অবসরের পর নিজের জন্মভূমিতে ফিরে শান্তিপূর্ণ জীবন কাটানোর স্বপ্ন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিরই। কেউ বাংলাদেশে, কেউ আবার অন্য কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করেন। তবে একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে—বিদেশে চলে গেলে কি অস্ট্রেলিয়ার Centrelink-এর Age Pension পাওয়া যাবে?
উত্তর হলো—হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে। তবে পেনশনের পরিমাণ, অতিরিক্ত ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই অবসরের পর বিদেশে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিয়মগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি Services Australia-এর মুখপাত্র হ্যাঙ্ক জঙ্গেন (Hank Jongen) অবসরপ্রাপ্তদের উদ্দেশে সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়ম না জানলে অনেকের অবসরকালীন আয়ে “উল্লেখযোগ্য পার্থক্য” দেখা দিতে পারে।
বিদেশে গেলেই কী পরিবর্তন হবে?
আপনি যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাসের জন্য অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করেন, তাহলে সাধারণত—
- Energy Supplement বন্ধ হয়ে যাবে।
- Pensioner Concession Card ও অন্যান্য কনসেশন সুবিধা বাতিল হবে।
- Pension Supplement কমে মৌলিক হারে নেমে আসবে।
এছাড়া ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে গেলে Pension Supplement সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রথম ২৬ সপ্তাহের পর কী হবে?
বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম ২৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সাধারণত আপনার মূল Age Pension-এর হার অপরিবর্তিত থাকতে পারে, যদি আপনি অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করেন।
তবে এরপর আপনার পেনশন নির্ভর করবে Australian Working Life Residence (AWLR)-এর ওপর।
AWLR বলতে বোঝায়—১৬ বছর বয়স থেকে Age Pension পাওয়ার বয়স পর্যন্ত একজন ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ায় বৈধভাবে কত বছর বসবাস করেছেন।
- ৩৫ বছর বা তার বেশি বসবাস করলে সাধারণত পূর্ণ মূল পেনশন অব্যাহত থাকে।
- ৩৫ বছরের কম হলে বিদেশে ২৬ সপ্তাহের বেশি থাকলে পেনশনের পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ফিরে গেলে কী বিষয়গুলো ভাববেন?
বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেকেই সেখানে অবসর কাটানোর কথা ভাবেন। তবে শুধু খরচ কম হওয়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র কারণ হওয়া উচিত নয়।
বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত—
- স্বাস্থ্যসেবার মান ও ব্যয়
- ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমার প্রয়োজন
- ব্যাংকিং ও পেনশন গ্রহণের ব্যবস্থা
- কর (Tax) সংক্রান্ত বিষয়
- মুদ্রা বিনিময় হারের প্রভাব
- দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সতর্কতা
অনেকেই মনে করেন বিদেশে গেলেও Medicare-এর সুবিধা পাওয়া যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
অস্ট্রেলিয়ার কিছু দেশের সঙ্গে Reciprocal Health Care Agreement থাকলেও সেগুলো সাধারণত জরুরি চিকিৎসার সীমিত সুবিধা দেয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ক্যান্সারের চিকিৎসা বা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার এমন কোনো স্বাস্থ্যসেবা চুক্তি নেই। ফলে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা থাকলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় সম্পর্কে আগেই পরিকল্পনা করা উচিত।
Carer Allowance-এর ক্ষেত্রে
যারা Age Pension-এর পাশাপাশি Carer Allowance পান, তারা বা যাকে সেবা দিচ্ছেন তিনি বিদেশে চলে গেলে এই ভাতা সাধারণত বন্ধ হয়ে যায়।
বিদেশে যাওয়ার আগে যা করবেন
Services Australia পরামর্শ দিচ্ছে—
- বিদেশে যাওয়ার আগে Centrelink-কে অবশ্যই জানান।
- আপনার Age Pension-এর সম্ভাব্য পরিমাণ সম্পর্কে হিসাব করে নিন।
- Australian Working Life Residence যাচাই করুন।
- প্রয়োজনে Financial Information Service (FIS)-এর বিনামূল্যের তথ্যসেবা গ্রহণ করুন।
- যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security Agreement) রয়েছে কি না তা যাচাই করুন।
কমিউনিটির জন্য বার্তা
অবসর জীবনে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া অনেকের জন্য আবেগের বিষয়। কিন্তু আবেগের পাশাপাশি আর্থিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে Centrelink-এর নিয়ম, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিলে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
বিঃদ্রঃ এই প্রতিবেদনটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী Age Pension-এর নিয়ম ভিন্ন হতে পারে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে Services Australia (Centrelink) বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সর্বশেষ তথ্য যাচাই করুন।
⸻
তথ্যসূত্র: Services Australia (Centrelink), Department of Social Services, Australian Bureau of Statistics (ABS), এবং Hank Jongen-এর প্রকাশিত জনসচেতনতামূলক নিবন্ধ (জুলাই ২০২৬)।