আজ আনন্দের দিন, আজ বরণের দিন। আজ গ্লানি মুছে ফেলার দিন। নতুন করে শুরু করার দিন। আজ নববর্ষ।
আমাদের এই নববর্ষের সঙ্গে মিশে আছে হাজার বছরের কৃষি সংস্কৃতি। বঙ্গভূমি কৃষিকেন্দ্রিক একটি বৃহৎ ভূখণ্ডের অংশ, যার জীবনপ্রণালি কৃষি সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিভিত্তিক সমাজের জীবনযাত্রা, ফসল রোপণ ও তোলার হিসাব, শাসন ও কর ব্যবস্থা কৃষিকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রাচীন বাংলায় সৌরমাস অনুযায়ী গণিতভিত্তিক বাংলা সন গণনার একটি ধারা প্রচলিত ছিল। এই হিসাব অনুসারে বৈশাখ মাসে বা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে নতুন বছর গণনা শুরু হয়। এর শুরুটা কবে হয়েছিল, তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। উত্তর ভারতের বৈশাখী, অসমের রঙ্গালি বিহু, তামিলনাড়ুর পুথান্ডু, কেরালার ভিশু, ওডিশার বিষুবসংক্রান্তি, মিথিলার জুড় শীতল, কম্বোডিয়ার চউল চনাম থিমে, থাইল্যান্ডের সংক্রান, শ্রীলঙ্কার আলুথ অভুরুদ্দ, বাংলার পয়লা বৈশাখ এবং তিব্বতের নববর্ষ প্রায় একই সময় অনুষ্ঠিত হয়। অনুমান করা যায়, প্রায় ১০ হাজার বছরের পুরোনো ধানের প্রত্নপ্রমাণ কৃষি সংস্কৃতির সূত্রে এই বিশাল ভূখণ্ডের মানুষকে একই সুতায় বেঁধে রেখেছে। বাংলা চৈত্র থেকে অগ্রহায়ণ মাস তথা ইংরেজি মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি—এই ৯ মাসের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষিকেন্দ্রিক জনপদগুলোতে বিভিন্ন ধানের চাষ ও ফসল তোলার সময়। ধান চাষ ও ফসল তোলার সময়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এই অঞ্চলগুলোতে নতুন বছর আগমনের সময়টি প্রায় একই।
কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী ধারাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসক তাঁদের প্রয়োজনে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। সে কারণে প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে বছরের হিসাব রাখার জন্য সংবত বা বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ, হিজরি, ফসলি সন, ত্রিপুরাব্দ, মঘীসন, পরগনাতি সন ইত্যাদির প্রচলন হয়। কোনো না কোনো রাজা বা সম্রাট এই হিসাবগুলো প্রবর্তন করেছিলেন। কিন্তু ভূমিজ বাঙালির সৌরমাস অনুযায়ী গণিতভিত্তিক বাংলা সন গণনার ধারা টিকে গেছে আপন মহিমায়। জনপ্রিয় মতে, এই ধারাকে উল্লেখ করা হয় ‘বঙ্গাব্দ’ বলে। বঙ্গাব্দ অভিধাটি কে দিয়েছিলেন, তার সঠিক কোনো তথ্য আসলে পাওয়া যায় না। শশাঙ্ক? আধুনিক গবেষণায় সেটি খারিজ হয়ে গেছে। আকবর? বর্তমানে এটি জনপ্রিয় মত। কিন্তু সম্রাট আকবর প্রচলন করেছিলেন রাজস্ব বর্ষ বা ফসলি সন। জানা যাচ্ছে, আকবরি সন বা ‘ফসলি সন’ কখনো কোনো দলিলে ‘বঙ্গাব্দ’ নামে উল্লিখিত হয়নি। এ ছাড়া ফসলি সন শুরু হয় ভাদ্র মাসের শুক্ল প্রতিপদে, পয়লা বৈশাখে নয়। ১৮৩৬ সালে ‘অ্যানালাইসিস অব দ্য ল্যান্ড অ্যান্ড রেভিনিউ’ নামক রিপোর্টে প্রথম এই ‘ফসলি সন’ বিষয়ে বক্তব্য দেন হ্যারিংটন। তখন থেকেই সরকারি আনুকূল্যে পরিবর্তিত হিজরি ফসলি সনকে ‘সন-ই-বাঙ্গালা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়। সেই রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, ‘The Bengali era, to which the year began with the arrival of the sun at the vernal equinoctial point, and the months were regulated by his passage through the twelve signs of the zodiac.’ এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে আকবরের সময় বা আরও অনেক আগে থেকে বাংলা সৌরমাস অনুযায়ী গণিতভিত্তিক বাংলা সন এ দেশে প্রচলিত ছিল। অবশ্য সেই সন কার দ্বারা প্রবর্তিত বা প্রচলিত ছিল, সে ব্যাপারে কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষির শুরু বহু বহু বছর আগে। তার নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে অনেক। এটারও প্রমাণ আছে যে এই অঞ্চলে সৌরপঞ্জিকা প্রচলিত ছিল এবং সেই পঞ্জিকা ঠিক কবে প্রচলিত হয়, তার কোনো সঠিক সময় জানা যায় না। অধ্যাপক সিলভ্যা লেভি তাঁর লি নেপাল গ্রন্থে দাবি করেছিলেন, বঙ্গাব্দের প্রচলন হয়েছিল একটি তিব্বতি পঞ্জিকা অনুসারে। ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখায়ও এ তথ্য পাওয়া যায়। তিব্বতি পঞ্জিকার এই সূত্র আমাদের বহু চর্চিত আর্য ইতিহাসের বাইরের একটি সূত্রকে সামনে এনে হাজির করেছে। তিব্বতি নৃপতি স্রং সন (রি-স্রং-সন) এবং তাঁর পুত্র স্রং সন গাম্পো (স্রং-সন-গাম-পো) মূলত বৌদ্ধ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত নাম। ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিব্বতি রাজা স্রং সন নেপাল জয় করেন। আবার এই বছরেই তাঁর পুত্র স্রং সন গাম্পোর জন্ম হয়েছিল। জানা যায়, ৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিব্বতিরা সিকিম, নেপাল, অসম ও বাঙ্গালাদেশ জয় করেছিলেন। ‘… “বাংলা জয়ে”র স্মারক হিসেবে তিব্বতি সন শুরু হচ্ছে ৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। যদিও লর্ড কর্নওয়ালিসকে তৎকালীন দলাই লামা (১২০৩ ও ১২০৬ বঙ্গাব্দে) জানিয়েছিলেন, তিব্বতি সন শুরু হয় ৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। এই দু-চার বছরের ব্যতিক্রম বাদ দিলে বোঝা যায়, এই সময়ে নেপাল, উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও রাঢ় অঞ্চলের উপজাতি ও কৌম সমাজে তিব্বতি সংস্কৃতির প্রভাব বিশেষভাবে বেড়ে উঠেছিল। দুই প্রতাপশালী তিব্বতি রাজা স্রং সন ও স্রং সন গাম্পোর প্রতিপত্তি বাংলা ও অসমে বেশ ভালোই ছিল। তিব্বতি রাজশক্তির শীর্ষ পর্বে ইতরযানী কৃষি সমাজে তিব্বতি সনের প্রচলন হওয়াটা নেহাত অসম্ভব নয়।’ (শিবাংশু দে)
স্রং সন ও স্রং সন গাম্পো বাংলা সনের সূত্রপাত করুন আর না-ই করুন, সম্রাট আকবরের বহু আগে তিব্বতসহ পুরো ভারতবর্ষে এবং এর বাইরেও একটি সৌরপঞ্জিকার প্রচলন ছিল এবং সুদীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের মানুষ সেটি মেনে চলতে অভ্যস্ত ছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন হলেও বাংলা সন বা বঙ্গাব্দকে ভূমিজ মানুষের বাস্তব নির্ভরতা থেকে কেউ স্থানচ্যুত করতে পারেনি। এই ধারণা টিকে গিয়েছিল কৃষি ও বাণিজ্যের সূত্র ধরে। সম্রাট আকবরও এই ভূমিজ মানুষের সংস্কৃতিকে নিজের সঙ্গে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন চান্দ্রপঞ্জিকাকে সৌরপঞ্জিকায় রূপান্তর করে।
তথ্যসূত্র
১. শিবাংশু দে, পয়লা বৈশাখ: একটি অনার্য অডিশি, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম।
২. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ (সম্পাদক), নববর্ষ ও বাংলার লোকসংস্কৃতি, সূচীপত্র, ঢাকা। এই সংকলনে প্রকাশিত ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘বাংলা সনের সূচনা কবে থেকে’।