নদীর কথা ও কলমে: কদম ফুলের ঋণ, মেঘ-বৃষ্টি-স্মৃতির আঁকিবুকি

বাংলাদেশে আজ ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩, ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষা ঋতু এলো।  ঠিক কোন সময় থেকে জানিনা আমার মাঝে সব ঋতুর কিছু সৌন্দর্য কেমন করে যেন ভীষণভাবে ঢুকে আছে, মন ও মননে। পরবাস জীবনে এসেছি এক যুগেরও বেশী। তার আগের বাংলাদেশে কাটানো সেই সময়গুলোর স্মৃতি নিয়েই কাটি জাবর… যখন তখন। একদম ছোটবেলায় তুমুল বৃষ্টি হলে কী করতাম ভাবতে গেলেই ভাসে টুকরো টুকরো, ছেঁড়া কিছু স্মৃতি…  স্কুলে টিফিন টাইমে ঝুম বৃষ্টি হলে ছেলের দল নেমে যেত মাঠে নিয়ে ফুটবল। আমরা নিরাপদ দূরত্বে বসে তা দেখছি বা না দেখার ভান করা কিশোরী দলও তা উদযাপন করছি।

আমাদের মাঝেই দুষ্টু কেউ কেউ বৃষ্টির ছাঁটে এসে চুপিচুপি হাত ভিজিয়ে ছুঁয়ে দিত, বৃষ্টির পানি জমিয়ে… আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেয়ার চেষ্টা করতো। তা নিয়েই একটু হুলোড় আনন্দ সময়। টানা বৃষ্টি হলে দুই/একদিন বাড়িতেই আটকে থাকতে হতো। স্কুলের বাইরে এই সময়গুলোতে খেলতে যেতে না পারায় রীতিমত মন খারাপ হতো। কোন না কোনভাবে দুই একজন বন্ধু চলে এলে বসে বসে পুতুলগুলোকে সাজাতাম ইচ্ছেমতোন… বাড়ির কোন গোপন আঙিনার কোণায় জমে উঠতো সেই পুতুলের বিয়ে বিয়ে খেলা, তুমুল।

বৃষ্টি থামার নাম নেই, এমন হতো কিছু সময়, সারাদিন রাতভর বৃষ্টি। তারপরও কোন না কোন ভাবে এই এতটুকুন পেলে ফুরসৎ, বন্ধুদের নিয়ে দৌড়ে চলে যেতাম দূরের খাল পেরোনো রাস্তার পারের একটা সাঁকোর কাছে, একটা অদ্ভুত জায়গা ছিল। যেখানে বিল খাল নদীর পানি এক হয়ে অচেনা এক দৃশ্যপট হতো অতি বর্ষণের সেই কিছু দিনই। পানি বয়ে যাচ্ছে সশব্দে। একদিকে ভয়, ওখানে পড়ে গেলেই হারিয়ে যেতে পারি আমরা… আবার একটা তীব্র টান, দেখতে হবে কেমন করে যায় পানি, কোথায় যায়…

কোন এক বর্ষা রাতের অলৌকিক জোছনায় একদল বড় মানুষের সাথে ছোট নৌকায় করে রাতের শাপলা বিলে পোঁছে যাওয়া, দূরের ডানা ঝাপটানো পাখি… অচেনা গানের তীব্র ভালো লাগা বেদনার সুর… এমন কত সময় গেঁথে আছে মনে।

বৃষ্টি ভেজা সবুজ বনের হাতছানি,
যতদূর চোখ যায় ধানী জমি নদী সব এক হয়ে যাওয়া থৈ থৈ পানি …

টানা বর্ষণের আগের বৈশাখী ঝড়ের দিনগুলোতেই ছিল কিছু ঝড়ের শেষে আম কুড়ানো সুখের দিন। হঠাৎ সকালের পর দুপুর বা বিকেল ছুঁই ছুঁই এমন সময়ে দূর থেকে শো শো আওয়াজে শুরু হতো শিলা বৃষ্টি এবং ঝড়ো বাতাস…

সেই ক্ষণিক ঝড় শেষ হতে না হতেই সঙ্গী সাথী নিয়ে ভোঁ দৌড় আম বাগানের খোঁজে দূর থেকে দূরের সেই পুরোনো, পাকা ভাঙ্গা লাল দেয়ালের বাড়ির পেছনে। বাড়ির মালিক ক্ষিতীশ কাকুর তীক্ষ্ণ চোখ এড়িয়ে আম নিয়ে পালানো ছিল সুকঠিন… তারপরও সে কী চেষ্টা।

না লেখক হুমায়ূন আহমেদ ওভাবে না বলে গেলে, কেউ যে কোনদিন বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল দেয়নি তা নিয়ে হয়তো আফসোসই হতোনা। তারচেয়েও বড় কথা ছোট বেলায় কদম গাছের ধারে কাছে যেয়ে অনেকবার সুগন্ধে আকুল হলেও গোছা গোছা কদম হাতে আসুক কেউ এমন ভাবনা এ বেলায় মনে এলেও আগে কোনদিন আসেইনি বোধ হয় অনেকের।

