প্রবাসে বাঙালি কমিউনিটি: সহযোগিতার সংকট, প্রতিযোগিতার মনস্তত্ত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন

নাজমীন মর্তুজা: মানুষ সভ্যতা গড়ে তুলেছে সহযোগিতার হাত ধরে। মানব ইতিহাসের শুরুতে পারস্পরিক সহায়তা, বিশ্বাস এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই ছিল টিকে থাকার অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার ধরন বদলেছে, আর তার সঙ্গে বদলেছে মানুষের আচরণও। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ যেমন নিজের উন্নতি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি সচেতন হয়েছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতা এবং বিচ্ছিন্নতাও বেড়েছে।

আমি দীর্ঘ বারো বছর ধরে  সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছি। একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজে থাকার কারণে বিভিন্ন দেশের মানুষের কমিউনিটি আচরণ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বাঙালি হিসেবে নিজের কমিউনিটির অভিজ্ঞতাও আমাকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, মানুষের জীবনে দেওয়ার আনন্দের একটি আলাদা মূল্য আছে। অর্থ, সময়, তথ্য, পরিচিতি বা মানসিক সমর্থন যেভাবেই সম্ভব, আমি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। এর বিনিময়ে কখনো বড় কিছু প্রত্যাশা করিনি। আমার প্রত্যাশা ছিল খুব সাধারণ সম্পর্কের মধ্যে সৌজন্য থাকবে, যোগাযোগ থাকবে, ভালো ব্যবহার থাকবে।

কিন্তু প্রবাস জীবনের এক পর্যায়ে অনেকেরই অভিজ্ঞতা হয়, নিঃস্বার্থ সহযোগিতা সবসময় সম্পর্ককে স্থায়ী করে না। কেউ কেউ প্রয়োজনের সময় কাছে আসে, সাহায্য নেয়, কিন্তু প্রয়োজন শেষ হলে দূরত্ব তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতা অনেক উদার মানুষকেও ধীরে ধীরে নিরাশ করে তোলে।

তাহলে প্রশ্ন আসে কেন এমন হয়?

এটি কি বাঙালির কোনো জাতিগত সমস্যা?

নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা?

কোনো জাতির মানুষ জন্মগতভাবে ভালো বা খারাপ হয় না। মানুষের আচরণ গড়ে ওঠে তার সামাজিক পরিবেশ, ইতিহাস, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

বাঙালি সমাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো আমরা আবেগপ্রবণ, সম্পর্কনির্ভর এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগকে গুরুত্ব দিই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে সম্পদ সংকট, সুযোগের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং শ্রেণিগত প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান ছিল। যখন একটি সমাজে সুযোগ সীমিত থাকে, তখন অনেক মানুষ সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতাকে বেছে নেয়। অন্যের সাফল্যকে নিজের সম্ভাবনার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে।

প্রবাসে এসে এই মনস্তত্ত্ব অনেক সময় আরও তীব্র হয়। কারণ অভিবাসী জীবনে মানুষ নতুন পরিবেশে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সংগ্রাম করে। চাকরি, বাসস্থান, সামাজিক পরিচয়, অর্থনৈতিক স্থিতি সবকিছু নিয়েই এক ধরনের চাপ কাজ করে। তখন কেউ কেউ মনে করে, অন্যের উন্নতি মানেই নিজের পিছিয়ে পড়া।

অন্যদিকে কিছু কমিউনিটি কেন তুলনামূলকভাবে বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকে?

অনেক ভারতীয়, নেপালি, চীনা, গ্রিক বা অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়, তারা নিজেদের নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে। নতুন কেউ এলে তাকে তথ্য দেয়, চাকরির সুযোগ জানায়, সামাজিকভাবে সহযোগিতা করে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কমিউনিটি সংগঠন, পারস্পরিক আস্থার সংস্কৃতি এবং এই বিশ্বাস যে একজনের উন্নতি পুরো কমিউনিটির শক্তি বাড়ায়।

বাঙালি সমাজেও এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। অনেক মানুষ নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেন, নতুনদের পাশে দাঁড়ান, কমিউনিটির জন্য কাজ করেন। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের মধ্যে সেই সম্মিলিত আস্থা ও সংগঠিত সহযোগিতার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো পেছনে কথা বলা, অন্যের সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করা এবং ছোটখাটো প্রতিযোগিতায় আটকে যাওয়া। এটি শুধু ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয় এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক মনস্তত্ত্বের ফল। যেখানে মানুষ মনে করে সুযোগ কম, সেখানে অন্যকে এগিয়ে দিতে ভয় তৈরি হয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি এই আচরণ পরিবর্তনযোগ্য। কোনো সমাজই স্থির নয়। প্রবাসী নতুন প্রজন্ম, শিক্ষিত তরুণ সমাজ এবং সচেতন মানুষরা চাইলে সহযোগিতা, পেশাদার নেটওয়ার্ক এবং পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি কমিউনিটির শক্তি নির্ভর করে তার সদস্যরা একে অপরকে কতটা উপরে তুলে ধরে তার ওপর। একজনের সাফল্য যদি অন্যজনের ঈর্ষার কারণ হয়, তবে সবাই দুর্বল হয়। কিন্তু একজনের সাফল্য যদি অন্যজনের অনুপ্রেরণা হয়, তবে পুরো কমিউনিটি এগিয়ে যায়।

