অয়ন ইসলাম: আগেই বলে রাখি এই লেখাটা আমার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। প্রত্যেকের পরিস্থিতি ভিন্ন, সুতরাং নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী পরামর্শগুলোকে বিবেচনা করতে হবে।
চাকরী পাবার ক্ষেত্রে কোনো হার্ড অ্যান্ড ফাস্ট রুল নেই। আপনি কী করতে চান, আপনার অবস্থা, পারিপার্শ্বিকতা চিন্তা করে এগোনো উচিৎ বলে মনে করি।
তবে মোটামুটি ভাবে চাকরী খোঁজার বা পাওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে যে জিনিসগুলো থাকা জরুরী তা হচ্ছে এই রকমঃ
প্রাথমিক সিভি – সিভিটা অবশ্যই যে পদের জন্য আবেদন করছেন, সেই পদের পরিপ্রেক্ষিতে হতে হবে। এখানে ওয়ান সাইজ ফিটস অল কথাটা খাটে না একেবারেই। মনে রাখবেন, চাকরীদাতা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট স্কিল খুঁজছে। তারা আসলে একটা সমস্যায় আছে, তাদের সেই সমস্যার যে সবচেয়ে ভালো সমাধান দিতে পারবে, তাকেই তাদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ হবে। চাকরীর বিজ্ঞাপন পড়ে বোঝার চেষ্টা করুন তাদের চাহিদাটা কী। সেইমতো আপনার সিভি সাজান। গণহারে একই সিভি পঞ্চাশ জায়গায় না পাঠিয়ে পাঁচটা জায়গায় টেইলরড সিভি পাঠান। আপনার ইন্টারভিউয়ে কল পাবার সম্ভাবনা বাড়বে।
কাভার লেটার – এটাই আপনার নিজেকে (আসলে নিজের স্কিলকে) বিক্রি করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ছোট ছোট তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে চাকরীদাতাকে বোঝান কেন আপনি উদ্দিষ্ট পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হবেন। সেটা করার একটা ভালো উপায় হচ্ছে পদটিতে সাফল্যের সাথে কাজ করতে হলে যে স্কিলগুলো থাকা দরকার, তার বেশীরভাগ আপনার আছে সেটা বর্ণনা করা।
ট্রান্সফারেবল স্কিল – বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা সবগুলো যোগ্যতা কারো থাকবে, এটা বিজ্ঞপনদাতাও আশা করে না। তাই যে স্কিলগুলো ফুলফিল করতে পারবেন, সেগুলোর কথা বলুন। সাথে অন্য কোন স্কিল আপনার আছে, যেটা এখানে কাজ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারবে? দেশে আপনার কোন কোন অভিজ্ঞতাক এখানের কাজে ভ্যালু অ্যাড করতে পারে? সেগুলো উল্লেখ করুন।
ইন্টারভিউ স্কিল – প্র্যাকটিসের কোনো বিকল্প নেই। ইন্টারনেটে জব ইন্টারভিউয়ের অনেক প্রশ্ন পাবেন। সেগুলোর উত্তর তৈরি করুন। উত্তরে নিজের জবের অভিজ্ঞতার গল্প যোগ করুন। তারপর সেগুলো বলা প্র্যাকটিস করুন। কোনো বন্ধুর সাথে বা পরিবারের কারো সাথে সেগুলো বলা প্র্যাকটিস করুন। না হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করুন। আরো ভালো হয় নিজের উত্তরগুলো বলছেন এমন অবস্থার ভিডিও যদি করতে পারেন। নিজের বডি ল্যাংগোয়েজ, ফেসিয়াল এক্সপ্রেশান দেখতে পারবেন। বুঝতে পারবেন কোন কোন জায়গায় উন্নতি করা যায়। অস্ট্রেলিয়াতে কিন্তু হাসিখুশি এবং ইজিলি অ্যাপ্রোচেবল অ্যাটিটিউড পছন্দ করে। সুতরং – প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস।
ইন্টারভিউ অ্যাটায়ার – এই ক্ষেত্রে দ্য মোর দ্য মেরিয়ার। যতটা পারুন ফর্মাল পোষাক পরুন। ম্যান্ডেটরি না হলেও আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আর কিছু না হোক আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে অনেকটা।
আত্মবিশ্বাস – অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। আপনি নিজেই যদি কাজটা করার ব্যপারে আপনার যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দিহান হন, ইন্টারভিউ গ্রহণকারীও সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারবেন।
