সময়ের ঘড়িটা যেন সেদিন একটু ধীর গতিতেই চলছিল। ১৯ এপ্রিলের সেই প্রতীক্ষিত সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা জমতে থাকে প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে। অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক শহর অ্যাডিলেডের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত Lion Arts Factory তখন যেন এক টুকরো বাংলাদেশে রূপ নিয়েছে। সন্ধ্যা নামার আগেই হলরুম ভরে ওঠে নানা বয়সী দর্শকে—যাদের চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল প্রত্যাশা, উচ্ছ্বাস আর নস্টালজিয়ার মিশেল।
মঞ্চসজ্জায় ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া—রঙিন আলো, ধোঁয়ার আবহ, আর নিখুঁত সাউন্ড সিস্টেম পুরো পরিবেশকে করে তোলে আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু সেই আধুনিকতার মাঝেও ছিল এক গভীর দেশীয় আবেগ—যেন হাজার মাইল দূরে থেকেও সবাই ফিরে গেছে নিজের শিকড়ে।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অঙ্গীকার নিয়ে হাজির হয়েছিল অ্যাডিলেডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘কোয়াযার সোনোমাটোগ্রাম’। তাদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘অ্যাভয়েড রাফা ও বেঙ্গল বিটস অব অ্যাডিলেড’ কনসার্ট। মাত্র এক বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি প্রবাসের মাটিতে একের পর এক উল্লেখযোগ্য কনসার্ট আয়োজন করে বাংলা সঙ্গীতের প্রতি নতুন করে আবেগ ও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
‘Avoid Rafa & Bengal Beats of Adelaide’ কনসার্টটি ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী আয়োজনগুলোর একটি। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, শিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয়, স্পনসরশিপ, টেকনিক্যাল প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়ায়।



অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘অ্যাভয়েড রাফা’ মঞ্চে আসার আগেই স্থানীয় ব্যান্ডগুলোর সুরের মূর্ছনায় মেতে ওঠে দর্শক। স্থানীয় ব্যান্ড ‘রং’, ‘তাল’ ও ‘অগ্নিবীণা’ একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে দর্শকদের ভাসিয়ে দেয় স্মৃতির সাগরে। গিটারের ঝঙ্কার আর ড্রামসের তালে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হলরুম। ‘রং’ পরিবেশন করে জনপ্রিয় বাংলা অল্টারনেটিভ গান, যেখানে ছিল নস্টালজিয়া আর আধুনিকতার মিশ্রণ। ‘তাল’ তাদের পারফরম্যান্সে তুলে ধরে ফিউশন, যা দর্শকদের মধ্যে আলাদা উত্তেজনা সৃষ্টি করে ‘অগ্নিবীণা’ মঞ্চে আনে শক্তিশালী রক ভাইব—গিটারের তীক্ষ্ণ রিফ আর ড্রামের তালে যেন পুরো হল কেঁপে ওঠে। দর্শকদের অনেকেই গলা মিলিয়ে গান গেয়েছেন, কেউবা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে তৈরি করেছেন এক অন্যরকম আবহ। প্রতিটি গানের শেষে করতালির ঝড় যেন শিল্পীদের আরও অনুপ্রাণিত করেছে।

অবশেষে যখন মঞ্চে আসে Avoid Rafa, তখন যেন পুরো পরিবেশ এক নতুন মাত্রা পায়। তাদের জনপ্রিয় গানগুলোর প্রথম সুর বাজতেই দর্শকদের মধ্যে শুরু হয় উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। রাফার কণ্ঠে ছিল সেই চেনা আবেগ, যা প্রবাসে বসেও শ্রোতাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়। একের পর এক হিট গান—ভালবাসা, বিদ্রোহ, স্মৃতি আর জীবনের গল্প—সবকিছু মিলিয়ে পারফরম্যান্সটি হয়ে ওঠে এক আবেগঘন যাত্রা। মাঝেমধ্যে শিল্পী দর্শকদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অনুভূতি জানতে চান—যা পুরো অনুষ্ঠানটিকে আরও আন্তরিক ও ব্যক্তিগত করে তোলে।

অ্যাডিলেডের প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এই আয়োজনটি ছিল যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে সবাই মেতে উঠেছিলেন দেশি সুরের উন্মাদনায়। দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর করতালিতে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বাংলা গানের জয়গান।
কনসার্ট শেষে এক দর্শক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “মিউজিক্যাল নাইটটি ছিল অবিশ্বাস্য! সব কটি ব্যান্ডের পারফরম্যান্স সরাসরি দেখাটা ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই ক্রেজ আর অসাধারণ পারফরম্যান্সগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে।” “এটা শুধু একটা কনসার্ট ছিল না, এটা ছিল একটা অনুভূতি। মনে হচ্ছিল আমি আবার ঢাকায় ফিরে গেছি—বন্ধুদের সঙ্গে, প্রিয় গানগুলোর মাঝে।”

আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘কোয়াযার সোনোমাটোগ্রাম’-এর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন উপস্থিত সকলেই। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
বিদেশে বিভুঁইয়ে যখন নিজেদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চলে, তখন এমন আয়োজন প্রবাসীদের মনে জোগায় অন্যরকম শক্তি। অ্যাডিলেডের এই কনসার্ট কেবল একটি গানের অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল প্রবাসী বাঙালিদের মেলবন্ধনের এক মিলনমেলা। ‘কোয়ায়ার সোনোমাটোগ্রাম’-এর হাত ধরে আগামীতে আরও বড় পরিসরে বাংলা গান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে—এমনটাই প্রত্যাশা দর্শকদের।
‘কোয়াযার সোনোমাটোগ্রাম’ ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করার। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের অংশগ্রহণ, আরও বড় ভেন্যু, এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক ইভেন্ট—সব মিলিয়ে তারা অ্যাডিলেডে বাংলা সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে চায়।
রাত বাড়ে, কনসার্ট শেষ হয়, কিন্তু ‘লায়ন আর্টস ফ্যাক্টরি’র দেওয়ালে দেওয়ালে যেন লেগে থাকে সেই সুরের প্রতিধ্বনি। অ্যাডিলেডের আকাশে তখনো যেন বাজছিল রাফার সেই পরিচিত কন্ঠস্বর।