শৌভনিক দত্ত: ১৯৮০ এর দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজ নাইট রাইডার আমাদের মধ্যে এক ধরনের কল্পনা আর অবিশ্বাসের মিশেল তৈরি করত। মনে হতো, এমন একটা গাড়ি কি সত্যিই সম্ভব? একটা গাড়ি, যে নিজে নিজেই চলে, কথা বলে, আর নিরাপদে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। তখন সেটা ছিল নিছক কল্পনা। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই কল্পনা আর খুব দূরের কিছু নয়।
গত কয়েক বছর ধরে একটি গাড়ি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ হয়েছে। আগে গাড়ি মানে ছিল শুধু ইঞ্জিন, পারফরম্যান্স আর ব্র্যান্ড। এখন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও তথ্য অনেক বড় ভূমিকা নিচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা এই পরিবর্তনটিকে স্পষ্ট করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। তারা শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করেনি, বরং গাড়ির ভবিষ্যতের ধারণাটাকেই বদলে দিয়েছে। আজ আমেরিকার অনেক জায়গায়, বিশেষ করে টেক্সাসের অস্টিন, ডালাস ও হিউস্টনে টেসলার চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি সত্যিই রাস্তায় নেমেছে। একইভাবে ওয়েমো-এর চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি বিভিন্ন শহরে চলছে। নাইট রাইডার-এর সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
মানুষ এখনো গাড়ি কেনার সময় পুরনো প্রশ্নগুলো করে। কত কিলোমিটার চলে, পুনর্বিক্রয় মূল্য কেমন, জ্বালানি খরচ কত। কিন্তু নতুন করে একটি প্রশ্ন উঠে আসছে: গাড়িটা কতটা স্মার্ট? এটা কি নিজে নিজে পার্ক করতে পারে, যানজটে নিজে চলতে পারে? আমরা ধীরে ধীরে চালকের আসন থেকে সরে আসছি, যদিও এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি না।
এই পরিবর্তন শুধু একটি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়েমো ইতিমধ্যেই চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে বাস্তবে কাজ করছে। উবার এর মতো প্রতিষ্ঠান ভাবছে, ভবিষ্যতে গাড়ি হয়তো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং একটি সেবা হয়ে উঠবে। xAI এর Grok এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ায় গাড়ির ভেতরে শুধু গান শোনা নয়, কথা বলা, তথ্য জানা, এমনকি সঙ্গ পাওয়াও সম্ভব হচ্ছে। গাড়ি ধীরে ধীরে যন্ত্র থেকে সহযাত্রীতে রূপ নিচ্ছে।

এই পরিবর্তন আমরা আগেও দেখেছি, হয়তো অনেকেই খেয়াল করিনি। একসময় গান শোনার জন্য ওয়াকম্যান, ক্যাসেট, সিডি লাগত। সিনেমা দেখতে ভিডিও বা ডিভিডি প্লেয়ার প্রয়োজন হতো। আজ নেটফ্লিক্স বা স্পটিফাই-এর মতো প্ল্যাটফর্মে যখন খুশি, যেখানে খুশি সব পাওয়া যায়। মালিকানা থেকে ব্যবহার, এই পরিবর্তনটা আমাদের অজান্তেই হয়ে গেছে। গাড়ির ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটবে?
একজন সাধারণ মানুষ দিনে খুব অল্প সময় গাড়ি ব্যবহার করে, বাকি সময়টা সেটি পার্কিংয়ে পড়ে থাকে। তবু পরিবারের প্রয়োজনে একাধিক গাড়ি রাখতে হয়। স্বয়ংচালিত প্রযুক্তি পুরোপুরি বাস্তব হলে হয়তো একটি গাড়িই যথেষ্ট হবে, অথবা ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজনই কমে যাবে। প্রয়োজন হলে একটি অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ডেকে নেওয়া যাবে। গাড়ি এসে নামিয়ে দিয়ে অন্য যাত্রীর কাছে চলে যাবে। চালকবিহীন হলে খরচও কমবে। তখন হয়তো আমরা গাড়িও সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিতে ব্যবহার করব।
এই পরিবর্তন শহরকেও বদলে দেবে। বিশাল পার্কিং এলাকা হয়তো পার্ক, খেলার মাঠ বা নতুন বাসস্থানে রূপ নেবে। বাড়ির গ্যারেজ হয়তো একদিন শোবার ঘর বা বাচ্চাদের খেলার জায়গা হয়ে উঠবে। শহর আরও খোলা ও বাসযোগ্য হবে।
একসময় মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট বিলাসিতা ছিল, পরে প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। স্বয়ংচালিত গাড়িও তেমনি একদিন সাধারণ বাস্তবতা হয়ে যাবে। তখন প্রশ্নটা হবে খুব সহজ কিন্তু গভীর: যদি আমাদের আর গাড়ি চালাতে না হয়, সেই সময়টা আমরা কীভাবে কাটাব? জানালার বাইরে তাকিয়ে, পরিবারের সঙ্গে কথা বলে, কাজ করে, নাকি শুধু নিজের মতো করে?

অস্ট্রেলিয়াতেও এই প্রযুক্তির দিকে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। টেসলার ফুল সেল্ফ-ড্রাইভিং প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই অনেক গাড়িতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ওয়েমোসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ও রোবোট্যাক্সি চালুর পরিকল্পনা করছে। এখানকার রাস্তায়ও খুব শিগগিরই এই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র দেখা যেতে পারে।
আর হয়তো অনেক বাবা মা তখন একটু স্বস্তি পাবে। তাদের সন্তান দ্রুত গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হবে এই ভয়টা আর থাকবে না, কারণ গাড়ি নিজেই নিরাপদে চলবে। বিশেষ করে যারা কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েকে নতুন গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তন অনেক বড় স্বস্তির বিষয় হবে।
শেষ পর্যন্ত, এই পরিবর্তন আমাদের জীবনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও অর্থবহ করে তুলবে। আর তখন হয়তো আমরা একটু হাসবো, আর মনে মনে বলবো, একসময় আমরা নিজেরাই গাড়ি চালাতাম।
The author is the Financial Controller at Eagers Automotive Pty Ltd.