অ্যাডিলেডে ‘বাসা’র ৪২ বছর ও নববর্ষ উদ্‌যাপন: প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড শহরের নীরব, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ হঠাৎই যেন রঙিন হয়ে ওঠে বাংলা গান, হাসি আর আড্ডায়। কারণ, বাংলা নববর্ষ। আর এ আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম পুরোনো সংগঠন ‘বাসা’—বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া। ৪২ বছরের পথচলায় সংগঠনটি শুধু একটি কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে এক টুকরো বাংলাদেশ। এবারের উদ্‌যাপন ছিল দ্বিগুণ আনন্দের—একদিকে পহেলা বৈশাখ, অন্যদিকে ‘বাসা’র ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সকাল থেকেই ভেন্যু প্রাঙ্গণে ভিড় জমাতে শুরু করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি আর ফতুয়ায় সেজে ওঠা নারী-পুরুষ, শিশুদের কোলাহল—সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশ।
গত ১৮ এপ্রিল শনিবার, অ্যাডিলেডের হিন্দমার্শ এলাকার ওসমান্ড স্ট্রিটের বলরুম ফাংশন সেন্টারে আয়োজিত এই মিলনমেলা সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে। অনুষ্ঠানে কয়েক প্রজন্মের প্রবাসী বাঙালিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো হলরুম। প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়েও নিজেদের শেকড়কে আঁকড়ে ধরার এই চেষ্টাই যেন ‘বাসা’র সবচেয়ে বড় সাফল্য।

স্মৃতিচারণা ও বৈশাখের সুর: অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ‘বাসা’র দীর্ঘ চার দশকের পথচলা নিয়ে স্মৃতিচারণা। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের সেই কালজয়ী গান ‘এসো হে বৈশাখ’-এর মাধ্যমে। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় লোকসংগীত, আধুনিক বাংলা গান এবং ধ্রুপদী নৃত্য।
প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। তাদের সাবলীল বাংলা কবিতা আবৃত্তি এবং দেশাত্মবোধক গান দর্শকদের বিমোহিত করে। উপস্থিত অভিভাবকরা জানান, বিদেশের মাটিতে সন্তানদের কণ্ঠে বাংলা ভাষা শুনতে পাওয়াটাই ছিল তাদের জন্য পরম প্রাপ্তি।
মঞ্চজুড়ে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, আধুনিক গান, নৃত্য—সব মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের উচ্চারণে খানিক ভিন্নতা থাকলেও আবেগে কোনো ঘাটতি ছিল না। বরং তাদের পরিবেশনায় ফুটে উঠেছে নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের খোঁজ।

সংহতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন: অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা। তাদের মধ্যে ছিলেন নাদিয়া ক্ল্যান্সি এমপি (Nadia Clancy MP), জেন স্টিনসন এমপি (Jayne Stinson MP), মেয়র অ্যাঞ্জেলা ইভান্স (Mayor Angela Evans) এবং মিস্টার ব্রেট শাটলওয়ার্থ (Mr Brett Shuttleworth)। অতিথিরা তাদের বক্তব্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই ঐক্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানান।
সংগঠনের বর্তমান সভাপতি মো: আরশাদ ভূইয়া বলেন: “আমরা চাই আমাদের সন্তানেরা যেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভুলে না যায়। আজ থেকে ৪২ বছর আগে যে মশালটি জ্বালানো হয়েছিল, আমরা তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে চাই। বাসা কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি অ্যাডিলেডে আমাদের একটি পরিবার।”

লোকজ সাজ ও গানের ঝংকার: হলরুমের বাইরে দর্শনার্থীদের জন্য ছিল বৈচিত্র্যময় স্টল। দেশীয় পোশাক, নকশা করা হস্তশিল্প এবং জিভে জল আনা দেশি খাবারের গন্ধে ম ম করছিল পুরো প্রাঙ্গণ। খাবারের স্টলগুলোও ছিল সমান আকর্ষণের কেন্দ্র। ফুচকা, চটপটি—সবই যেন মুহূর্তে নিয়ে যায় দেশের স্বাদে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বসে উপভোগ করেছেন এই আয়োজন, কেউবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠেছেন। এবারের আয়োজনের অন্যতম স্পন্সর ছিল ‘বেঙ্গল লুমস’, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক পর্বের শেষভাগে জনপ্রিয় ব্যান্ড “ভয়েস অব সেমিকলন”-এর প্রাণবন্ত পরিবেশনা অনুষ্ঠানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাদের পরিবেশিত গানের ছন্দে হলভর্তি দর্শক মেতে ওঠেন উচ্ছ্বাসে।

ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম : আয়োজকদের মতে, এই আয়োজনটি শুধুমাত্র নিছক বিনোদন নয়। এটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ঐক্য জোরদার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। ৪২ বছর আগে যে স্বপ্নের হাত ধরে ‘বাসা’র যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের এই বৈশাখী সন্ধ্যা যেন সেই স্বপ্নকেই নতুনভাবে ঝালিয়ে নিল।
বাসা’র প্রবীণ সদস্যরা স্মৃতিচারণ করেন সংগঠনের শুরুর দিনের কথা। অল্প কয়েকজন মানুষ নিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ শত শত প্রবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। তাদের মতে, এই সংগঠন শুধু উৎসব উদ্‌যাপনই নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তারা বলে, “আমরা এখানে বড় হয়েছি, কিন্তু এই ধরনের আয়োজন আমাদের জানায় আমরা কোথা থেকে এসেছি।”
দিনশেষে যখন অনুষ্ঠান শেষের পথে, তখনো যেন কারও মন ভরেনি। আলো-ঝলমলে সেই প্রাঙ্গণ ছেড়ে যেতে যেতে অনেকেই বলছিলেন—প্রবাসে থেকেও এমন দিনগুলোই মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ কখনো দূরে নয়।
৪২ বছর পেরিয়ে ‘বাসা’ আজ শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং প্রবাসে বাংলাদেশি পরিচয়ের এক শক্ত ভিত্তি। আর এই নববর্ষ উদ্‌যাপন—তা যেন প্রমাণ করে, দূরত্ব যতই হোক, সংস্কৃতির বন্ধন অটুট।