নেটওয়ার্ক – সম্ভবত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নেটওয়ার্কিং। একটা কথা প্রায় সময়েই বলা হয় ইট ম্যাটারস হু ইউ নো। চেষ্টা করুন প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক বাড়াতে। লিঙ্কডইনে অ্যাকটিভ থাকুন, বিভিন্ন ডিসকাশনে অংশ নিন। আপনার আশেপাশে কিভাবে কোথায় নেটওয়ার্ক বাড়াতে পারেন দেখুন। বাচ্চার স্কুলের অন্যান্য প্যারেন্টরা? প্রফেশনাল বডির কোনো ইভেন্ট? ওয়ার্কশপ? তবে হামলে পড়বেন না, প্রফেশনাল এটিকেট বজায় রাখুন। নিজের ব্যক্ত্বিত্ব প্রতিষ্ঠা হতে দিন।
অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম জবটা পাওয়া আমাদের মত ওভারসীজ থেকে আসা মানুষদের জন্য অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রথম জবের পরে অনেকের জন্যই বাকি পথটা মসৃণ হয়ে আসতে পারে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর হচ্ছে সঠিক অ্যাটিটিউড।
অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম জবটা পাওয়া আমাদের মত ওভারসীজ থেকে আসা মানুষদের জন্য অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রথম জবের পরে অনেকের জন্যই বাকি পথটা মসৃণ হয়ে আসতে পারে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর হচ্ছে সঠিক অ্যাটিটিউড। দেশে যে রকম ভালো পদে ছিলেন, এখানেও যদি শুরুতে তেমন পদ আশা করেন, তাহলে আশাহত হবার সম্ভাবনা খুব বেশী। বরং হয়তো জব চেইনের একেবারে নিচের তলা থেকে শুরু করতে হতে পারে। প্রথম যে জবটাই পান, নিয়ে নিতে পারেন। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জিনিসটা কার্যকরী। আমার প্রথম জব থেকে খুব বেশী স্যালারি পাইনি, কিন্তু শিখেছি অনেক কিছু। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান জব কালচার সম্পর্কে। অনেক ভুল ধারণা ভেঙে গেছিল। জানতাম না এমন অনেক কিছু জেনেছি।
জবে অ্যাপ্লাই করার আগে সঠিক তথ্য পাচ্ছেন কিনা নিশ্চিত করুন। সেই সাথে যে কোম্পানীতে অ্যাপ্লাই করছেন তাদের সম্পর্কে জানুন। তা সে কোম্পানী যত ছোটই হোক না কেন। কোম্পানী কালচার সম্পর্কে জানতে পারলে সেই কালচারের সাথে আপনি কিভাবে ম্যাচ করেন সেটাও কাভার লেটারে লিখতে পারেন। বাড়তি সুবিধা দেবে।
কীভাবে সিভি বানাচ্ছেন, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ন। কোলস বা উলওয়ার্থের ক্যাশ কাউন্টারের কাজে আপনার অ্যাডভান্সড রকেট সায়েন্সের পি এইচ ডি হয়তো রিলেভ্যান্ট না, যতটা রিলেভ্যান্ট বাংলা দোকানের সেলসম্যান হিসেবে পার্ট টাইম কাজ করাটা। আপনি দেখাতে পারবেন আপনার ক্যাশ হ্যান্ডলিঙের অভিজ্ঞতা হয়েছে, অভিজ্ঞতা হয়েছে কাস্টমারদেরকে সার্ভিস দেয়ার।
আর সবচেয়ে বড় যে টিপসটা আমি দিতে পারি তা হলো সততা। প্রফেশনাল ইন্টিগ্রিটি নিয়ে যতই বলি, যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হবে না তাও। আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভুল তথ্য দেবেন না, প্লিজ। ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্নকর্তারা সেটা ধরে ফেলবেন ঠিকই। তা যদি নাও হয়, কাজে নামার কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশ পেয়ে যাবে। সৎ থাকুন, নিজের উপরে বিশ্বাস রাখুন। দেশে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলে এসেছেন ভাই/আপু। এখানেও পারবেন। ধৈর্য্য ধরুন, চেষ্টা চালিয়ে যান। আর নিজেকে প্রস্তুত করুন।
