রিজভী শুভ: বেলা বোসকে দেওয়া সেই ২৪৪১১৩৯ নম্বরটা এখন আর কেউ ডায়াল করে না। ল্যান্ডফোনের জমানা শেষ হয়েছে কবেই, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরটা রয়ে গেছে ঠিক আগের মতোই। এবার সেই চেনা সুর, সেই চিরচেনা হ্যাট আর গিটার নিয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে আসছেন বাঙালির নাগরিক কবি অঞ্জন দত্ত।আজকের প্রজন্মের কাছে ‘২৪৪১১৩৯’ হয়তো স্রেফ কতগুলো সংখ্যা, কিন্তু আমাদের কাছে এটি ছিল এক দুরুদুরু বুকের প্রতীক্ষা। যখন বেলা বোসের জন্য লাইন পাওয়ার আকুতি বাজত, তখন ওপারে আমরাও কেউ হয়তো একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতাম পিসিও বুথে। আমাদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে অঞ্জন ছিলেন এক অবাধ্য ইশতেহার। আমরা যখন প্রেমে পড়েছি, তখন পাশে ছিল ‘রঞ্জনা’; যখন একা হয়েছি, তখন সঙ্গী ছিল ‘মিস্টার হল্যান্ড’। অঞ্জন শিখিয়েছিলেন, সব প্রেম সফল হতে নেই, কিছু ব্যর্থতাতেও এক অদ্ভুত মাদকতা থাকে। কিছু গান কেবল সুর নয়, সময়কে থামিয়ে দেওয়ার মন্ত্র জানে। কিছু কণ্ঠস্বর কেবল গান গায় না, আমাদের বুকের ভেতর জমে থাকা ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে কয়েক দশকের পুরনো এক কিশোরকে টেনে বের করে আনে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শান্ত শহর অ্যাডিলেডের আকাশে-বাতাসে এখন তেমনই এক আবেগের গুঞ্জন। আসছেন অঞ্জন দত্ত। আমাদের কৈশোরের সেই নীল গিটারের জাদুকর, যার গান শুনে আমাদের বড় হওয়া, প্রেম করা আর জীবনকে চিনতে শেখা।
আজকের প্রজন্মের কাছে ‘২৪৪১১৩৯’ হয়তো স্রেফ কতগুলো সংখ্যা, কিন্তু আমাদের কাছে এটি ছিল এক দুরুদুরু বুকের প্রতীক্ষা। যখন বেলা বোসের জন্য লাইন পাওয়ার আকুতি বাজত, তখন ওপারে আমরাও কেউ হয়তো একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতাম পিসিও বুথে। আমাদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে অঞ্জন ছিলেন এক অবাধ্য ইশতেহার।
অ্যাডিলেডের প্রবাসী বাঙালিদের কাছে এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি যেন এক টুকরো ‘টাইম মেশিন’। এক বিকেলে কটেজ স্ট্রিট বা মাগিল রোডের নির্জনতা চিরে যখন অঞ্জনের সেই খসখসে কণ্ঠটা বাজবে, তখন হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো এক কলকাতার গলি বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাটানো বিকেলগুলো জীবন্ত হয়ে ধরা দেবে।
বেড়ে ওঠার সমান্তরাল পথ: আমাদের কৈশোর ছিল টিউশন পালানো আর স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে থাকার। তখন হেডফোনে বাজত ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’। মধ্যবিত্ত জীবনের না-বলা প্রেম, বেকারত্বের যন্ত্রণা আর এক চিমটি বিদ্রোহ—সবই যেন অঞ্জনের গানে রূপ পেত। সেই সময়ে যারা বড় হয়েছেন, তাদের কাছে ‘মিস্টার হল্যান্ড’ কিংবা ‘মেরি অ্যান’ কোনো কাল্পনিক চরিত্র ছিল না, তারা ছিল আমাদের পাশের বাড়ির চেনা মুখ।
প্রবাসে সেই নস্টালজিয়া: অ্যাডিলেডের কর্মব্যস্ত জীবনে এখন অনেকেরই হাতে গিটার তুলে নেওয়ার সময় মেলে না। অফিস আর ঘরকন্নার ভিড়ে শৈশবের সেই ‘পুরোনো গিটার’ হয়তো ধুলো জমিয়ে পড়ে আছে ঘরের কোণে। কিন্তু অঞ্জন দত্তের আসার খবরটি সেই ধুলো ঝেড়ে আবারও পুরনো স্মৃতিগুলোকে সজীব করে তুলেছে। অ্যাডিলেডের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হয়তো আজ আর ডারউইন বা সল্টলেকের গলি খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু অঞ্জন যখন গাইবেন ‘চ্যাপলিন’, তখন হাজার মাইল দূরের এই শহরেও বাঙালি খুঁজে পাবে তার শেকড়। প্রবাস জীবনে একাকীত্বের যে সুর মাঝে মাঝে আমাদের গ্রাস করে, সেই একই সুর তো মিশে আছে তার ‘খাদের ধারের রেলগাড়ি’ গানটিতে।
