কৈশোরের সুর থেকে প্রবাস জীবনের গান: ‘রং’ ব্যান্ডের ১০ বছরের পথচলা

এডিলেইডের কোনো এক কনসার্ট নাইটে যখন মিলনায়তনের আলো টিমটিমে হয়ে আসে আর গিটারের প্রথম কর্ডটি চারপাশের বাতাসকে চিরে দেয়, তখনই মঞ্চে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। সেখানে উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে এটি কেবল গান নয় এটি যেন এক টুকরো চেনা অতীত, নিজস্ব সত্তা আর আবেগের এক নিখুঁত কোলাজ। আর এই অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘রঙ’ (RONG); সুদূর সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় বসেও যারা আপন মাটি আর সুরের টানে নিজেদের নতুন করে চিনিয়ে চলেছে এক অনন্য বাংলাদেশি রক ব্যান্ড হিসেবে।

প্রবাসের মাটিতে নিজের সংস্কৃতি আর শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটা সহজ নয়। কিন্তু সেই কঠিন কাজটিই গত এক দশক ধরে মেলোডি আর রকের যুগলবন্দিতে দারুণভাবে করে দেখাচ্ছে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডভিত্তিক বাংলাদেশি রক ব্যান্ড ‘রং’ (RONG)। মেলোডিয়াস রক, নস্টালজিয়া আর মঞ্চ মাতানো লাইভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে অ্যাডিলেডের বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যান্ডটি এখন এক পরিচিত নাম। সম্প্রতি ব্যান্ডটি পার করেছে তাদের গৌরবময় পথচলার ১০ বছর (এক দশক)। এই মাইলফলক উদযাপনে শিগগিরই একটি জমকালো লাইভ কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যান্ড সদস্যরা।

ইভেন্টের এক নজরে তথ্য:
অনুষ্ঠানের নাম: দশে দশ (Doshe Dosh)
আয়োজক: রং (Rong)
তারিখ: ১ আগস্ট, ২০২৬
স্থান: দ্য পার্কস থিয়েটার (The Parks Theatre)
46 Cowan St, Angle Park, SA 5010

কনসার্টের টিকিট

যেখানে শুরু: ‘রং’ ব্যান্ডের পেছনের গল্পটা নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশি ব্যান্ড মিউজিকের সোনালী সময়ের সঙ্গে জড়িত। ব্যান্ডের সদস্যদের মিউজিক জার্নি শুরু হয়েছিল সেই কৈশোরে, বাংলাদেশে থাকাকালীনই। প্রবাসের মাটিতে ‘রঙ’ একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠার অনেক আগেই এটি ছিল একদল মানুষের মনের অব্যক্ত অনুভূতি। ব্যান্ডের সদস্যদের শেকড় জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের সোনালী ইতিহাসের সাথে। গিটারিস্ট পন্নির সুরের যাত্রা শুরু হয়েছিল আশির দশকের শেষের দিকে। তৎকালীন ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড মিউজিক সিন বিশেষ করে কিং অব ওভাল জেনিথ (King of Oval Zenith)-এর হয়ে গিটারের ঝংকারে মাতাতেন তিনি। অন্যদিকে, ১৯৯৪ সালে ড্রামসের কাঠি হাতে তুলে নিয়েছিলেন ইমন। ইমন ওয়ারফেজের ড্রামার টিপু’র ছাত্র ছিলেন। সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন ফেয়ারি টেল (Fairy Tale) ব্যান্ডটি। সেই ড্রামসের ছন্দই যেন বহু বছর পর সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এখানে এসে ধরা দিয়েছে। একই সময়ে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্যাম্পাস আর স্টুডিও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজেদের সুরের জগৎ খুঁজে নিচ্ছিলেন তারেক ও রাশীদ। তারা কেবল মিউজিশিয়ান ছিলেন না, ছিলেন একেকজন গল্পকার।

