পুলিশের অভিযোগ, সিডনির এক বাবা কয়েক মাস ধরে স্ত্রী ও দুই অটিস্টিক সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থে ঘটে যাওয়া একটি অনুরূপ হত্যাকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এই ভয়াবহ পরিকল্পনা করেছিলেন বলে দাবি তদন্তকারীদের।
সোমবার রাতে সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিম উপকণ্ঠ ক্যাম্পবেলটাউনে নিজেদের বাসা থেকে ৪৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি নিজেই পুলিশে ফোন করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি ট্রিপল জিরো অপারেটরকে বলেন, “আমি আমার বাচ্চাদের আর স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেছি।”
ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ তার ৪৬ বছর বয়সী স্ত্রী এবং চার ও ১২ বছর বয়সী দুই ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে। তিনজনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গুরুতর জখমের চিহ্ন ছিল। আঘাতগুলোর বর্ণনা অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়ায় সংবাদমাধ্যম সেগুলো প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি।
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পারিবারিক সহিংসতাজনিত তিনটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আইনি কারণে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি আগে কখনও পুলিশের নজরে আসেননি এবং তার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ডও ছিল না। পরিবারটির সঙ্গে ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিটিজ অ্যান্ড জাস্টিসেরও আগে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
ধারণা করা হচ্ছে, বাবা ঘরে থেকে দুই সন্তানের দেখাশোনা করতেন। দুই শিশুরই বিকাশজনিত সমস্যা ছিল। স্ত্রী বাইরে কাজ করতেন। প্রায় এক দশক আগে তারা বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন করেছিলেন।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি পার্থে ঘটে যাওয়া এক হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পড়েছিলেন। সেই ঘটনায় মাইওয়েনা গোয়াসদুয়ে (৪৯) এবং জ্যারড ক্লুন (৫০)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তারা তাদের গুরুতর অটিজমে আক্রান্ত দুই ছেলে—১৬ বছর বয়সী লিয়ন এবং ১৪ বছর বয়সী ওটিসকে হত্যা করে পরে নিজেরাও আত্মহত্যা করেন।
আদালতের নথিতে বলা হয়, “২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তি তার স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন।”
পার্থের সেই পরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছিলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে ভুগছিলেন। সিডনির এই পরিবারের পরিচিতরাও মঙ্গলবার একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের কয়েক মিনিট পর অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশকে জানান যে তার দুই ছেলেরই গুরুতর অটিজম ছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। যদিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি ক্যানসারমুক্ত অবস্থায় ছিলেন।
ঘটনার পর পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং তদন্তকারীরা প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
পরিবারটির ঘনিষ্ঠজনেরা শোকে ভেঙে পড়েন। কয়েকজনকে রাস্তায় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। গোয়েন্দারা তাদের সান্ত্বনা দিতে এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য আলাদা জায়গায় নিয়ে যান।
বাড়িটির নিচতলায় থাকা এক নারী ভাড়াটিয়া ঘটনাটি জানতে পেরে শকে চলে যান।
এক প্রতিবেশী জানান, তিনি প্রায়ই শিশু দুটিকে বাড়ির বাইরে খেলতে দেখতেন। “ওরা খুব হাসিখুশি ছিল,” বলেন তিনি।
আরেক স্থানীয় নারী বলেন, ফুল কেনার মতো টাকা তার ছিল না। তাই নিজের বাগান থেকে ফুল কেটে এনে ঘটনাস্থলে রেখে গেছেন।
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “কীভাবে কেউ এটা করতে পারে? ওরা তো শিশু… একেবারে ছোট্ট শিশু।”
মঙ্গলবার ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল কোর্টে সংক্ষিপ্ত শুনানিতে অভিযুক্তকে হাজির করা হয়নি এবং তিনি জামিনও চাননি।
তার আইনজীবী জাওয়াদ হোসেন আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, “এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা, এবং তিনি ভীষণ ভেঙে পড়েছেন।”
এদিকে, এনএসডব্লিউ পুলিশের অ্যাক্টিং সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মোরোনি বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথম সাড়া দেওয়া পুলিশ সদস্যরা “অত্যন্ত সহিংস একটি দৃশ্য” দেখেছেন।
তিনি জানান, বাড়ির ভেতর থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে, যা নিহতদের আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়নি।
মোরোনি বলেন, “গার্হস্থ্য সহিংসতা এনএসডব্লিউ পুলিশের এক নম্বর অগ্রাধিকার। আমরা এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রাখব।”
নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার Chris Minns বলেন, এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে মানুষ “ক্ষুব্ধ ও বিধ্বস্ত”— এবং তিনিও একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, জুন মাসের রাজ্য বাজেটে গার্হস্থ্য সহিংসতা মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
সম্প্রতি “অপারেশন আমারোক” নামে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে চার দিনে ৯৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দুই হাজারের বেশি অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযানটি পারিবারিক ও গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধে পরিচালিত হয়।
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ মানসিক সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন, তাহলে অস্ট্রেলিয়ায় লাইফলাইন ১৩ ১১ ১৪ নম্বরে, ১৮০০রেসপেক্ট ১৮০০ ৭৩৭ ৭৩২ নম্বরে, অথবা কিডস হেল্পলাইন ১৮০০ ৫৫১ ৮০০ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
news source: the Sydney morning herald