অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে থাবা বসিয়েছে প্রাণঘাতী বার্ড ফ্লুর উচ্চ সংক্রমণক্ষম ‘এইচ৫এন১’ (H5N1) উপরূপ (strain)। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পর এবার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া রাজ্যেও এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। একটি পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখি ‘জায়ান্ট পেট্রেল’-এর শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত পাখির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনে। এছাড়া আরও একটি সন্দেহভাজন পাখির নমুনা পরীক্ষার ফল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, এখনো দেশটির কোনো বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারে এই ভাইরাস ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উদ্ধারকেন্দ্রে ছিল আক্রান্ত পাখিটি
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার পিটার মালিনাউস্কাস এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ১৪ জুন রাজ্যের পোর্ট এলিয়টের নাইটস বিচ থেকে অসুস্থ ও দুর্বল অবস্থায় একটি ‘জায়ান্ট পেট্রেল’ পাখি উদ্ধার করা হয়।
পাখিটি উদ্ধারের পর ‘ওয়াইল্ডলাইফ ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন এসএ’ (Wildlife Welfare Organisation SA)-এর গুলওয়া উদ্ধারকেন্দ্রে পরিচর্যায় ছিল। কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক জাস্টিন বিডল বলেন,
“প্রতিবছরই কিছু পরিযায়ী পাখি ক্লান্ত হয়ে আমাদের এখানে আসে। এই পাখিটিরও ওজন বাড়ছিল এবং অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠছিল। আমরা ভাবতেও পারিনি এটি প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত।”
প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রাথমিক শিল্প ও অঞ্চল অধিদপ্তর (PIRSA) পাখিটির নমুনা পরীক্ষা করে নেতিবাচক (নেগেটিভ) ফল দিলেও পরবর্তীতে তা ‘অস্পষ্ট’ (inconclusive) বলে ঘোষণা করে। এরপর গত ২৩ জুন ফেডারেল সরকারের নির্দেশনায় পাখিটিকে মানবিক কারণে মেরে ফেলা (euthanise) হয়। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CSIRO) চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাখিটির শরীরে H5N1 ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
সংক্রমণ ছড়িয়েছে দুই রাজ্যে, বাড়ছে তালিকায় নাম
এর আগে গত সপ্তাহে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এসপেরান্স এলাকায় দুটি পরিযায়ী ব্রাউন স্কুয়া (Brown Skua) পাখির শরীরে প্রথম H5N1 শনাক্ত হয়। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই ঘটনাটির পর আক্রান্ত রাজ্যের সংখ্যা দাঁড়াল দুইয়ে।
এদিকে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুইন্ডালাপ (Quindalup) এলাকায় মৃত অবস্থায় পাওয়া আরেকটি সাউদার্ন জায়ান্ট পেট্রেল-এর নমুনাতেও H5N1 ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ পাওয়া গেছে। রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী জ্যাকি জারভিস বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই তৃতীয় সন্দেহভাজন পাখিটির নমুনা চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য CSIRO-তে পাঠানো হয়েছে। এটি নিশ্চিত হলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াবে চারে।
সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চল থেকে ছড়ানোর শঙ্কা
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ড. বেথ কুকসন এই পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রথম আক্রান্ত ব্রাউন স্কুয়া পাখিটির জিনোম সিকোয়েন্সিং (Genome Sequencing) বা জিনোম বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এই সংক্রমণের উৎস সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চল (হার্ড আইল্যান্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জ)।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ওই সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে হাজার হাজার সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিলের (Seal) শাবক এবং শত শত প্রাপ্তবয়স্ক কিং পেঙ্গুইন এই এইচ৫এন১ ভাইরাসের কারণেই প্রাণ হারিয়েছে। সেখান থেকেই পরিযায়ী পাখিদের মাধ্যমে ভাইরাসটি অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
পোলট্রি খাতে স্বস্তি, প্রত্যাহার হলো নিষেধাজ্ঞা
ক্যানবেরায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফেডারেল কৃষিমন্ত্রী জুলি কলিন্স দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন,
“এখন পর্যন্ত H5N1 ভাইরাস দেশের পোলট্রি খামার কিংবা স্থানীয় বন্যপ্রাণীতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। এটি এখনো বিচ্ছিন্ন পরিযায়ী পাখিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।”
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় বার্ড ফ্লু শনাক্তের খবর ছড়িয়ে পড়লে গত সোমবার পাপুয়া নিউগিনি সাময়িকভাবে অস্ট্রেলিয়ান পোলট্রি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে ফেডারেল সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ও আশ্বাসের পর গত বুধবার সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে দেশটি। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে অস্ট্রেলিয়ার পোলট্রি রপ্তানি খাত।
স্বেচ্ছাসেবকদের সতর্কবার্তা ও জরুরি হটলাইন
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার জানিয়েছেন, উদ্ধারকেন্দ্রে অসুস্থ পাখিটির সংস্পর্শে আসা স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে বা প্রয়োজন হলে তাদের দ্রুত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ‘ট্যামিফ্লু’ (Tamiflu) দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে তিনি বলেন, সৈকতে বা অন্য কোথাও অসুস্থ বা মৃত পাখি দেখলে কেউ যেন হাত না দেন এবং দ্রুত সরকারি জরুরি হটলাইনে তথ্য জানান।
রাজ্য আক্রান্ত/সন্দেহভাজন পাখির প্রজাতি বর্তমান অবস্থা
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ২টি ব্রাউন স্কুয়া (Brown Skua) সংক্রমণ নিশ্চিত
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ১টি জায়ান্ট পেট্রেল (Giant Petrel) সংক্রমণ নিশ্চিত (মেরে ফেলা হয়েছে)
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ১টি সাউদার্ন জায়ান্ট পেট্রেল সন্দেহভাজন (CSIRO-তে পরীক্ষা চলছে)
২০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের দাবি
অস্ট্রেলিয়ার এই নতুন সংকট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ইনভেসিভ স্পিসিস কাউন্সিল’ (Invasive Species Council) সরকারকে দ্রুত ২০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার) বিশেষ তহবিল বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির নীতিনির্ধারণ পরিচালক ক্যারল বুথ এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,
“এখন প্রশ্ন আর এই নয় যে অস্ট্রেলিয়া এই ভাইরাস রুখতে পারবে কি না। প্রকৃত উদ্বেগ হলো, যখন এই ভাইরাস আমাদের হাজার হাজার দেশীয় অনন্য পাখি ও ক্যাঙ্গারু-কয়ালার মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, তখন আমাদের বন্যপ্রাণী কতটা টিকে থাকতে পারবে। সরকারকে এখনই যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিতে হবে।”