জলবায়ু পরিবর্তন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাল্যবিবাহের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে

সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, এশিয়াজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ার ফলে ক্রমশ বেশি সংখ্যক কিশোরীর বাল্যবিবাহ হচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছে, চলতি বছরের এল নিনো পরিস্থিতি বাল্যবিবাহের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও দুর্যোগ-সহনশীলতা কর্মসূচির সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে অর্থায়ন ও সম্পদ আরও সমন্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।

রুনার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর, যখন তাকে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়, যাকে তিনি আগে কখনও দেখেননি। বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলের শরণার্থী শিবিরে ঘূর্ণিঝড় রিমাল আঘাত হানার পর তাদের পরিবারের হাঁস-মুরগি মারা যায়। এগুলোই ছিল তাদের খাদ্য ও আয়ের প্রধান উৎস। এর আগের বছর রুনার বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা-ই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তিনি কয়েক সপ্তাহ শ্রমিকের কাজও করতে পারেননি। ফলে তিনি ১৭ বছর বয়সী রুনা এবং তার তিন ভাইয়ের ভরণপোষণের খরচ বহন করতে আর সক্ষম হননি।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেয়ে শিশুবধূ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাল্যবিবাহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মে বিদ্যমান একটি সমস্যা। এটি প্রায়শই লিঙ্গবৈষম্য, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট, সামাজিক রীতি-নীতি, পারিবারিক সম্মান এবং যৌতুকের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এখন ধারণা করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনও বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের তনুশ্রী সোনি বলেন, “যখনই জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো প্রভাব দেখা দেয়, তখনই আমরা বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়ে যেতে দেখি। পরিবারগুলো মনে করে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিলে তাদের আর্থিক বোঝা কমবে। কারণ তারা মেয়েদের নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ স্বামীর পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখে। তাই মেয়েদের শিক্ষায় বা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করা তাদের কাছে এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা তারা আর্থিকভাবে নিতে পারে না।”

বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে মোট ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে—এমন প্রমাণ নেই। তবে উষ্ণ বায়ুমণ্ডল, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এসব ঝড় আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং মানুষের ওপর এর প্রভাবও বাড়ছে।

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়াতেই বিশ্বের অধিকাংশ বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয়। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। এখানে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অর্ধেকেরও বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ে হওয়ার কারণে রুনাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তাকে স্ত্রী এবং পরে মা হিসেবে দায়িত্ব পালনেই মনোযোগ দিতে হয়। রুনা বলেন, “আমি বিয়ে করতে চাইনি। আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।” তবে কয়েক বছর পরে তার স্বামীর পরিবার তাকে আবার পড়াশোনা শুরু করার অনুমতি দেয়। তিনি বলেন, “এতে আমি খুব আনন্দিত এবং আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। আমি চাই, আমার ছেলেও যেন ভালো শিক্ষা পায় এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়।” রুনা জানান, তিনি নিজের গল্পটি শেয়ার করতে চান, যাতে “অন্য কোনো মেয়েকে প্রস্তুত হওয়ার আগেই বিয়ে করতে না হয়।”

এল নিনো বাল্যবিবাহের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, কমরুল হাসান শাওন বলেন, তিনি প্রায়ই এমন মেয়েদের সঙ্গে দেখা করেন, যারা চিকিৎসক, পাইলট কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু বাল্যবিবাহের কারণে তাদের সেই স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়। বাংলাদেশে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের জলবায়ু পরিবর্তন ও সহনশীলতা কর্মসূচির ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক সুযোগ-সুবিধা পেলে এসব মেয়েই অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারত। তিনি বলেন, “তাদের জন্য একটি নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাই যথেষ্ট।” তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চলতি বছরের এল নিনো বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ বছরের এল নিনোকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এর ফলে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্র এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের কিছু অংশে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, এশিয়ার কিছু অংশ এবং মধ্য আমেরিকায় খরা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেন সৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শাওন বলেন, “আমাদের সত্যিই অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ বাংলাদেশ যখন সংকটে পড়ে, সেই সংকটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও পৌঁছে যায়।”

জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার ওপর আরও বিনিয়োগের আহ্বান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কিশোরীরা অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বছরের শেষ দিকে প্রকাশিতব্য পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, নেপাল এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ও পরিবেশগত চাপ কীভাবে কিশোরীদের জীবনের গতিপথ বদলে দিচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের তনুশ্রী সোনি বলেন, এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারগুলো এখনো জলবায়ু পরিবর্তন ও বাল্যবিবাহের মধ্যকার সম্পর্ককে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি, যদিও মাঠপর্যায়ে কাজ করা মানুষরা এই সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়ার বৈদেশিক সহায়তা কর্মসূচিতে জলবায়ু ও লিঙ্গসমতার ওপর জোর দেওয়া হলেও, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং পুনর্বাসনে। অথচ বাল্যবিবাহ ও নারীর প্রতি সহিংসতার মতো সামাজিক সমস্যাগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, “আমরা এই বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে পারি না যে, তরুণ-তরুণীরাই তাদের দেশের ভবিষ্যৎ, এমনকি বৈশ্বিক সমাজেরও ভবিষ্যৎ। অথচ তারাই বাল্যবিবাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি সরকারগুলোর, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রতি একটি জরুরি আহ্বান।”

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ (DFAT) জানিয়েছে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং কিশোরীদের অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, “অস্ট্রেলিয়া শিক্ষা, শিশুসুরক্ষা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগকে সহায়তা করছে।

অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন নীতির আওতায় লিঙ্গসমতা এবং জলবায়ু কার্যক্রমকে বৈদেশিক সহায়তার মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।”

২০৩০ সালের মধ্যে কোনো অঞ্চলই বাল্যবিবাহ নির্মূলের পথে নেই: গার্লস নট ব্রাইডস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই বর্তমানে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে নেই।

সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক প্রধান শ্রীয়া ঘোষ বলেন, জীবিকা ও আয়ের উৎস হারিয়ে ফেলায় অনেক পরিবারের কাছে বাল্যবিবাহ এখন একটি “টিকে থাকার কৌশল” বা “সংকট মোকাবিলার উপায়” হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাল্যবিবাহ একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও দুর্যোগ-সহনশীলতা কর্মসূচির সঙ্গে যদি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে অর্থায়ন ও সম্পদ আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে বহু বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, “যখন কোনো দুর্যোগ বা সংকট দেখা দেয়, তখন আমাদের খুব শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও এই কাজ চালিয়ে যেতে হবে—যাতে বৈষম্য কমে, বিভিন্ন ঘাটতি দূর হয় এবং পরিবারগুলোর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।”

শ্রীয়া ঘোষ আরও বলেন, সমস্যাটি মোকাবিলায় স্থানীয় সম্প্রদায় সম্পর্কে অভিজ্ঞ নারী ও কিশোরীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তার ভাষায়, “তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয় না। ফলে নীতিমালাও তাদের বাস্তব চাহিদার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে পারে না।”

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের মতে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংস্থাটি এখন বিভিন্ন এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল ফসল চাষ এবং বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ভাসমান কৃষিখামার তৈরির মতো কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এ ছাড়া কিশোরীদের ডিজিটাল দক্ষতা শেখানো হচ্ছে, যাতে তারা সরাসরি সুপারমার্কেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারে। এর ফলে তারা পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে এবং তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

কম্বোডিয়ায় প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল গ্রামীণ এলাকায় জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং নারীর অধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ফলাফল হিসেবে, ওই এলাকাগুলোতে মাত্র তিন বছরের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

তনুশ্রী সোনি বলেন, “এই পদ্ধতি কার্যকর। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হলে অবশ্যই সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মেয়েদের জন্য আমরা যে বিনিয়োগই করি না কেন, তার ইতিবাচক প্রভাব শুধু একটি প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনে।”

 Source: ABC NEWS