মানুষের দেওয়ার মানসিকতা দুর্বলতা নয় এটি সভ্যতার অন্যতম বড় শক্তি। তবে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের সীমারেখাও জানা জরুরি। ভালোবাসা, সহযোগিতা ও মানবিকতা তখনই সুন্দর হয়, যখন তার সঙ্গে আত্মসম্মান এবং পারস্পরিক সম্মানও থাকে।

প্রবাসে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু আমরা কোন দেশের মানুষ তা নয় বরং আমরা কেমন মানুষ এবং আমরা একে অপরের জন্য কী রেখে যাচ্ছি সেটিই ভবিষ্যতের ইতিহাস লিখবে।

অভিবাসী সমাজ, পরিচয়ের সংকট এবং নারীর স্বাধীনতা নিয়েও নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের ।

বিদেশে এসে অনেক সময় আমরা একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হই। মানুষ এমন একটি দেশে বসবাস করছে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিক্ষা, যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কিন্তু নিজের কমিউনিটির ভেতরে অনেক সময় আবার পুরোনো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, বিচার আর গোঁড়ামির চর্চা চলতে থাকে।

এর পেছনে রয়েছে পরিচয়ের একটি গভীর সংকট। নতুন দেশে এসে অনেক মানুষ মনে করেন, নিজের সংস্কৃতি, পোশাক, ধর্মীয় আচার কিংবা গোষ্ঠীগত নিয়ম ধরে রাখলেই তারা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন। এটি অনেক সময় নিজের অস্তিত্ব ও পরিচয় রক্ষার একটি মানসিক চেষ্টা। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নিজের বিশ্বাসকে অন্যের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে এই দ্বৈত মানদণ্ড আরও স্পষ্ট। একজন নারী কী পরবেন, কীভাবে চলবেন, কী কাজ করবেন এসব বিষয়কে যখন সমাজের সম্মান-অসম্মানের মাপকাঠি বানানো হয়, তখন সেটি শুধু একজন নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করে না, তার আত্মবিশ্বাসকেও আঘাত করে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় একটি স্বাধীনচেতা নারীকে তার পোশাক, জীবনধারা বা সিদ্ধান্তের জন্য এমনভাবে বিচার করা হয়, যেন তিনি কোনো অপরাধ করেছেন। অথচ একজন মানুষের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার চরিত্র, কর্ম, মানবিকতা ও সমাজে তার অবদান দিয়ে; শুধু তার বাহ্যিক পরিচয় দিয়ে নয়।

ধর্মীয় শিক্ষা বা নিজের বিশ্বাস পালন করা মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখান, যা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই মূল্যবোধ যদি অন্যকে ছোট করা, ভয় দেখানো বা নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর নৈতিকতার জায়গায় থাকে না; তা সামাজিক চাপের রূপ নেয়। একটি সুস্থ অভিবাসী সমাজের সৌন্দর্য হলো সে নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসবে, কিন্তু অন্যের স্বাধীনতাকেও সম্মান করবে। নিজের পরিচয় ধরে রাখা এবং অন্যের পছন্দকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।

উন্নত সমাজের মূল শক্তি শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয় বরং মানুষের প্রতি সম্মান, ভিন্নতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা এবং ব্যক্তির স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়া। আমাদের কমিউনিটিগুলোকেও সেই ভারসাম্যের জায়গায় পৌঁছাতে হবে, যেখানে বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না সংস্কৃতি থাকবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

এর মূল কারণ হতে পারে পরিচয়ের অনিরাপত্তা থেকে জন্ম নেয় সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা, আর সেখান থেকেই আসে দ্রুত বিচার করার প্রবণতা। সে জন্যই বিদেশে বসবাসকারী অনেক বাঙালির মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা যায় নিজের রুচি, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড মনে করা এবং অন্যদেরও সেই ছাঁচে দেখতে চাওয়া। ফলে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য, ভিন্ন অভিজ্ঞতা বা বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়কে সহজে মেনে নেওয়া হয় না বরং দ্রুত বিচার, সমালোচনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত তুলনা শুরু হয়।

এর পেছনে কাজ করে অভিবাসী অনিশ্চয়তা, পরিচয় হারানোর ভয় এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক ধরনের মানসিক তাগিদ। যখন মানুষ নিজের শিকড় নিয়ে অনিরাপদ বোধ করে, তখন অনেক সময় সে নিজের সংস্কৃতিকেই আরও কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরে এবং অন্যের ভিন্নতাকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না।