ডাকটিকিট সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় নতুন ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাহিদুল ইসলাম ইকো। দেশটিতে ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অস্ট্রেলিয়ান ফিল্যাটেলিক ফেডারেশন’ (এপিএফ)-এর বিচারকদের সম্মানজনক তালিকা ‘অস্ট্রেলিয়ান রোল অব ডিস্টিংগুইশড ফিল্যাটেলিক জাজেস’-এ বিচারক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তিনি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই গৌরব অর্জনের মাধ্যমে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম নতুন করে তুলে ধরলেন। গত ১৫ আগস্ট কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ব্রিসবেনের ভিনটেজ ভেন্যু ‘ওয়াটারলু বে হোটেল’ (৭৫ বেরিমা স্ট্রিট, উইনাম)-এ আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই স্বীকৃতি তুলে দেওয়া হয়। তিন দিনব্যাপী ‘কুইন্সল্যান্ড স্ট্যাম্প অ্যান্ড কয়েন শো ২০২৬’-এর সফল সমাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী পালমারেস ডিনারে (পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী নৈশভোজ) দেশের শীর্ষ ফিল্যাটেলিস্টদের উপস্থিতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী ফিল্যাটেলিক জাজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সহজ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ডাকটিকিটের ইতিহাস, মুদ্রণ প্রযুক্তি, দুর্লভতা এবং প্রদর্শনীর মান যাচাইয়ের জন্য কঠোর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জাহিদুল ইসলাম ইকো সফলভাবে এপিএফ-এর প্রোভিশনাল জুরি (শিক্ষানবিশ বিচারক) হিসেবে নির্ধারিত সমস্ত জটিল শর্ত ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করেন। অনুষ্ঠানে এপিএফ-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি স্টেফানি ব্রোমসার উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ‘রোল অব ডিস্টিংগুইশড ফিল্যাটেলিক জাজেস’-এ নথিভুক্ত করেন এবং বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন।
মো. জাহিদুল ইসলাম, যিনি ‘ইকো’ নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে ছোটবেলা থেকেই ডাকটিকিট সংগ্রহের মাধ্যমে ফিলাটেলির জগতে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর বড় ভাই ওবায়দুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় মাত্র ১০ বছর বয়সে ডাকটিকিট সংগ্রহের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। সিরাজগঞ্জের পুরাতন পোস্ট অফিস রোডের মো. মনজুর কাদেরের দিকনির্দেশনায় ইকো ফিলাটেলি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন এবং ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের নানা কৌশল ও নিয়মকানুন শিখে নেন। বছরের পর বছর ফিলাটেলির প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতা আরও বিকশিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। ১৯৯২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় ডাকটিকিট প্রদর্শনী (Banglapex 1992)-তে জুনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে অবস্থানকালে তাঁর ফিলাটেলি-জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হয়। এ সময়ে তিনি ভারতের বিভিন্ন খ্যাতনামা ফিলাটেলিস্টের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইকোর ফিলাটেলি-সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আসে ১৯৯৭ সালে। সে বছর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে (World Stamp Exhibition) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে যুব বিভাগে (Youth Group) মর্যাদাপূর্ণ ভারমেইল (Vermeil) পদক অর্জন করেন তিনি। বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে তিনি চারটি FIP (Fédération Internationale de Philatélie) প্রদর্শনীতেও অংশগ্রহণ করেছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিচয় তুলে ধরেন।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করলেও ডাকটিকিট সংগ্রহ ও ফিলাটেলির প্রতি তাঁর আগ্রহ ও ভালোবাসা অটুট রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জাতীয় ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছেন। এসব প্রদর্শনীতে তাঁর দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, জ্ঞান ও সংগ্রহের মান স্বীকৃতি পেয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুরস্কারের মাধ্যমে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লার্জ ভারমেইল (Large Vermeil) পদক।
ফিলাটেলি-সম্প্রদায়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ইকো “Echo’s Phila House” নামে একটি ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশের ডাকটিকিটকে বিশ্বের সংগ্রাহকদের কাছে তুলে ধরা, এর সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং ফিলাটেলি বিষয়ে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়াই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য। জ্ঞান ভাগাভাগি, আগ্রহ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের ডাকটিকিটের বৈচিত্র্য ও তাৎপর্য তুলে ধরার মাধ্যমে দেশের ফিলাটেলি চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করাই তাঁর লক্ষ্য।

ইকো অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১১টি জাতীয় ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁর অসাধারণ সংগ্রহ ও উপস্থাপনার জন্য মর্যাদাপূর্ণ গোল্ড (Gold) পদক অর্জন করেছেন।
- বাংলাদেশ জাতীয় ফিলাটেলিক প্রদর্শনী (Banglapex 1992): ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীতে জুনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
- ভারতে উচ্চশিক্ষা (১৯৯৪-১৯৯৯): এ সময় ভারতের নামকরা ফিলাটেলিস্টদের কাছ থেকে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
- ওয়ার্ল্ড স্ট্যাম্প এক্সিবিশন (১৯৯৭, নয়া দিল্লি): যুব বিভাগে মর্যাদাপূর্ণ ‘Vermeil Medal’ অর্জন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
- এফআইপি (FIP) প্রদর্শনী: বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে চারটি এফআইপি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন।
- অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অর্জন: দুই দেশের ১১টি জাতীয় ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে অর্জনের ঝুলিতে পুরেছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘Gold Medal’ ও ‘Large Vermeil’-এর মতো সর্বোচ্চ সম্মাননা।
তিনি “Bangladesh Digital Philatelic Catalog & Philatelic Resources”-এরও প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের ডাকটিকিটকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের তথ্য ও প্রয়োজনীয় ফিলাটেলিক সম্পদ সরবরাহ করার পাশাপাশি বাংলাদেশে ফিলাটেলি সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি, সচেতনতা তৈরি এবং এই শখকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগ্রহ, গবেষণা ও প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতা শেষে এপিএফ-এর এই অভিজাত প্যানেলে অন্তর্ভুক্তিকে নিজের ফিলাটেলিক জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন জাহিদুল ইসলাম। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানান, এপিএফ-এর বিচারক প্যানেলে জায়গা পাওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই গৌরব অর্জন করাটা ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে অত্যন্ত অর্থবহ ও গর্বের।

এই স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি এখন থেকে অস্ট্রেলিয়াসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যেকোনো ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে বিচারক ও জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা অর্জন করলেন।