অ্যাডিলেডের এই পরিপাটি জীবনে আমাদের এখন সব আছে—গাড়ি, বাড়ি, সুন্দর সাজানো বাগান। কিন্তু কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই ভাঙা গিটারের সুর আর টিউশনির টাকায় কেনা সস্তা ক্যাসেট প্লেয়ারটা। আজ যখন অ্যাডিলেডের হলরুমে অঞ্জন গাইবেন ‘পুরোনো গিটার’, তখন সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গ্যালারিতে বসা প্রতিটি মানুষের চোখের কোণে হয়তো একটু জল চিকচিক করে উঠবে। সেই জলটা আসলে ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য—যেখানে ডারউইন ছিল, মালালা ছিল, আর ছিল একরাশ স্বপ্ন।
অঞ্জন দত্ত আমাদের শিখিয়েছিলেন, জীবন মানে কেবল সাফল্যের ইঁদুর দৌড় নয়; জীবন মানে ‘খাদের ধারের রেলগাড়ি’র মতো ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকা। অ্যাডিলেডের ব্যস্ত প্রবাসীরা সেই সন্ধ্যায় নিজেদের পেশাদার পরিচয় ভুলে গিয়ে আবারও সেই ‘বেকার’ কিশোরটি হয়ে উঠবেন, যে গিটার হাতে জানালার পাশে বসে আকাশ দেখত।
এক অসমাপ্ত গল্পের টানে: অঞ্জন দত্তের গান মানেই এক একটা ছোটগল্প। সেখানে হার আছে, ব্যর্থতা আছে, কিন্তু দিনশেষে বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত জেদ আছে। অ্যাডিলেডের হলরুমে যখন গিটারের তারে প্রথম টান পড়বে, তখন উপস্থিত দর্শকদের ভিড়ে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না সেই স্কুল ড্রেস পরা কিশোরটিকে, কিন্তু প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে সেই ফেলে আসা দিনগুলোর আবেগ।
অঞ্জনের গান মানেই তো মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট পাওয়া আর না-পাওয়ার গল্প। আমরা যারা আজ দূর প্রবাসে শেকড় গেড়েছি, আমাদের মনের গহীনেও একটা ‘চ্যাপলিন’ লুকিয়ে আছে, যে হাসির আড়ালে বুকের গভীর ক্ষতগুলো ঢেকে রাখে। যখন তিনি গাইবেন ‘মা’, তখন হয়তো অনেক প্রবাসীই স্মৃতির আয়নায় ফিরে যাবেন দেশের সেই চেনা বারান্দায়, যেখানে মা আজও পথ চেয়ে বসে থাকেন।
অ্যাডিলেডের এই সন্ধ্যাপার হবে স্মৃতির শহর কলকাতায় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সোনালী দিনগুলোর গল্পে। অঞ্জন দত্ত আসছেন, আর তার সঙ্গে আসছে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া হারমোনিয়ামের দিন, প্রথম প্রেম আর বড় হওয়ার সবটুকু নস্টালজিয়া।
অ্যাডিলেডের প্রবাসী বাঙালিদের জন্য অঞ্জন দত্তের আসা মানে কেবল এক সন্ধ্যায় গান শোনা নয়, বরং এক টুকরো শৈশব আর কৈশোরকে ফিরে পাওয়া। অ্যাডিলেডের আকাশ কি সেদিন একটু বেশিই নীল হবে? উত্তরটা মিলবে অঞ্জনের গিটারে।
অ্যাডিলেডের প্রবাসী বাঙালিদের জন্য অঞ্জন দত্তের আসা মানে কেবল এক সন্ধ্যায় গান শোনা নয়, বরং এক টুকরো শৈশব আর কৈশোরকে ফিরে পাওয়া। অ্যাডিলেডের আকাশ কি সেদিন একটু বেশিই নীল হবে? উত্তরটা মিলবে অঞ্জনের গিটারে।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে অ্যাডিলেডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াযার সোনোমাটোগ্রাম। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি আয়োজন করেছে একাধিক উল্লেখযোগ্য কনসার্ট ও সিনেমার প্রর্দশনী, যা প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি নতুন করে আগ্রহ ও আবেগ সৃষ্টি করেছে। এরই ধারাবাহিতকায় আসছেন “অঞ্জন দত্ত।
অ্যাডিলেডের এই কনসার্ট কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, এটি একটি দীর্ঘশ্বাস আর একবুক স্বস্তির মিলনমেলা। অঞ্জন দত্ত আসছেন, আর তার হাত ধরে আসছে আমাদের সেই হারানো বিকেলগুলো, প্রথম ব্রেক-আপের বিষণ্ণতা আর আকাশছোঁয়া রঙিন সব কল্পনা।
গিটারের তারে যখন শেষ টানটা পড়বে, তখন হয়তো মনে হবে—সময়টা যদি এভাবেই থেমে যেত! জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা অনেক বড় হয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু অঞ্জনের গানে আমরা আজও সেই একই কিশোর রয়ে গেছি, যে বিশ্বাস করে—একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
অ্যাডিলেডের আকাশে কি সেদিন একটু বেশিই মেঘ জমবে? নাকি এক চিলতে রোদ এসে বলবে—’ভালো থেকো রঞ্জনা’? উত্তরটা তোলা থাক সেই মায়াবী সন্ধ্যার জন্য।