আয়োজন আছে, নেই শুধু আত্মা

রিজভী শুভ: তখন আমি ছোট্টটি। পহেলা বৈশাখ মানেই অন্য এক জগৎ। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়া। গন্তব্য? পাবনা প্রেসক্লাব। বাবা ছিলেন সাংবাদিক, তাই উৎসবের দিনে প্রেসক্লাবই ছিল আমাদের (তাদের) প্রধান আড্ডাখানা। বাবার সহকর্মীরা একে একে জড়ো হতেন, হাহা-হিহি করে মেতে উঠতেন। আর আমরা শিশুরা তাদের আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করতাম, আর অপেক্ষা কখন শেষ হবে এই আড্ডা । আড্ডা শেষ হতেই আমাদের যাত্রা হতো পাবনার লক্ষী মিষ্টান্ন ভান্ডার / প্যারাডাইস মিষ্টান্ন ভান্ডারের দিকে। সেখানে যাওয়ার সাথে সাথেই পেট পূজা শুরু! লুচি, সুস্বাদু লাবড়া বা সবজি আর এক বিশাল রাজভোগ। মিষ্টিটার কথা আজও মনে আছে, এতটাই বড় ছিল যে দু হাতে ধরে খেতে হতো। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের উৎসবের জায়গাটাও পাল্টে গিয়েছিল। পাবনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক নির্ভর পত্রিকার বৈশাখী আয়োজনে যোগ দেওয়াটি ছিলো একটা পারিবারিক রেওয়াজ। পরিবারের সবাই মিলে অন্যান্যদের সাথে মিলে অনুষ্ঠান উপভোগ করতেই হতো। সেখানে অনুষ্ঠান শেষ হতেই খাবার পালা। লুচি, সবজি, মিষ্টি, চিড়া আর দই। এই খাবারের লোভে আমরা সবাই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম।

অংকে আমার কোনো কালেই সুনাম ছিল না। বরং সবাই বলতেন, আমি নাকি অংকে কাঁচা। আর এই ‘কাঁচা’ ছেলেটাকে ‘পাকা’ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মনোরঞ্জন স্যার। স্যারকে সবাই খুব ভয় পেতেন, কারণ তিনি খুব কঠোর ছিলেন। কিন্তু পহেলা বৈশাখে স্যারের এক অন্য রূপ দেখা যেত। সেদিন আর অংক পরীক্ষা হতো না, হতো ‘পেট পরীক্ষা’! এই পরীক্ষায় পাস করার একমাত্র শর্ত ছিল পেট পুরে লুচি, সবজি আর মিষ্টি খাওয়া। স্কুল-কলেজ শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বারান্দায় পা রাখলাম, পহেলা বৈশাখ নিয়ে তখন অন্যরকম এক উদাসীনতা ছিল। বৈশাখ মানেই তো ক্যালেন্ডারের লাল তারিখ আর বাস বা ট্রেন ধরে সোজা পাবনা—নিজের বাড়ি। মা’র হাতের রান্নার ঘ্রাণ আর চেনা বিছানা না হলে যেন উৎসব জমে না।

কিন্তু জীবনের জটিলতা বাড়তে সময় লাগে না। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে সবেমাত্র ঢাকা শহরে  চাকরিতে ঢুকেছি। নতুন অফিস, নতুন কাজের চাপ; সেবার আর পাবনা যাওয়া হয়ে উঠল না। মনটা বড্ড খারাপ। ইট-কাঠের এই শহরে বৈশাখ পালন করব কী করে? ঠিক সেই সময়েই ত্রাণকর্তার মতো উদয় হলেন আমাদের রাশীদ মাহমুদ স্যার। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পড়াতেন, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে চলে আসেন। শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্ক যে কেবল ক্লাসরুমের চার দেয়ালে আটকে থাকে না, রাশীদ স্যার ছিলেন তার জীবন্ত উদাহরণ। তিনি ঢাকা চলে এলেও আমাদের মনে হতো তিনি বুঝি আমাদের পাশেই আছেন। সেই এক আশ্চর্য মানুষ, যাঁর হৃদয়ের আয়তন বিশাল। হঠাৎ একদিন স্যারের ফোন। ওপাশ থেকে সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর— “কি অবস্থা? কাল সকালে সোজা চলে আসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। বুঝছো?।” স্যারের কথার ওপর কথা বলার সাধ্য কার? স্যার ডাকলে না গিয়ে উপায় নেই। তারপর সেই অভাবনীয় সকাল। নৃবিজ্ঞান বিভাগের সেই জম্পেশ আড্ডায় প্রথমবার আমার সামনে হাজির হলো পান্তা-ইলিশ। মাটির সানকিতে ভেজানো ভাত, সাথে মচমচে ভাজা রুপালি ইলিশ আর কাঁচা মরিচ। সেই প্রথম বুঝতে পারলাম, পহেলা বৈশাখের আসল স্বাদ বাড়ির বাইরেও পাওয়া যায়, যদি সাথে থাকে এমন এক বটবৃক্ষের মতো শিক্ষক। ঢাকা শহরের সেই প্রথম বৈশাখ আর রাশীদ মাহমুদ স্যারের সেই স্নেহমাখানো শাসনের কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতরটা কেমন যেন টনটন করে ওঠে। জীবন আসলে এমনই—কিছু স্মৃতি পান্তা ভাতের মতো শীতল, আবার ইলিশ ভাজার মতো নোনতা স্বাদে ভরপুর। তিনি আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর সেই হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা আজো তাড়া করে ফেরে। এতো কিছুর মাঝেও কিসের যেন এক বড্ড অভাব। আমাদের জন্য তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না – ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক, বন্ধু, অনুপ্রেরণা ও অভিভাবক।

