অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে প্রবাসী বাঙালিদের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে ‘চাঁদ রাত মেলা’। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে আয়োজিত এই মেলায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপচে পড়া ভিড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক টুকরো বাংলাদেশের। আয়োজকদের মতে, এবারের মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই অনুষ্টানটি ম্যাশন লেকের ডেনিসন সেন্টারে ১৯ মার্চ ২০২৬ এ অনুষ্ঠিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী এ্যাডিলেডে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্লাব অস্ট্রেলিয়া ইনক (BCA)-এর উদ্যোগে আয়োজিত হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘চাঁদ রাত’ উৎসব। ২০১৭ সালে প্রথম পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্লাব অস্ট্রেলিয়া ইনক (BCA)-এর উদ্যোগে আয়োজিত হয় চাঁদ রাত। বরাবরের মতো এবারও প্রবাসীদের প্রাণের মেলবন্ধনে মুখরিত হবে এ্যাডিলেড। এ্যাডিলেডের প্রবাসী সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এখনকার চাঁদ রাত উৎসবগুলো সিডনি বা মেলবোর্নের মতোই জমকালো হয়ে উঠেছে। প্রতিবছরই ঈদের আগের রাতে এ্যাডিলেডের কোনো বড় কমিউনিটি সেন্টারে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।

স্থানীয় একটি হলরুমে আয়োজিত এই মেলায় বিকেল হওয়ার আগেই মেলা প্রাঙ্গণ জনারণ্যে পরিণত হয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, মেলা প্রাঙ্গণে রীতিমতো ‘পা ফেলার জায়গা নেই’। রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবি আর শাড়িতে সেজে আসা নারী, পুরুষ ও শিশুদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
মেলার প্রবেশপথে পা রাখতেই মনে হবে, এটি সিটির কোনো বিপণিবিতান নয়, বরং ঢাকার গাউছিয়া বা নিউ মার্কেট। চারদিকে রঙিন সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরা মানুষের ভিড়। প্রবাসী নারীদের হাতে মেহেদির আলপনা আঁকার ব্যস্ততা আর শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত চারপাশ। অস্ট্রেলিয়ার ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও দেশের আমেজ খুঁজে পেতে মেলায় ছুটে এসেছেন হাজারো বাংলাদেশি। দর্শনার্থীদের ভিড় ডেনিসন সেন্টারের সীমানা ছাড়িয়ে পাশের রাস্তায় গিয়ে ঠেকেছে।
মেলায় আসা এক দর্শনার্থী বলেন, “এখানে এলে মনেই হয় না যে আমি দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে আছি। চটপটি, ফুচকা আর মানুষের এই ভিড় আমাকে মুহূর্তেই দেশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।”
দেশের মতো এখানে রাত জেগে শপিং করার সুযোগ কম থাকলেও, চাঁদ রাতের স্টলগুলো সেই অভাব পূরণ করে। স্টলে স্টলে ঘুরে গয়না দেখা বা দেশি ঘরানার কারুকাজ করা পোশাক কেনা প্রবাসীদের জন্য এক পরম পাওয়া। বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের সাথে আড্ডায় প্রবাসীরা বারবার ফিরে যান দেশে কাটানো সেই পুরনো চাঁদ রাতগুলোতে। এই আড্ডাগুলোই প্রবাসের নিঃসঙ্গতাকে ভুলিয়ে দেয়।
মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল বাহারি পোশাক, প্রসাধন আর রকমারি খাবারের স্টল। দেশি কাপড়ের স্টলগুলোতে ছিল নারীদের উপচে পড়া ভিড়। পাশাপাশি ছিল শিশুদের খেলনা ও মেহেদি দেওয়ার বিশেষ আয়োজন। মেলার এক প্রান্তে ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি বিরিয়ানি আর চটপটি-ফুচকার গন্ধে জিভে জল আসছিল দর্শনার্থীদের।

মেলায় আসা এক দর্শনার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “বিদেশের মাটিতে এমন ভিড় দেখে মনেই হচ্ছে না যে আমি দেশের বাইরে আছি। এই মেলা আমাদের জন্য শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং একে অপরের সাথে দেখা হওয়া আর দেশের স্মৃতি রোমন্থনের বড় সুযোগ।”
কেনাকাটার পাশাপাশি মেলার মঞ্চে পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় শিল্পীদের গান দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। বিশেষ আর্কষণ ছিলো “অগ্নিবীনা” ব্যান্ড দলের পরিবেশনা গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই মেলায় প্রবাসীরা একে অপরের সঙ্গে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

আয়োজক কমিটি বাংলাদেশ ক্লাব অস্ট্রেলিয়া ইনক (BCA)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরতেই প্রতিবছর এই চাঁদ রাত মেলার আয়োজন করা হয়। এবারের বিশাল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরে থাকলেও শেকড়ের প্রতি প্রবাসীদের টান কতটা গভীর।