদিকে আমাদের নিয়ে যায় শত শত বছর পেছনে। সেখানে অসংখ্য বাবা ছিলেন। তাঁদের কাউকে আমরা চিনি, অধিকাংশকেই চিনি না। তাঁদের জীবন, তাঁদের শরীর, তাঁদের শক্তি, তাঁদের অস্তিত্বের কোনো না কোনো অংশ প্রজন্ম পেরিয়ে এসে মিশেছে আমাদের মধ্যে। অন্যদিকে একই হিসাব এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে।
আজকের প্রজন্ম একদিন জায়গা করে দেবে পরের প্রজন্মকে। আমরা যে মানুষগুলোকে কোনোদিন দেখব না, তাদের কাছেও হয়তো কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে যাবে আজকের একটি শিক্ষা, একটি মূল্যবোধ, একটি ভালোবাসা। এভাবেই জীবন থেমে থাকে না। এক প্রজন্মের কিছুটা বয়ে যায় পরের প্রজন্মে, তারপর তারও পরের প্রজন্মে।
তাই বাবা দিবস শুধু বাবাকে একটি উপহার দেওয়া কিংবা একটি দিনের শুভেচ্ছা জানানোর উপলক্ষ নয়। এটি হয়তো একটু থেমে ভাবার দিনও। আমরা কোথা থেকে এসেছি। আমাদের মধ্যে কারা বেঁচে আছেন। আর আমাদের কাছ থেকে কী বয়ে যাবে ভবিষ্যতের দিকে।
হাজার বছরের সেই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য বাবার জীবন জড়িয়ে আছে আমাদের আজকের অস্তিত্বের সঙ্গে। কেউ সন্তানের হাত ধরে বহুটা পথ হাঁটার সুযোগ পেয়েছেন, কেউ হয়তো খুব অল্প সময়। কেউ থেকে গেছেন স্মৃতিতে, কেউ গল্পে, কেউ একটি পুরনো ছবিতে। আবার কারও সম্পর্কে সন্তান হয়তো কিছুই জানে না। তবু তাঁদের অস্তিত্ব হারিয়ে যায় না।
হাজার বছরের সেই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য বাবার জীবন জড়িয়ে আছে আমাদের আজকের অস্তিত্বের সঙ্গে। কেউ সন্তানের হাত ধরে বহুটা পথ হাঁটার সুযোগ পেয়েছেন, কেউ হয়তো খুব অল্প সময়। কেউ থেকে গেছেন স্মৃতিতে, কেউ গল্পে, কেউ একটি পুরনো ছবিতে। আবার কারও সম্পর্কে সন্তান হয়তো কিছুই জানে না। তবু তাঁদের অস্তিত্ব হারিয়ে যায় না।
দেখা হোক বা না হোক, জানা হোক বা না হোক, আমাদের অস্তিত্বের কোথাও না কোথাও বাবা থেকে যান। শরীরে, উত্তরাধিকারে, স্মৃতিতে, শিক্ষায়, কিংবা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলা জীবনের সেই অদৃশ্য ধারায়। আমরা সবাই সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি ক্ষণিক অধ্যায়। আগের প্রজন্ম থেকে জীবন এসে পৌঁছায় আমাদের কাছে। আমরা তাতে যোগ করি আমাদের সময়, আমাদের অভিজ্ঞতা, আমাদের ভালোবাসা। তারপর জীবন এগিয়ে যায় তার নিজের পথে।
দুই থেকে চার। চার থেকে আট। আট থেকে ষোলো। হিসাবটা চলতেই থাকে। আর সেই অসীম হিসাবের মধ্যে বাবা দিয়ে যান এমন একটি উপহার, যা কোনো বাক্সে ভরা যায় না, যার কোনো মূল্য লেখা থাকে না।
জীবন। তার সঙ্গে, কারও জন্য স্মৃতি। কারও জন্য শিক্ষা। কারও জন্য ভালোবাসা। কারও জন্য পথ দেখানোর একটি হাত। আর সেই জীবন থেকেই আবার জন্ম নেয় নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন, নতুন গল্প। হয়তো এটাই বাবার দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।
বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small