রঙ (RONG)-এর অধিকাংশ সদস্যই ২০১২ সাল থেকে অ্যাডিলেডের সংগীতাঙ্গনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। শহরের বিভিন্ন কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁরা বিভিন্ন স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে নিয়মিত পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে সংগীতচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৬ সালের শুরুতে রাশীদ একটি নতুন স্বপ্ন নিয়ে পন্নি ও ইমনকে একত্র করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল—অস্ট্রেলিয়ায় মানসম্মত বাংলা রক সংগীতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে একটি ব্যান্ড গঠন করা। সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বই পরবর্তীতে রঙ (RONG)-এর ভিত্তি রচনা করে। ব্যান্ডটির প্রাথমিক সদস্যরা ছিলেন: পন্নি — গিটার ও ভোকাল, রাশীদ — কিবোর্ড ও ভোকাল, ইমন — ড্রামস, ইশতি — ম্যানেজার। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যান্ডে যোগ দেন মাহিন (লিড ভোকাল), তারেক (কিবোর্ড) এবং মনি (ভায়োলিন), যা রঙকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলে।

ব্যান্ডটির নাম ‘রঙ’ প্রস্তাব করেন পন্নি। এরপর ১৪ এপ্রিল ২০১৬, পহেলা বৈশাখের দিন, নিম্নলিখিত সদস্যদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে রঙ (RONG): মাহিন — লিড ভোকাল, পন্নি — গিটার ও ভোকাল, তারেক — কিবোর্ড, রাশীদ — বেজ গিটার ও ভোকাল, ইমন — ড্রামস, মনি — ভায়োলিন, ইশতি — ম্যানেজার। ২০১৮ সালে ইশতি মেলবোর্নে বসবাস শুরু করায় তখন থেকে ইমন রঙ ব্যান্ডের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত রঙ ধারাবাহিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে চলেছে। বাংলা রক সংগীতের শক্তি ও সৌন্দর্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যান্ডটি প্রবাসে বাংলাদেশি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

আত্মপ্রকাশ: ১৪ এপ্রিল, ২০১৬ (এডিলেইড, সাউথ অস্ট্রেলিয়া)
বর্তমান লাইন-আপ: মাহিন (লিড ভোকাল), পন্নি (গিটার ও ভোকাল), তারেক (কিবোর্ড), রাশীদ (বেস গিটার ও ভোকাল), ইমন (ড্রামস), মনি (ভায়োলিন), ইশতি (ম্যানেজার)

প্রথম অ্যালবাম: ‘রঙ বাজি’ (২০২০, জি-সিরিজ)
উল্লেখযোগ্য সিঙ্গেল: ‘বন্দী জীবন’ (২০২১)
মঞ্চের যৌথ পারফর্ম: ওয়ারফেজ, এভয়েড রাফা |

রঙের নিজস্ব সুর প্রবাসের ব্যস্ত সংগীতের বাজারে ‘রঙ’ যেভাবে নিজেদের আলাদা করে চিনিয়েছে, তা হলো তাদের গানের ভেতরের খাঁটি আবেগ। তাদের সুরে রয়েছে চিরচেনা বাংলা মেলোডির ছোঁয়া, যা রক মিউজিকের এনার্জি আর গ্রিটের সাথে দারুণভাবে মিশে গেছে। গানের মাঝে মনির ভায়োলিনের সুর এক অদ্ভুত একাকীত্ব ও নস্টালজিয়া তৈরি করে, যা পন্নির গিটার রিফ আর মাহিনের আবেগঘন কণ্ঠের সাথে মিলে শ্রোতাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। আর এভাবেই তারা তৈরি করেছেন নস্টালজিক অতীত আর মডার্ন অল্টারনেটিভ রকের এক চমৎকার সেতু। অন্যান্য কভার ব্যান্ডের চেয়ে ‘রং’ আলাদা কারণ তারা শুরু থেকেই নিজস্ব মৌলিক গান তৈরিতে মনোযোগী ছিল। এ পর্যন্ত ব্যান্ডটি সাতটি মৌলিক গান প্রকাশ করেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘জি-সিরিজ’-এর ব্যানারে প্রকাশিত হয় রঙের প্রথম অ্যালবাম ‘রঙ বাজি’। ছয়টি গানের এই অ্যালবামটিতে ফুটে উঠেছে প্রেম, দূরত্ব আর দেশের জন্য ব্যাকুলতার মতো গভীর কিছু অনুভূতি। ১. গান এ গান এ ২. কালো দীর্ঘশ্বাস ৩. সুখেরই ভেলায় ৪. সন্ধ্যা নেমেছে ৫. দ্বিধা ৬. প্রবাসে.

