মাহবুব সিরাজ: দেশের ও প্রবাসের শ্রমজীবী মানুষকে মহান শ্রমিক দিবসের আন্তরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সংগ্রামী শুভেচ্ছা।
পহেলা মে, বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে পরিচিত এই ‘মে দিবস’ অস্ট্রেলীয়দের কাছে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি তাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৮৫৬ সালে মেলবোর্নের রাজপথে শুরু হওয়া সেই বিখ্যাত ‘আট ঘণ্টা কাজের দাবি’র লড়াই আজ অস্ট্রেলীয় জীবনযাত্রার এক মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়েছে ।
অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর থেকে প্রতিটি পদক্ষেপে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক বিশাল এবং শক্তিশালী উপস্থিতি দেখে আমি সত্যিই অভিভূত। সরকারি খাত থেকে শুরু করে হাসপাতাল, উৎপাদন শিল্প, নির্মাণ কাজ, শিক্ষকতা—এমনকি পুলিশ বাহিনীতেও ট্রেড ইউনিয়নের এই বলিষ্ঠ অবস্থান দেখে অবাক হতে হয়। এটা দেখে শ্রদ্ধা জাগে যে, অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির অনেক বড় বড় নেতা এই ইউনিয়ন থেকেই উঠে এসেছেন। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার পিটার মালিনস্কা ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ‘শপ, ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড অ্যালাইড এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন‘-এর স্টেট সেক্রেটারি হিসেবে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বব হক ১৯৬৯ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ‘অস্ট্রেলিয়ান কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়ন‘-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন, আর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল’ইয়ার হিসেবে শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করেছেন।
শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার ট্রেড ইউনিয়নগুলো কতটা নিবেদিতপ্রাণ, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সাম্প্রতিক সময়ের ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট‘ বা ‘বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকার‘ অর্জন। এখন একজন শ্রমিক ছুটির পর অফিসের ফোন বা ইমেইল এড়িয়ে যেতে পারেন—এটি তার আইনগত অধিকার। এই দেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মীরাই বুক ফুলিয়ে ইউনিয়নে অংশ নিতে পারেন।
সদস্য সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন হলো ‘অস্ট্রেলিয়ান নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি ফেডারেশন‘ (প্রায় ৩,৪২,০০০ সদস্য), এরপরই আছে ‘এসডিএ‘ (১,৯৬,০০০ সদস্য) এবং ‘অস্ট্রেলিয়ান এডুকেশন ইউনিয়ন‘ (১,৮৩,০০০ সদস্য)। এছাড়া ‘ইউনাইটেড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন‘ (১,৪৬,০০০), ‘অস্ট্রেলিয়ান সার্ভিসেস ইউনিয়ন‘ (১,৩৬,০০০), এবং নির্মাণ ও খনি খাতের ‘সিএফএমইইউ‘ (১,৩২,০০০) প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের অধিকারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ‘সিপিএসইউ‘ (১,২৫,০০০) এবং ‘অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন‘ (৭৭,০০০) লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এক জন পূর্ণকালীন কর্মীর জন্য বার্ষিক মেম্বারশিপ ফি সাধারণত ৫০০ থেকে ৯০০ ডলারের মতো (যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৫,০০০ থেকে ৯৫,০০০ টাকা)। তবে আনন্দের বিষয় হলো, যাদের আয় কম বা যারা পার্ট-টাইম কাজ করেন, তাদের জন্য ফি অনেক কম রাখা হয়। সাধারণ মানুষের জন্য এই যে সহমর্মিতা আর ঐক্যের শক্তি, তা সত্যিই মনে দাগ কেটে যায়।
শ্রমিক অধিকারের সূতিকাগার: অস্ট্রেলিয়াকে আধুনিক বিশ্বের শ্রমিক অধিকারের অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়। ১৮৫৬ সালের ২১ এপ্রিল মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজমিস্ত্রিরা (stonemasons) কাজ বন্ধ করে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। তাদের মূল দাবি ছিল ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদন’ । এই আন্দোলনের সফলতাই পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছিল ।
অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন উদযাপন
অস্ট্রেলিয়া একটি বড় দেশ হওয়ায় এখানে মে দিবস বা ‘লেবার ডে’ (শ্রমিক দিবস) উদযাপনের তারিখ অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন হয়:
আধুনিক উদযাপন ও উৎসবের আমেজ
বর্তমান সময়ে মে দিবস কেবল দাবি আদায়ের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দিনটি এখন মেপল ড্যান্স (maypole dancing), বর্ণাঢ্য পদযাত্রা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে উদযাপিত হয় । সিডনি ও ব্রিসবেনের মতো বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ ইউনিয়নগুলোর পদযাত্রায় অংশ নেয় । কুইন্সল্যান্ডের বারকালডাইন (Barcaldine)-এ ঐতিহাসিক ‘ট্রি অব নলেজ’ উৎসবের মাধ্যমে ১৮৯১ সালের মেষপালক শ্রমিকদের (shearers’ strike) ধর্মঘটের স্মৃতি স্মরণ করা হয়।
