২০২৩ সালের নভেম্বর মাস। অস্ট্রেলিয়ার এডিলেইড শহরে তখন বসন্তের শেষ ভাগ। চারপাশের বাগানগুলো রঙ-বেরঙের ফুলে সেজে উঠেছে, পাখিদের কলকাকলিতে বাতাস মুখরিত। আর ঠিক সেই সময়ে, সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এক শান্ত ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে ছিলেন একজন মানুষ, সুরকার ও গীতিকার ডঃ খন্দকার রায়হান মাহবুব। তাঁর চারপাশের পৃথিবীটা ছিল শান্ত ও নিরাপদ, কিন্তু তাঁর মনের ভেতর তখন জ্বলছিল এক নরকাগ্নি। পর্দায় ভেসে উঠছিল হাজার মাইল দূরের এক টুকরো ভূখণ্ডের ছবি, যার নাম গাজা।
দূরপ্রবাস সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এডিলেইড শহরে বসে যখন তিনি এই গানটি বাঁধছিলেন, তখন তাঁর চারপাশের শান্ত পরিবেশের ঠিক বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে উড়ছিল যুদ্ধবিমানের গর্জন। ডঃ খন্দকার রায়হান মাহবুবের লেখা ও সুর করা “আজ গাজায় ফোটেনি কোন ফুল” গানটি এক গভীর মানবিক হাহাকার, ক্ষোভ এবং কান্নার সুর। এই গানটির সৃষ্টির পেছনে রয়েছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম এক নির্মম মানবিক বিপর্যয়ের গল্প।
যে বয়সে শিশুদের হাতে ফুল থাকার কথা, বই থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের কাফনের কাপড়ে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই তীব্র বৈপরীত্য তাঁর চেতনাকে চাবুক মারছিল। মনের ভেতর এক প্রচণ্ড অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব জমা হতে হতে তিনি ডায়েরির পাতায় প্রথম কলম ছুঁইয়ে লিখলেন: “আজ গাজায় ফোটেনি কোন ফুল…”।
২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাস। অস্ট্রেলিয়ার এডিলেইড শহরে তখন বসন্তের শেষ, চারপাশ ফুলে ফুলে ভরা। কিন্তু ডঃ খন্দকার রায়হান মাহবুবের চোখ তখন টেলিভিশনের পর্দা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায়। সেখানে প্রতিদিন ভেসে আসছিল ফিলিস্তিনের গাজা আর পশ্চিম তীরের ধ্বংসযজ্ঞের ছবি। শান্ত, নিরাপদ এক শহরে বসে দূর দেশের শিশুদের আর্তনাদ, মায়েদের কান্না আর মাইলের পর মাইল ধ্বংসস্তূপের ছবি তাঁর ভেতরের মানুষটিকে ওলটপালট করে দিচ্ছিল। যে বয়সে শিশুদের হাতে ফুল থাকার কথা, বই থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের কাফনের কাপড়ে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই তীব্র বৈপরীত্য তাঁর চেতনাকে চাবুক মারছিল। মনের ভেতর এক প্রচণ্ড অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব জমা হতে হতে তিনি ডায়েরির পাতায় প্রথম কলম ছুঁইয়ে লিখলেন: “আজ গাজায় ফোটেনি কোন ফুল…”। প্রকৃতি সেখানে থমকে গেছে, জীবনের সব রঙ কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধের কালো ধোঁয়া।
গানটি লেখার সময় সুরকারের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ফিলিস্তিনের মানচিত্র। সংঘাত কেবল গাজায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম তীর থেকে রামাল্লা পর্যন্ত। গানের প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে সেই সময়ের বাস্তব চিত্র: “পশ্চিম তীর থেকে রামাল্লা, ভেঙ্গে পড়েছে বারুদ আর গোলা”: সংঘাত শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, পশ্চিম তীর ও রামাল্লার সাধারণ মানুষের জীবনেও নেমে এসেছিল চরম বিপর্যয়।
“ছুটছে মানুষ জানেনা, পালাবার পথ পাবেনা”: গাজা একটি অবরুদ্ধ উপত্যকা। চারিদিকে সীমানা প্রাচীর, মাথার ওপর ড্রোন আর যুদ্ধবিমান। মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটছিল একটু আশ্রয়ের খোঁজে, কিন্তু কোথাও কোনো “নিরাপদ অঞ্চল” ছিল না। এই অবরুদ্ধ খাঁচায় বন্দি মানুষের অসহায়ত্ব সুরকারকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
যখন আধুনিক ফাইটার জেটগুলো আকাশ চিরে গাজার ওপর বোমাবর্ষণ করছিল এবং ট্যাঙ্কের চেইনগুলো মাটিকে পিষে দিচ্ছিল, তখন সুরকারের মনে হয়েছিল এগুলো কোনো মানুষের তৈরি যন্ত্র নয়; এগুলো যেন একেকটা হিংস্র পশু। মৃত্যু সেখানে কোনো স্বাভাবিক বিদায় নয়, মৃত্যু সেখানে আকাশ থেকে নেমে আসা এক দানবীয় যমদূত, যা প্রতি সেকেন্ডে কেড়ে নিচ্ছে একেকটি নিষ্পাপ প্রাণ।
গানের দ্বিতীয় স্তবকে তিনি লিখেছেন, “জান্তব ট্যাঙ্কে চড়ে / অথবা ফাইটার প্লেনে / আজ গাজায় ঢুকেছে যমদূত”। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের নির্মমতাকে তিনি “জান্তব” বা পশুর মতো হিংস্র বলে আখ্যায়িত করেছেন, যা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শুধু প্রাণ কেড়ে নিতে জানে।
ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হলো ‘জায়তুন’ বা জলপাই গাছ। একেকটি জলপাই গাছ ফিলিস্তিনিদের কাছে তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি এবং শান্তির প্রতীক। ডঃ রায়হান গভীর বেদনার সাথে দেখছিলেন, শত বছরের পুরনো সেই সবুজ বাগানগুলো কীভাবে সাদা ফসফরাস আর বোমার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে (“পুড়ে গেছে সব জায়তুন জমা”)। সবচেয়ে বড় আঘাতটি ছিল মানবতার ওপর। যুদ্ধ কোনো ধর্ম চেনে না। সুরকার তাঁর গানে এক মহাসত্য ও গভীর মানবিক উদারতা ফুটিয়ে তুললেন। তিনি কেবল মসজিদের কথা লিখলেন না, তিনি লিখলেন: “পুড়ে গেছে সব সিনাগগ গির্জা / পুড়ে গেছে সব মসজিদ ইশকুল”
গাজার সেন্ট পোরফিরিউসের মতো প্রাচীনতম চার্চ, যেখানে মুসলিম-খ্রিস্টান সবাই আশ্রয় নিয়েছিল, তাও মাটির সাথে মিশে গেছে। উপাসনালয়গুলো, যা মানুষের শেষ আশ্রয়ের জায়গা ছিল, সেগুলোও আজ নিরাপদ নয়। মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস আর সম্প্রীতিকে এক নিমেষে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুরকার এখানে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ কোনো ধর্মের বন্ধু নয়। যুদ্ধে যেমন মসজিদ ও মুসলিমদের স্কুল ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে প্রাচীন গির্জা ও ঐতিহাসিক উপাসনালয়। মানুষের তৈরি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা সম্প্রীতি ও ইতিহাসকে বারুদ কীভাবে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে, এটি তারই এক বাস্তব দলিল।
এই গানটি কেবল একটি দেশের ভূ-রাজনীতির গল্প নয়; এটি হলো মাঝরাতে বোমার শব্দে কেঁপে ওঠা একটি শিশুর কান্নার গল্প, এটি হলো সন্তানহারা এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের গল্প। “আজ গাজায় ফোটেনি কোন ফুল” গানের প্রতিটি শব্দ আসলে ডঃ রায়হানের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, যা বিশ্ব বিবেকের বদ্ধ দুয়ারে বারবার আঘাত করে জিজ্ঞেস করে—”আর কত?”
ডঃ খন্দকার রায়হান মাহবুব যখন এডিলেইডের স্টুডিওতে বসে এই গানটিতে সুরারোপ করছিলেন, তাঁর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসছিল চোখ ফেটে আসছিল জল। দূর প্রবাসে বসে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার সাধ্য তাঁর ছিল না, কিন্তু একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাঁর কলম আর সুর। এডিলেইডের স্টুডিওতে যখন এই গানে সুর দেওয়া হচ্ছিল, তখন প্রতিটি টানে মিশে ছিল এক প্রবাসী বাঙালির ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা। “আজ গাজায় ফোটেনি কোন ফুল” কেবল একটি গান নয়, এটি ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসের সেই অন্ধকার দিনগুলোর এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন শৈল্পিক প্রতিবাদ।
ডঃ খন্দকার রায়হান মাহবুব এই গানটির মাধ্যমে কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘাতকে তুলে ধরেননি, বরং তিনি বিশ্ব বিবেকের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেন। যে মাটিতে শিশুরা হাসবে, ফুল ফুটবে, সেখানে আজ কেবলই লাশের গন্ধ আর বোমার আওয়াজ।
এই গানটি কেবল একটি দেশের ভূ-রাজনীতির গল্প নয়; এটি হলো মাঝরাতে বোমার শব্দে কেঁপে ওঠা একটি শিশুর কান্নার গল্প, এটি হলো সন্তানহারা এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের গল্প। “আজ গাজায় ফোটেনি কোন ফুল” গানের প্রতিটি শব্দ আসলে ডঃ রায়হানের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, যা বিশ্ব বিবেকের বদ্ধ দুয়ারে বারবার আঘাত করে জিজ্ঞেস করে—”আর কত?”
ডঃ খন্দকার রায়হান মাহবুব এই গানটির মাধ্যমে কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘাতকে তুলে ধরেননি, বরং তিনি বিশ্ব বিবেকের বদ্ধ দুয়ারে বারবার আঘাত করে একটি চিরন্তন প্রশ্ন রেখে গেছেন— “মাঝরাতে বোমার শব্দে কেঁপে ওঠা একটি শিশুর কান্না আর সন্তানহারা এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের অবসান হবে কবে? আর কত রক্ত ঝরলে শান্ত হবে এই পৃথিবী?”
ডঃ রায়হান পেশায় বিজ্ঞানী এবং একাডেমিক। তিনি সাউথ আস্ট্রেলিয়ান গভর্নমেন্ট এর একটি রিসার্চ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং পাশাপাশি এডিলেইড ইউনিভার্সিটিতে এফিলিয়েট লেকচারার হিসেবে সংযুক্ত। তাঁর তিরিশটির উপর গবেষনা প্রবন্ধ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। নিজের ফিল্ডে তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। পাশাপাশি তিনি আপাদমস্তক মিউজিশিয়ান, গিটারিস্ট এবং সংরাইটার। একযুগের বেশী সময় ধরে ডঃ রায়হান এডিলেইড এর সাউথ এসিয়ান কালচারের অন্যতম ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত অগ্নীবিনা (ফাযার ল্যুট) https://www.facebook.com/people/AgniBeena-Fire-Lute/61589694297980/ ব্যান্ড সাউথ অস্ট্রেলিয়ার মাল্টিকালচারাল ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।