সুখ নিদ্রা ঘরবাড়ি

কবীর আহমেদ: করিমউল্লাহ সাহেব জীবন সাহান্হে এসে প্রায় দুই কাঠার উপর ৮০০ ষ্কোয়ার ফিটের একটা তিন তলা বাড়ি শহরের উপকণ্ঠে নির্মাণ করলো।করিমউল্লাহ সাহেব সমগ্র জীবন সততা, নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে যে উপার্জন করছে তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ এবং সন্তানদের শিক্ষিত করে বড় করে তুলেছিল মহাকষ্ট যাত্রায়। বাড়ি নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়েই করিম উল্লাহর সাহেবের ইচ্ছে ছিল বাড়ির নামকরণ করবে এবং একটি “শুভ উদ্ভধনী” অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাড়িতে বসবাস শুরু করবেন।যাদের পরিশ্রম,সাহায্য, সহযোগিতা, মেধায় করিমউল্লাহ সাহেবের “সুখনিদ্রা ঘর বাড়ি” নির্মাণ করতে পেরেছেন যদিও তারা পেশাদার এবং অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে তবুও কলিমউল্লাহ সাহেব তাদের সবার কাছে ঋণী মনে করেন তাই বাড়ি নির্মাণে সব পক্ষ কে সাধ্য মতো “সুখনিদ্রা ঘরবাড়ি” শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত করেছেন। বাড়ির নাম করণে করিম উল্লাহর চিন্তা শক্তি তে বেশ চাপ পরেছিল। করিম ভিলা বা কুঠির, বনলতা, ক্ষণিকের ভালো লাগা, এই জাতীয় কোন নাম, নাকি করিম হাউস, করিম কটেজ এসব ইংরেজি শব্দের নাম করণ পাশ কাটিয়ে “সুখনিদ্রালয়” রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু কেমন জানি নিদ্রালয় টা বহুল ব্যবহৃত আর বিদ্যালয় বিদ্যালয় ভাব মনে হলো। বাড়ি নির্মাণ সমাপ্তির পর বসবাসের সকল পূর্ব প্রস্তুতি সম্পন্ন।

* সুখনিদ্রা ঘর বাড়ি” শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠান। আগত সম্মানিত অতিথিদের অনুমতি নিয়ে কলিমউল্লাহ সাহেব “সুখেনিদ্রা ঘরবাড়ি” নাম ফলক উন্মোচন করে আলোচনা সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে রাখার জন্য প্রথমে আমন্ত্রণ জানান রং মিস্ত্রী আবুল হোসেন কে। রং মিস্ত্রী আবুল সবাই কে সালাম দিয়ে কাজ চলাকালীন সময়ে করিম উল্লাহর ভালো ব্যবহারের প্রশংসা করে “সুখনিদ্রা ঘরবাড়ি ” তৈরিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রং মিস্ত্রীদের তার ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে। সব বাড়িওয়ালার স্বপ্ন থাকে একটা সুন্দর বাড়ি বানানোর। ধরেন গিয়া আপনি কষ্ট মষ্ট কোইরা দুই চার পাঁচ তলা একটা বাড়ি বানাইছেন। কিন্তু বাড়িটা দেখতে সুন্দর না লাগে, তাইলে তো আপনার বাড়ি বানানো খালি বৃথাই যাইবো না আপনার বাড়িটারে কাউয়া মনে হইবো সারা জীবন। তাই কাউয়া থাইকা আপনার এতো কষ্টের বাড়িটারে ময়ুর পংখীর মতো সুন্দর করার লাইগা রং মিস্ত্রি আপনার লাগবোই।দুনিয়াটা হইলো রং এর খেলা। হা হা হা। সবাই জোরে তালি লাগান। উপস্থিত সবাই জোড় তালি তো দুরের কথা সবাই এমন জোরে প্রতিবাদ শুরে করে দিল যেন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে বিশাল বিশাল তাল পড়া শুরু হয়ে গেল চারিদিকে । মানি না মানবো না শ্লোগানে শ্লোগানে “সুখনিদ্রা ঘরবাড়ি”র শুভ উদ্বোধনী যাত্রা পথ নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় কুমেরুতে পৌঁছে গেল।যেন মানি না মানবো না শিরোনামে এক মহাকাব্য রচনার শুরু হল। যে মহাকাব্য কোন একদিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সান্তনা পুরস্কার পাবে। ঘটনার ঘনঘটা মুড়িঘন্টোতে পরিনত হয়ে মুহূর্তে “সুখনিদ্রা ঘরবাড়ি” থেকে আশেপাশের কয়েক শো কিলোমিটার ভাইরাসের মতো ভাইরাল হয়ে গেছে।