পহেলা মে অস্ট্রেলিয়ার শ্রমজীবী মানুষের জন্য আত্মসম্মান ও সংহতির প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের দিনে আমরা যে উন্নত কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি, তার পেছনে রয়েছে পূর্বসূরিদের বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ।
সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় শ্রমিক দিবস: অক্টোবর মাসের ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাস
সাউথ অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি বাকি অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে কিছুটা আলাদা। যদিও বিশ্বজুড়ে পহেলা মে ‘মে দিবস‘ পালিত হয়, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটি উদযাপন করে অক্টোবর মাসে। ২০২৬ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী সরকারি ‘লেবার ডে‘ বা শ্রমিক দিবস পালিত হবে সোমবার, ৫ অক্টোবর ।
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রেক্ষাপটে শ্রমিক দিবসের গুরুত্ব:
২০২৬ সালের অক্টোবর দীর্ঘ ছুটির পরিকল্পনা: দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিকদের জন্য এই দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতি। সাউথ অস্ট্রেলিয়া সরকারের (SafeWork SA) তথ্যানুযায়ী, ৫ অক্টোবর সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে।
সাউথ অস্ট্রেলিয়ার অক্টোবর ‘লেবার ডে‘: উৎসব ও ঐতিহ্যের বিবর্তন: সাউথ অস্ট্রেলিয়ার (SA) শ্রমিক দিবস বা ‘লেবার ডে‘ কেবল একটি ছুটি নয়, বরং এটি শ্রমিকদের আত্মমর্যাদার এক ঐতিহাসিক দলিল। ১৯০০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেপ্টেম্বর মাসে পালন শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার পালন করা হয় । ২০২৬ সালে দিনটি পালন করা হবে ৫ অক্টোবর।
ঐতিহাসিক পদযাত্রা (Historical Processions): উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে ‘এইট আওয়ার্স ডে‘ বা আট ঘণ্টা দিবস পালনে বিশাল কুচকাওয়াজ বের করা হতো ।
বর্তমান ও আধুনিক উদযাপন: সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মে দিবস বা লেবার ডে-র উদযাপনে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে:
অস্ট্রেলীয় রাজনীতিতে ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে মে দিবস বা লেবার ডে এই প্রভাবের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
অস্ট্রেলীয় রাজনীতিতে ইউনিয়নের প্রভাব এবং মে দিবসের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অস্ট্রেলীয় লেবার পার্টি (ALP)-এর জন্ম ও রাজনৈতিক সংযোগ
অস্ট্রেলীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অস্ট্রেলীয় লেবার পার্টি (ALP)। ১৮৯০-এর দশকের বড় মাপের মেষপালক (shearer) ও সামুদ্রিক শ্রমিক ধর্মঘটগুলো ব্যর্থ হওয়ার পর, শ্রমিক নেতারা বুঝতে পারেন যে কেবল আন্দোলনের মাধ্যমে নয়, বরং আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২. মে দিবস: লড়াইয়ের বৈশ্বিক মাইলফলক
অস্ট্রেলিয়ার মে দিবস উদযাপনের শেকড় রয়েছে ১৮৫৬ সালের ‘আট ঘণ্টা কাজের দাবি‘ আন্দোলনের মধ্যে, যা আন্তর্জাতিকভাবে একটি নজির স্থাপন করেছিল ।
৩. নীতি নির্ধারণে প্রভাব ও আধুনিক অর্জন
ট্রেড ইউনিয়নগুলো কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক নয়, বরং তারা অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে :
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক অবস্থান: যদিও গত চার দশকে অস্ট্রেলিয়ায় ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে (বর্তমানে প্রায় ১২.৫%), তবুও তারা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী রয়ে গেছে । আধুনিক ইউনিয়নগুলো এখন কেবল কারখানা নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সরকারি খাতের কর্মীদের অধিকার রক্ষায় বেশি সোচ্চার ।
References:
1. Historical Foundations & May Day Origins
National Museum of Australia (NMA). (n.d.). Eight-hour day. Retrieved from nma.gov.au
Australian Trade Union Institute (ATUI). (n.d.). The History of May Day. Retrieved from atui.org.au
2. South Australian Specific History
State Library of South Australia. (2023). Labour Day in South Australia. Retrieved from slsa.sa.gov.au
SafeWork SA. (2024). South Australian Public Holidays. Retrieved from safework.sa.gov.au
AdelaideAZ. (n.d.). Trade Unionism in South Australia. Retrieved from adelaideaz.com
3. Union Influence & Politics
Australian Council of Trade Unions (ACTU). (2024). The Union Advantage & Political Advocacy. Retrieved from actu.org.au
Australian Labor Party (ALP). (n.d.). Our History: From Barcaldine to Government. Retrieved from alp.org.au
4. Cultural & Tourism References
History Trust of South Australia. (2024). South Australia’s History Festival Program. Retrieved from history.sa.gov.au
Barcaldine Regional Council. (n.d.). The Tree of Knowledge. Retrieved from barcaldinerc.qld.gov.au
Suggested Academic Reading
Byrne, L. (2020). No Power Greater: A Century of Labour in South Australia. Labour History Books.