রাজীব চৌধুরী: পদ্মার বুকে যখন বর্ষার প্রথম ঢল নামে, জেলের জালে ঝিকঝিক করে ওঠে রুপালি মাছের ছিপছিপে শরীর। মাছটার নাম ইলিশ। বাঙালির পাতে এই মাছ উঠছে আজ থেকে না, **কম করে হলেও ২৩০০ বছর ধরে**। এর মানে হল যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ও ৩০০ বছর আগেকার সাহিত্যে ইলিশের দেখা পাওয়া যাচ্ছে এই বাংলায়। প্রায় ২৩০০ বছর আগে কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র বইয়ে “হিলিস” নামে এক মাছের কথা লিখেছেন, যা রাজার করের আওতায় ছিল। গবেষকদের ধারণা, এই হিলিসই আজকের ইলিশ। মানে মৌর্য যুগ থেকেই ইলিশ বাংলার অর্থনীতির অংশ। বুঝুন অবস্থা! আমেরিকানরা যখন আধা ন্যাংটো থাকত আর ঘোড়ায় চেপে বেবুনদের সাথে সমতল চষে বেড়াত অস্ট্রেলয়েড রা,তখন বাঙাল ইলিশ ভাজা খাচ্ছে পাতের পাশে! ভাবা যায়?
বাংলার মাটি মানেই নদী, আর নদী মানেই মাছ। পাল যুগের ৮০০-৯০০ সালের দিকে লেখা চর্যাপদে নৌকা, জাল আর মাছের কথা বারবার আসে। তবে ইলিশের নাম ধরে প্রথম দেখা মেলে **১২শ শতকে, কবি মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে**। সেখানে কালকেতু ব্যাধ যখন ফুল্লরার জন্য বাজারে যায়, তখন লেখা হচ্ছে- “আনিল ইলিশ মৎস্য, গঙ্গার উজানে বাস, স্বাদে গন্ধে অতুল” মানে আজ থেকে ৯০০ বছর আগেই ইলিশ ছিল স্বাদের অপর নাম। “স্বাদে গন্ধে অতুল”। রাজা-বাদশা থেকে গরীব জেলে, সবার হেঁশেলে ঢুকে গিয়েছিল এই মাছ। সেন আমলের শিলালিপিতেও মন্দিরে ভোগ হিসেবে ইলিশ দেওয়ার কথা আছে। তাহলে হিসাব কী দাঁড়াল? লিখিত প্রমাণে ২৩০০ বছর, আর নদী-সভ্যতার যুক্তিতে ১৫০০ বছরেরও বেশি এই ইলিশের ইতিহাস বাংলায় জ্বলজ্বল করছে। কারণ মানুষ যেদিন থেকে পদ্মা পাড়ে বসতি গড়েছে, সেদিন থেকেই ইলিশ তার পাতে শোভা পায়।
লিখিত প্রমাণে ২৩০০ বছর, আর নদী-সভ্যতার যুক্তিতে ১৫০০ বছরেরও বেশি এই ইলিশের ইতিহাস বাংলায় জ্বলজ্বল করছে। কারণ মানুষ যেদিন থেকে পদ্মা পাড়ে বসতি গড়েছে, সেদিন থেকেই ইলিশ তার পাতে শোভা পায়।
ইলিশ শুধু ইতিহাস নয়,সাহিত্যেও ঢুকে গেছে।
১. মঙ্গলকাব্য যুগ: চণ্ডীমঙ্গল, *মনসামঙ্গল*—সবখানে ইলিশ আছে। মনসামঙ্গলে বেহুলা লখিন্দরের বাসর ঘরে যে ৩২ ব্যঞ্জন রান্না হয়, তার মধ্যে সর্ষে ইলিশ সবার আগে। ইলিশ তখন সমৃদ্ধি আর আদরের প্রতীক।
২. বৈষ্ণব পদাবলী: ১৫-১৬ শতকে রাধা-কৃষ্ণের লীলায়ও ইলিশ ঢুকে পড়ে। বিদ্যাপতি লিখছেন, রাধা কৃষ্ণের জন্য “ইলিশ মাছের ঝোল” রাঁধছেন। ভগবানের ভোগেও ইলিশ। বোঝো অবস্থা টা।
৩. আধুনিক সাহিত্য: বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী*-তে অপু যখন প্রথম ইলিশ খায়, তার চোখ ছানাবড়া। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের *পদ্মা নদীর মাঝি তো পুরোটাই ইলিশ-জেলেদের জীবন। কুবের মাঝি, গণেশ, হোসেন মিয়া—তারা সবাই ইলিশের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচে। শওকত ওসমানের *ক্রীতদাসের হাসি*-তে ইলিশ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতীক। আর হুমায়ূন আহমেদ? তার বইয়ে বৃষ্টি মানেই খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা। ছড়া, গান, প্রবাদ—”মাছের রাজা ইলিশ”, “ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর”—ইলিশ আমাদের ভাষায় মিশে আছে।