এরপর ২০২১ সালে, মহামারীর স্তব্ধতার মাঝে ব্যান্ডটি প্রকাশ করে তাদের একক গান ‘বন্দী জীবন’। করোনাকালের সেই স্থবিরতা আর একাকীত্বে গানটি দেশ ও প্রবাসের বহু শ্রোতার মনের খোরাক জুগিয়েছিল।

২০১৬ সালের নভেম্বরের উদ্বোধনী কনসার্ট থেকে শুরু করে আজ অব্দি প্রতিটি শো-তেই রঙ প্রমাণ করেছে তাদের মঞ্চ মাতানোর ক্ষমতা। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার প্রায় প্রতিটি বড় বাংলাদেশি উৎসবে— তা পহেলা বৈশাখ হোক, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা ঈদের আনন্দ— রঙের উপস্থিতি যেন বাধ্যতামূলক। তাদের গান প্রবাসে বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের সাথে দেশের সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন তৈরি করে দিচ্ছে।

কমিউনিটির গণ্ডি পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার মঞ্চেও দারুণ সুনাম কুড়িয়েছে ব্যান্ডটি। এডিলেইডের নরউড কনসার্ট হলে বাংলাদেশের কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ওয়ারফেজ-এর সাথে স্টেজ শেয়ার করেছে তারা। আর অতি সম্প্রতি, ২০২৬ সালের এপ্রিলে রক তারকা এভয়েড রাফা-র সাথে লায়ন আর্টস ফ্যাক্টরীতে মঞ্চ কাঁপিয়েছে রঙ।

‘রঙ’ কেবল একটি মিউজিক্যাল গ্রুপ বা ব্যান্ড নয়। তারা হলেন সাত সমুদ্র পারের এক টুকরো বাংলাদেশ। তাদের প্রতিটি লিরিকে লুকিয়ে আছে ঢাকার বৃষ্টি কিংবা শরতের আকাশের স্মৃতি; প্রতিটি ছন্দে জড়িয়ে আছে প্রবাসে নিজেদের গড়ে তোলার লড়াই। নতুন নতুন গান আর সুরের ডালি নিয়ে রঙ আজ এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক সেতু— যা যুক্ত করেছে বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়াকে, ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে। তারা কেবল গান গাইছেন না; প্রতিটি নোটের আড়ালে প্রবাসের মাটিতে বাঁচিয়ে রাখছেন নিজেদের প্রিয় স্বদেশকে।

আসছে ১০ বছর পূর্তির মেগা কনসার্ট দশটি বছর একসাথে পার করা যেকোনো ব্যান্ডের জন্যই এক বিশাল প্রাপ্তি। ‘রং’ ব্যান্ডের সদস্যরা জানান, এই দীর্ঘ পথচলায় শ্রোতাদের যে ভালোবাসা তারা পেয়েছেন, তার ঋণ শোধ করতেই তারা আয়োজন করতে যাচ্ছেন এক জমকালো লাইভ শো-এর। এই ১০ বছর পূর্তি উৎসবের কনসার্টটি অ্যাডিলেডের বাংলাদেশি ও প্রবাসী সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য এক দারুণ চমক হতে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য সেতু হিসেবে কাজ করছে ‘রং’। অ্যাডিলেডের বুকে লাল-সবুজের প্রতিনিধি হয়ে, বাংলা রকের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে তারা আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা প্রবাসী বাঙালিদের।

ছবি কৃতজ্ঞতা: ফ্রেমস পার সাফি (প্রতীক)