বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বাংলাদেশিদের কাছে শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি আবেগ, পারিবারিক মিলনমেলা এবং উৎসবের আরেক নাম। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও সেই চিরচেনা আবেগ এবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শহরের বাড়ি, রেস্তোরাঁ, পাব, স্থানীয় ক্লাব থেকে শুরু করে সিবিডির বড় বড় স্ক্রিন সর্বত্রই এখন বিশ্বকাপের রঙ।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকরা মূলত দুটি শিবিরে বিভক্ত…ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। এই বিভাজনের শিকড় কয়েক দশক পুরোনো। একদিকে পেলের উত্তরাধিকার, রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা এবং আজকের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের শিল্পময় ফুটবল; অন্যদিকে ম্যারাডোনার অবিস্মরণীয় জাদু থেকে শুরু করে লিওনেল মেসির যুগান্তকারী ক্যারিয়ার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই সমর্থন পরিবার থেকে পরিবারে, বাবা থেকে সন্তানের কাছে পৌঁছে গেছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে লিওনেল মেসির জনপ্রিয়তা যেন এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর বাংলাদেশি ভক্তদের কাছে তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং অধ্যবসায়, নেতৃত্ব এবং স্বপ্ন পূরণের প্রতীক। একইভাবে নেইমার ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই তিন তারকার জার্সি, পোস্টার এবং ম্যাচ নিয়ে আলোচনা এখন প্রতিদিনের বিষয়।
অ্যাডিলেডের বাংলাদেশি পরিবারগুলো বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিজেদের ঘরকেই ছোট্ট স্টেডিয়ামে পরিণত করছে। বন্ধু, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে রাতভর চলছে ম্যাচ দেখা। রান্নাঘরে তৈরি হচ্ছে সুগন্ধি কাচ্চি বিরিয়ানি, গরু বা খাসির বিরিয়ানি, খিচুড়ি, গরুর ভুনা, কাবাব, চিকেন রোস্ট, চা এবং নানা রকম দেশীয় নাস্তা। অনেক পরিবারের জন্য এটি শুধুই ম্যাচ দেখা নয়; বরং একসঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি উপলক্ষ।
অন্যদিকে তরুণদের একটি বড় অংশ বন্ধুদের নিয়ে অ্যাডিলেডের বিভিন্ন পাব, স্পোর্টস বার এবং স্থানীয় ক্লাবে গিয়ে বড় পর্দায় ম্যাচ উপভোগ করছে। বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপ দেখা তাদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা, যেখানে ফুটবল হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যের এক মিলনমঞ্চ।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন অনেক বাংলাদেশিকেই কাজ থেকে ছুটি নিতে কিংবা শিফট পরিবর্তন করতে দেখা যেতে পারে। রাত জেগে ম্যাচ দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং প্রিয় দলের জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করা সব মিলিয়ে এই সময়টা কমিউনিটির জন্য যেন এক উৎসব।
তবে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার প্রতি আবেগ যত গভীরই হোক না কেন, অস্ট্রেলিয়া মাঠে নামলে দৃশ্যটা বদলে যায়। অ্যাডিলেড সিবিডির বড় স্ক্রিন এবং বিভিন্ন ফ্যান জোনে বাংলাদেশি সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে। কারণ আজকের বাস্তবতা হলো— এই দেশই অনেকের নাগরিকত্বের দেশ, কারও স্থায়ী নিবাস, কারও পড়াশোনার ঠিকানা, আবার কারও জীবিকা ও স্বপ্ন গড়ার স্থান। তাই সকারুজদের সমর্থন করা অনেকের কাছে শুধু ফুটবল নয়, বরং নিজের বর্তমান ঘরকে ভালোবাসারও প্রকাশ।
বিশ্বকাপ তাই অ্যাডিলেডের বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি সংস্কৃতি, স্মৃতি, বন্ধুত্ব, খাবার, পারিবারিক বন্ধন এবং দুই মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে এক সুতোয় গেঁথে দেওয়ার এক অনন্য উৎসব। নীল-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ শেষ পর্যন্ত ফুটবলই জয়ী হয়, আর তার সঙ্গে জয়ী হয় মানুষের মিলন, আনন্দ এবং একসঙ্গে থাকার গল্প।