অনেকেই বলে মহাভারতে ইলিশ আছে। সরাসরি “ইলিশ” নামটা নেই, কিন্তু ঘটনা আছে।
গল্পটা মহাভারতের বনপর্বে পাণ্ডবরা যখন বনবাসে, তখন একদিন এক ব্রাহ্মণের অরণি কাঠ আর মন্থন দণ্ড হরিণের শিংয়ে আটকে যায়। হরিণটা দৌড়ে পালায়। ব্রাহ্মণ কাঁদতে কাঁদতে যুধিষ্ঠিরের কাছে আসে। যজ্ঞের আগুন জ্বালানোর কাঠ না পেলে তার সব শেষ। যুধিষ্ঠির তখন ভাইদের পাঠান হরিণ খুঁজতে। নকুল, সহদেব, অর্জুন, ভীম—একে একে সবাই গিয়ে এক সরোবরের পাশে তৃষ্ণায় মরে যায়। শেষে যুধিষ্ঠির নিজে যান। সেখানে যক্ষরূপী ধর্মরাজ তাকে প্রশ্ন করেন। যুধিষ্ঠির সঠিক উত্তর দিয়ে ভাইদের ফিরে পান। আর বাঙাল তো লোককথা বানাতে ওস্তাদ। বাংলার লোককথা বলে, পাণ্ডবরা যে সরোবরে জল খেতে গিয়েছিল, সেটা ছিল পদ্মা নদীরই এক শাখা। আর যক্ষ যখন যুধিষ্ঠিরকে পরীক্ষা করছিলেন, তখন সরোবরে রুপালি মাছ খেলা করছিল। সেই মাছই ইলিশ। যক্ষ বলেন, “যে জাতি এই মাছের মর্ম বুঝবে, তারা কোনোদিন অভুক্ত থাকবে না।” এরপর থেকেই নাকি পূর্ব ভারত মানে বাংলায় ইলিশ “আশীর্বাদের মাছ”। তাই জামাইষষ্ঠীতে জামাইকে ইলিশ, সরস্বতী পূজায় জোড়া ইলিশ। কারণ ইলিশ মানে ধর্মরাজের আশীর্বাদ।
পণ্ডিতরা বলেন মহাভারতের মূল শ্লোকে ইলিশের নাম নেই। আছে “শফরী” বা “রোহিত” মাছের কথা। কিন্তু বাংলায় মহাভারত যখন কাশীরাম দাস অনুবাদ করেন ১৬-১৭ শতকে, তখন তিনি স্থানীয় আবেগ মেশান। বাঙালি পাঠককে টানতে সরোবরের মাছকে “ইলিশ” বানিয়ে দেন। সেই থেকে লোকের মুখে মুখে গল্পটা ছড়ায়। তাই মহাভারতে ইলিশ সরাসরি নেই, কিন্তু **বাঙালির মহাভারতে ইলিশ আছে**। ৪০০ বছর ধরে আমরা বিশ্বাস করে আসছি, আর বিশ্বাসটাই তো সংস্কৃতি।
এদিকে মোঘলরা, যারা ৪০০ বছর ভারত শাসন করেছিল,তারাও ছিল ইলিশ প্রেমী।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী *তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী*-তে লেখা আছে ১৬১০ সালের ঘটনা। সুবেদার ইসলাম খাঁ যখন বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনেন, তখন তিনি জাহাঙ্গীরকে উপহার পাঠান। উপহারের লিস্টে ছিল: মসলিন, হাতি, আর **”পদ্মার রুপালি মাছ, যার স্বাদ হিন্দুস্তানের কোনো মাছে নাই”**। এই মাছের নাম উল্লেখ নেই ওই বই এ। তবে বোঝাই যায় যে এটা ইলিশ।
জাহাঙ্গীর সেই ইলিশ খেয়ে এত মুগ্ধ হন যে দরবারে ঘোষণা দেন, “বঙ্গদেশ থেকে প্রতি বর্ষায় এই মাছ আমার জন্য আসিবে।” এরপর থেকে মোগল হরকরা পালকি করে বরফ ছাড়াই ইলিশ পাঠাত আগ্রা-দিল্লিতে। কাঠের বাক্সে কলা পাতা আর ভেজা চট দিয়ে মোড়ানো ইলিশ ১৫ দিনেও নষ্ট হতো না।
জাহাঙ্গীর সেই ইলিশ খেয়ে এত মুগ্ধ হন যে দরবারে ঘোষণা দেন, “বঙ্গদেশ থেকে প্রতি বর্ষায় এই মাছ আমার জন্য আসিবে।” এরপর থেকে মোগল হরকরা পালকি করে বরফ ছাড়াই ইলিশ পাঠাত আগ্রা-দিল্লিতে। কাঠের বাক্সে কলা পাতা আর ভেজা চট দিয়ে মোড়ানো ইলিশ ১৫ দিনেও নষ্ট হতো না।