ভাংগ বাড়ি। ভাংগ বাড়ি ।‌দুনিয়ার রং মিস্ত্রী এক হোও। এক হোও লড়াই করো। কি খালি রং মিস্ত্রী এক হোইবো ক্যান আমাগো অবদান কম নাকি।‌আমরা না থাকলে তো খালি বাড়ি ক্যান দুইয়া অচল হোইয়া যাইবো না।‌দুনিয়ার রাজ মিস্ত্রী এক হোও। শ্রমিক, রড মিস্ত্রী, গ্রিল মিস্ত্রী, কাঠ মিস্ত্রী, টাইলস মিস্ত্রী, স্যানিটারি মিস্ত্রী সহ সব মিস্ত্রীরা এক হোও, লড়াই করো, লড়াই করো স্লোগানে স্লোগানে ভরপুর আর চিৎকার ভাংচুর শব্দে চেঁচামেচির রেসিপিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে “সুখ নিদ্রা ঘরবাড়ির ” উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। শ্রদ্ধেয় ইঞ্জিনিয়ার গণ ফিসফিস করে একে অপরকে বলে এই মূর্খের দল বলে কি? ওদের নাকি অবদান সবচেয়ে বেশি! আমাদের অবদান ওরা বুঝবে কি করে। শিক্ষার মূল্য কি ওরা জানে? অনুষ্ঠান শেষে এমন এমন দাবার চাল দিব তখন বুঝবে মূর্খের দল অবদান কাকে বলে। ঘটনার ভাইরালে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে রব উঠে আমরা প্রতিবেশীরা সাহায্য না করলে এই বাড়ি কি নির্মিত হত? সবকিছুতে প্রতিবেশীর দাবি সবার আগে গ্রহণযোগ্য। অতএব আমাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। কয়েকজন হৃষ্টপুষ্ট পান্ডা মার্কা চেহারার পাতি সামাজিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা গেল করিমুল্লাহ চাচা ভালো মানুষ দেইখা কোন চান্দা চাই নাই। আমাগো চাহিদার মত চান্দা দিলে চাচায় তিনতলা বাড়ি বানানো তো দূরের কথা একটা বেড়ার ঘরও বানাইতে পারতো না। আবার নাম দিছে “সুখ নিদ্রা ঘরবাড়ি “।
* বেশি ঢং। ঢং ছাড়া বাঁচে না।আবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সারা জীবনটারে তেজপাতা কইরা একটা কোন রকম কবুতরের ঘর বানাইছে । মনে করছে রাজপ্রাসাদ বানাইছে। সেইটার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করতে হইবো। এখন কি হইল। আমাদের কষ্টের টাকা সব শেষ।এক রাতও ঘুমাইতে পারলাম না। সব ভাইঙ্গা ফেলাইলো। এসব কথা বিলাপে বিলাপে কলিমউল্লাহ সাহেবের স্ত্রী মুর্ছা গেলে সন্তানরা মাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
* “সুখনিদ্রা ঘরবাড়ি” ভাঙচুরের প্রচন্ড শব্দ আর “মানি না মানবো না” স্লোগানের আওয়াজ কে পেছনে ফেলে “সুখনিদ্রা ঘরবাড়ি” থেকে বের হয়ে সরল রেখায় আঁকা রাস্তায় হাটতে থাকেন কলিমউল্লাহ সাহেব । রাস্তার পাশে অনিন্দ্য সুন্দর সবুজ ঘাসের মাঠে কলিমউল্লাহ সাহেবের পা দুটো পরম মমতায় আশ্রয় পায়। করিমুল্লাহ সাহেবের যাপিত জীবনের সব কষ্টের ঘাম গুলো শরীর থেকে বেয়ে বেয়ে সবুজ ঘাসে মিশে মিশে যায়। অগণিত সবুজে ঘাসগুলো করিমউল্লাহ সাহেবের কাছে আশ্রয়ের জন্য কোন অবদানের স্বীকৃতি চায় না। কলিমউল্লাহ সাহেব দূর আকাশে নয়ন মেলে।স্পষ্ট দেখতে পান আকাশের ভিতর আরেক আকাশ। ভালোবাসার আকাশ। যে আকাশে কেবলই মানুষ মানুষকে ভালোবাসে। অসাধারণ সে ভালোবাসা।