কিসের যেন একটা বড্ড অভাব। আসলে সব থেকেও কিছু একটা নেই। আর এই ‘নেই’ এর ঘাটতিটা কোনো জাগতিক বস্তু দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। বিদেশের মাটিতে বৈশাখ। কেমন যেন সব অচেনা। রোদের ঝাঁঝাল ভাব নেই। আকাশটা বড় ফিকে, যেন কেউ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলেছে। মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা সেই বৈশাখের আমেজটা কেমন যেন অনুপস্থিত।

বিদেশের মাটিতে খুব ঘটা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। চারদিকে সাজ সাজ রব, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, এমনকি মানুষের পরনে লাল-পেড়ে সাদা শাড়ি। আয়োজনের কোনো কমতি নেই, ত্রুটি নেই। অথচ আমার কেবলই মনে হচ্ছে, কিসের যেন একটা বড্ড অভাব। আসলে সব থেকেও কিছু একটা নেই। আর এই ‘নেই’ এর ঘাটতিটা কোনো জাগতিক বস্তু দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। বিদেশের মাটিতে বৈশাখ। কেমন যেন সব অচেনা। রোদের ঝাঁঝাল ভাব নেই। আকাশটা বড় ফিকে, যেন কেউ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলেছে। মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা সেই বৈশাখের আমেজটা কেমন যেন অনুপস্থিত।

বিদেশের মাটিতে বৈশাখ কেমন যেন অপূর্ণ। যেন কিসের অভাব। সেই অভাবটা হলো, আপন দেশের গন্ধ। মাটির গন্ধ। ধুলোর গন্ধ। আর হলো, আপন মানুষের স্নেহ। একদিন হয়তো বিদেশের মাটিতেও সেই মায়াময় জগৎ খুঁজে পাওয়া যাবে। হয়তো তখন সবাই জানবে, বৈশাখ মানে শুধু উৎসব নয়, বৈশাখ মানে এক নতুন শুরু।

বাংলার আকাশের নিচে যে পহেলা বৈশাখ হয়, তার স্বাদটা সম্পূর্ণ আলাদা। ঠিক যেন আমাদের দেশের সেই উর্বর পলি মাটির মতো—যেখানে কোনো আয়োজন ছাড়াই ফসল ফলে। বাংলার প্রকৃতি বোধহয় বৈশাখ এলে নিজেকে এমন এক মায়াবী ঢঙে সাজায়, যা একই আকাশের নিচে অন্য কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। সেখানে খুব রোদ ওঠে, হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি নামে, ধুলো ওড়ে—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত হাহাকার মেশানো আনন্দ। আর এখানে? এখানে সব আছে, শুধু সেই আত্মাটা নেই। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমরা কি আসলে আনন্দ করছি, নাকি আনন্দ করার অভিনয় করছি? মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ বড় অদ্ভুত জীব। সে যেখানেই থাকুক না কেন, শেষমেশ তার শেকড়ের গন্ধটাই তাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করে।

প্রবাসের বৈশাখ আর দেশের বৈশাখের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য সবসময়ই থেকে যায়। এই তফাতটা কেবল আয়োজনের নয়, বরং অনুভূতির। দেশের বৈশাখ মানেই ভোরের সেই স্নিগ্ধতা, চারদিকে ঢাকের শব্দ, আর বাতাসে মিশে থাকা নতুন মাটির গন্ধ। রমনার বটমূল বা চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণচাঞ্চল্য, তা বিদেশের যান্ত্রিক জীবনে খুঁজে পাওয়া কঠিন। দেশে বৈশাখ মানে পুরো জাতির একাত্ম হওয়া, যেখানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পানতা-ইলিশের উৎসব আর লাল-সাদা শাড়ির ভিড়ে আলাদা করে উৎসব খুঁজতে হয় না।

অন্যদিকে, প্রবাসে বৈশাখ মানেই ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকা—কবে সপ্তাহান্ত (weekend) আসবে, আর কবে স্থানীয় কোনো হল রুমে সবাই মিলে একটু একত্রিত হওয়া যাবে। প্রবাসে আমরা উৎসবটাকে আয়োজন করে বাঁচিয়ে রাখি, আর দেশে উৎসবটা আমাদের চারপাশে এমনিতেই বেঁচে থাকে। বিদেশে হয়তো পহেলা বৈশাখে অফিস বা কাজের চাপে সেই চিরচেনা আমেজ পাওয়া যায় না। তবুও বিদেশের বৈশাখের একটা অন্যরকম সৌন্দর্য আছে—তা হলো শেকড়কে আঁকড়ে ধরার তীব্র আকুতি। হাজার মাইল দূরে থেকেও যখন প্রবাসী বাঙালিরা শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে পান্তা-ইলিশের টেবিলে বসে, তখন সেখানে ফুটে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ। হয়তো সেই ধুলোমাখা পথ, কাঠফাটা দুপুরের তপ্ত বাতাস, কিংবা কালবৈশাখীর সেই পরিচিত ভয় আর ভালোলাগার মিশেলটাই অনুপস্থিত। আসলে বিদেশের বৈশাখ অনেক বেশি গোছানো, কিন্তু দেশের বৈশাখের সেই অগোছালো প্রাণের স্পন্দনটাই হয়তোবা আমাদের সবচেয়ে বেশি তাড়িত করে।