মোগল বাবুর্চিরা ইলিশকে শুধু ভাজেনি। তারা ইলিশকে দিয়েছে নবাবি টুইস্ট।
ইলিশ-ই-মুসাল্লম: মুরগি-মুসাল্লমের মতো আস্ত ইলিশকে দই, জাফরান, পোস্ত, কেওড়া জল দিয়ে দমে রান্না হত এই পদ। পেটের ভেতর পুর দেওয়া হতো বাদাম, কিশমিশ, খোয়া ক্ষীর। এটা খেতেন শুধু সম্রাট আর শাহজাদারা।
ইলিশ কালিয়া: ঘি, গরম মসলা, টক দই আর পেঁয়াজ বাটা দিয়ে গাঢ় ঝোল দিয়ে করা হত ইলিশ কালিয়া। শাহজাহানের আমলে এই পদ এত জনপ্রিয় ছিল যে দিল্লির চাঁদনি চকে “কালিয়া ইলিশ” আলাদা দোকান বসত বর্ষাকালে।
বিরিয়ানিতে ইলিশ: মোগলরা ইলিশের বিরিয়ানিও খেত। ঢাকার নায়েবে নাজিমরা ঈদের দিনে কাচ্চির সাথে ইলিশের লেয়ার দিত। ইলিশের তেলেই চালটা হয়ে যেত সোনালি। এই রেসিপি এখনও পুরান ঢাকার কিছু পরিবারে আছে।
মোগলরা চলে গেলেও ঢাকার নবাবরা ইলিশের বাদশাহি ধরে রাখে। নবাব সলিমুল্লাহর দস্তরখানে বর্ষাকালে ৪০ দিন ধরে “ইলিশ উৎসব” চলত। প্রতিদিন ২০ পদের ইলিশ। ইলিশের কোফতা, ইলিশের হালুয়া, এমনকি ইলিশের আচার। অতিথি যে-ই আসুক, পাতে ইলিশ থাকবেই। ১৮শ শতকে ঢাকার নবাবরা জমিদারদের কাছ থেকে খাজনার একটা অংশ নিত ইলিশ দিয়ে। বড় বড় জমিদার বর্ষায় নৌকা ভরে ইলিশ পাঠাত আহসান মঞ্জিলে। কারণ নবাবের ধারণা ছিল, “যে পরগনায় ইলিশ বেশি, সে পরগনা বেশি সুখী।”
নবাব পরিবারের হাকিমরা ইলিশের তেলে বাতের ব্যথা কমে এই টোটকা আবিষ্কার করেছিল।। তাই শীতকালে বেগমরা গায়ে ইলিশের তেল মাখত। আর নবাবরা খালি পেটে ইলিশের পিত্ত খেত শক্তি বাড়ানোর জন্য।
দিল্লি-আগ্রায় রুই-কাতলা সহজ ছিল। কিন্তু ইলিশ ১৫০০ কিমি দূর থেকে আসত। তাই ইলিশ খাওয়াতে পারা মানে তুমি ক্ষমতাবান। ইউনানি হাকিমরা লিখেছে, ইলিশ “গরম ও তর”। এটা রক্ত বাড়ায়, মন ভালো করে। তাই বাদশাহরা যুদ্ধে যাওয়ার আগে ইলিশ খেত। বাংলার সুবেদাররা দিল্লিকে খুশি রাখতে প্রতি বছর প্রথম জাটকার ইলিশ পাঠাত। এটা ছিল “মাছের নজরানা”। সম্রাট খুশি মানে চাকরি পাকা।
সম্রাট আওরঙ্গজেব খেতেন না।তিনি খুব সাদাসিধে ছিলেন। দামি ইলিশ খাওয়া বিলাসিতা ভেবে নিষেধ করেন। কিন্তু তার ছেলে শাহজাদা আজম ঢাকার সুবেদার থাকতে লুকিয়ে ইলিশ খেতেন। বাবা জানলে রাগ করবে বলেই লুকিয়ে খাওয়া। সুবাদার ইসলাম খাঁ ঢাকা থেকে আগ্রা পর্যন্ত “ইলিশ রোড” বানিয়েছিলেন। প্রতি ২০ মাইল পর পর ঘোড়া বদলের পোস্ট। শুধু ইলিশ যাতে তাড়াতাড়ি যায়।
ইলিশ মানে শুধু ভাতের সাথে এক টুকরো মাছ না। ইলিশ মানে ১২০০ বছরের ক্ষুধা, তৃপ্তি, উৎসব, যুদ্ধ। ইলিশ মানে চণ্ডীমঙ্গলের ফুল্লরা থেকে পদ্মা নদীর কুবের মাঝি। ইলিশ মানে ধর্মরাজের আশীর্বাদ থেকে মুক্তিযুদ্ধের জেলের অস্ত্র কেনার টাকা।হ্যাঁ ১৯৭১ এ পাকিস্তান বাহিনী জেলেদের জাল ফেলা নিষিদ্ধ করেছিল পদ্মায়, কারণ এই মাছ বেচা টাকা চলে যেত মুক্তিবাহিনীর হাতে। এইজন্যেই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী কে কুপোকাত করতে এই ব্যবস্থা ছিল।
কাল নয়া বাংলা সাল শুরু হচ্ছে। পাতে সর্ষে ইলিশ তুলে দেওয়ার সময় ভাববেন, আপনি শুধু মাছ খাচ্ছেন না। খাচ্ছেন কয়েক হাজার বছরের বাঙালির প্রিয় খাবার।