প্রিয় অনেক ফুলের মাঝে আমার খুব প্রিয় এবং প্রিয় দোলনচাঁপা, ওয়াটার লিলি, হাস্নাহেনা,আর রাতের কামিনী সুবাস…

ফেসবুক দুনিয়া আসাতেই বৃষ্টির সাথে খিচুড়ি, চা, রাবীন্দ্রিক আবহ আজকাল মোহিত করে গেলেও আমি জানি টানা বৃষ্টিতে গ্রামের বাড়ির মানুষ জন বাধ্য হয়ে খায় চাল ভাজা, জমিয়ে রাখা কাঁঠাল ভাঁজা বা শুকিয়ে রাখা বিচির ভর্তা, শুকনো পাট পাতা ভাজি বা শুঁটকী ভর্তা দিয়ে ভাত এটা ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা হাওর অঞ্চলের খাবার।
অনেকটা নিরুপায় হয়েও কেউ কেউ খায় এগুলো ভরা বর্ষায়।
(এবং সত্যি বলতে জীবনে এই বেলায় এসে আমায় তাই টানে আজকাল)!

এই বর্ষা প্যাঁচাল নিয়ে এলাম কেন, কেউ কেউ ঠিক এই লেখা পড়ছেন কিনা অস্ট্রেলিয়ার এই ভরা শীত সময়ে, তাদের ছুঁয়ে যাক ফেলে আসা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বর্ষা স্মৃতিগুলো। খুব খারাপ কোন সময়ে মন শান্তিময় থাকুক, কোন বিষণ্ণ সন্ধ্যায়ও থাকুক ঝুম বৃষ্টির আনন্দ তান হৃদয় কোণে।

টাইটানিকে থাকা বাদক দল, নিশ্চিত ডুবে যাচ্ছে জেনেও একটু থেমে আবার বাজিয়ে যাচ্ছিলো তাদের বেহালা। আমিও লিখি, আমার লেখা যেন দিয়ে যায় সাময়িক হলেও যাপিত জীবনের ক্লান্তি ভুলার রিমঝিম ধারার মত শান্তি…

বাদল দিনেরও প্রথম কদমও ফুল করলাম আজ দান, এই লেখায়…
অস্ট্রেলিয়াতে শীতের সময় বৃষ্টি এইটা ভীষণই এক অনাসৃষ্টি, আমরা অনেকেই বিষণ্ণ হয়ে যাই এই সময়টাতে।
কেউ কেউ হয়তো এই বৃষ্টিতেও কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছুটন্ত জীবনের চলন্ত গাড়ির গ্লাসের ক’ফোটা বৃষ্টির জলে তাকিয়ে, কিংবা ট্রেনে ট্রামে বসে দূরের এক জানালা আকাশ পানে চেয়ে খুঁজেন ফেলে আসা শৈশব, বন্ধুদের সাথে কাটানো কোন একটা সময় কিংবা কারো
কোন প্রিয় মুখ, থমকে যান বা যেতে যেতেই ফিরে আসেব এই জীবনের আহ্বানে, আপন নীড়ে।

আমি ভাবতে পছন্দ করি, তাই মেঘ, বৃষ্টি, বর্ষার কিছু ছেঁড়া স্মৃতি নিয়েই আঁকিবুকি করি আপন মনে। মাঝে মাঝে অল্প কিছু লিখেও ফেলি। ‘আমাদের কথার’ পাঠকদের জন্যেই’ আমার ক’টি এলোমেলো অনুকাব্য, যাতে লেগে আছে, বৃষ্টির ছোঁয়া।

হঠাৎ বৃষ্টি, উদাস তুমি,
দৃষ্টি আকাশ জুড়ে
খুঁজবে কি আর একটিবার
আমায় প্রাণভরে!

আজ ভীষণ করে মেঘ ডাকুক
তোমায় ছুঁয়ে বৃষ্টি নামুক
ভীষণ খরার কষ্ট নিভুক
তুমি ও সে, জুঁই বেলী
সকলই ভিজুক, ভিজুক আর ভিজুক!

তোমায় ভালোবেসেছিলাম
রিনিক ঝিনিক ঝর্ণাধারার মত,
স্বতঃস্ফূর্ত
তোমায় ভালোবেসেছিলাম
বৃষ্টি শেষের রোদের মত
কলকল ছলছল
অবিরত!!

আর কোনদিন পাওয়া হবেনা জেনেও
তাকিয়ে থাকি রেললাইন ছুঁয়ে থাকা অসীমে…
দূরের নীলে ভাসতে থাকা তুমি
এই বুঝি ছুঁয়ে থাকা সেই হাত…
হাঁটছি হাঁটছি যেন ফিরে গেছি সেই শৈশবে।

আর কোনদিন গাওয়া হবেনা জেনেও
কান পেতে শুনি, ঝুম বৃষ্টির অপার্থিব গান..
তোমাতে লেগে থাকা সুখ, রিনিক ঝিনিক
কাজল জলে লেপ্টে থাকে কান্নার ঢেউ
হারাই হারাই, হারিয়ে ফেলি প্রিয় সেই মুখ!!