অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলের শান্ত শহর অ্যাডিলেড। গত ২৯ মার্চ এই শহরের বাতাস যেন হঠাৎ করেই বদলে গিয়েছিল। মাউন্ট লাফটির বুক চিরে আসা বাতাস আজ আর বিদেশি মনে হচ্ছিল না; মনে হচ্ছিল এ যেন চট্টগ্রামের সেই ফয়’স লেক কিংবা হাটহাজারীর পাহাড়ী কোল থেকে ধেয়ে আসা চেনা কোনো ঘ্রাণ। উপলক্ষ— চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা ও ঈদ পুনর্মিলনী। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও একদল মানুষ কীভাবে তাদের শেকড়কে বুকে ধরে রাখতে পারে, তার জীবন্ত প্রমাণ ছিল এই আয়োজন। এটি কেবল একটি ঈদ পুনর্মিলনী ছিল না; এটি ছিল এক টুকরো বাংলাদেশকে অস্ট্রেলিয়ার বুকে পুনর্নির্মাণ করা। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। কেউ এসেছেন নব্বই দশকের সাদা-কালো স্মৃতির ঝুলি নিয়ে, কেউবা একদম সাম্প্রতিক ব্যাচের প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে। সবারই অভিন্ন পরিচয়— তারা শাটল ট্রেনের যাত্রী।
অ্যাডিলেডের এক কমিউনিটি সেন্টারে বিকেল থেকেই ছিল সাজ সাজ রব। আয়োজক কমিটির সদস্যরা কেউ ব্যানার টানাতে ব্যস্ত, কেউবা দেখছিলেন সাউন্ড সিস্টেম ঠিক আছে কি না। যারা অনুষ্ঠানে প্রবেশ করছিলেন, তাদের প্রত্যেকের চোখেই ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তি। ২০ বছর আগে ক্যাম্পাস ছাড়া বড় ভাই থেকে শুরু করে গত বছর পাস করা তরুণ সদস্য— সবার গন্তব্য ছিল একটাই।
বিদেশের ব্যস্ত জীবনে ক্ষণিকের জন্য হলেও সবাই ফিরে গিয়েছিলেন সেই ‘স্মৃতির ২১ কিলোমিটারে’। বিভিন্ন ব্যাচ ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠানস্থল পরিণত হয়েছিল এক টুকরো চবি ক্যাম্পাসে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি নির্জন অরণ্যঘেরা জগত, যেখানে প্রকৃতি আর শিক্ষার এক অদ্ভুত মিতালি ঘটেছে। অ্যাডিলেডের মিলনমেলায় আগত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যখন তাদের সেই ২০-৩০ বছর আগের দিনগুলোতে ফিরে গেলেন, তখন পুরো হলরুমে যেন এক অন্যরকম নিস্তব্ধতা নেমে এল। প্রত্যেকের চোখেমুখে তখন ভেসে উঠছিল সেই ‘একুশ কিলোমিটার’ পথের হাজারো না বলা গল্প।

শাটল ট্রেনের স্মৃতি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শাটল ট্রেন। আড্ডায় উঠে এলো ষোলশহর স্টেশন থেকে ট্রেনের হুইসেল বাজার সেই মুহূর্তগুলো। কীভাবে ট্রেনের হাতলে তাল দিয়ে গান গাওয়া হতো, কীভাবে এক সিটে পাঁচজন বসেও হাজারো স্বপ্ন বোনা হতো। একজন প্রবীণ চবিয়ান তার স্মৃতিচারণে বললেন, “অ্যাডিলেডের অত্যাধুনিক ট্রেনগুলোতে চড়লে আরাম পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু শাটল ট্রেনের সেই লোহার বগির গানের সুর আর কোথাও খুঁজে পাই না।”
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল একে অপরের সাথে স্মৃতিচারণ। কেউ বলছিলেন ঝুপড়ির সেই গরম চা আর সিঙ্গাড়ার কথা, কেউবা মেতে উঠেছিলেন শাটল ট্রেনের গানের স্মৃতিতে। সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ ভুলে সবাই মেতেছিলেন প্রাণের উচ্ছ্বাসে।
“চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়টা আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। হাজার মাইল দূরে থাকলেও আমরা যে আসলে একই পরিবারের সদস্য, আজকের এই ভিড় আর হাসিই তার প্রমাণ।” — অনুষ্ঠানে আগত এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
অ্যাডিলেডের মিলনায়তনে যখন ব্যানারে শাটল ট্রেনের একটি চিত্র ভেসে উঠল, তখন পুরো হলের গুঞ্জন মুহূর্তেই থেমে গেল। হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বসে সেই ছবি দেখে অনেকের চোখই তখন ভিজে উঠেছে। কারণ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর কাছে ‘শাটল ট্রেন’ কেবল একটি যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি একটি চলমান ক্যাফেটেরিয়া, একটি গানের আসর এবং হাজারো প্রেমের সূতিকাগার।
একজন প্রাক্তন ছাত্রী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাসিমুখে বললেন, “আমাদের সময় শাটলে চড়ে যাওয়া-আসার মাঝেই কত প্রেম হয়েছে, আবার কত মান-অভিমানে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়েছে। আজ যখন অ্যাডিলেডে নিজের গাড়িতে চড়ে অফিসে যাই, তখন সেই ট্রেনের জানলার ধারের সিটটার জন্য খুব মায়া হয়।”
ঈদুল ফিতরের রেশ তখনও কাটেনি। তাই মিলনমেলার সাথে যুক্ত হয়েছিল ঈদের আনন্দ। সবাই এসেছেন পাঞ্জাবি আর রঙিন শাড়িতে। বিদেশের মাটিতে দেশীয় সাজগোজের এই দৃশ্য যেন একটি ছোটখাটো বাংলাদেশ।খাবারের মেন্যু সাজানো হয়েছিল অত্যন্ত সচেতনভাবে। খাবারের ঘ্রাণে পুরো হলরুম যেন চট্টগ্রামের চকবাজার বা জিইসি মোড়ের কোনো এক উৎসবে রূপ নিয়েছিল।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক শিক্ষার্থী বলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মানে কেবল একটি ডিগ্রি নয়, এটি একটি আবেগ। আজ এই প্রবাসে যখন ছোট ভাই-বোনদের মুখে ‘চবি’ শব্দটা শুনি, মনে হয় বাড়ির পাশেই আছি।”
সেতুবন্ধন: প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধন: এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল নেটওয়ার্কিং। অ্যাডিলেডে বর্তমানে অনেক চবিয়ান সুনামের সাথে কাজ করছেন। নতুন যারা অস্ট্রেলিয়াতে পা রাখছেন, তাদের জন্য এই জ্যেষ্ঠ সদস্যরা হয়ে উঠলেন পরম আশ্রয়। কীভাবে বিদেশের মাটিতে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে হয়, কীভাবে একাকিত্ব জয় করতে হয়— এসব নিয়ে চলল দীর্ঘ পরামর্শ।
“আমরা চাই অ্যাডিলেডে চবি পরিবারের এই ঐক্য শুধু একদিনের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থাকুক। বিপদে-আপদে আমরা যেন একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারি, এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।” — আয়োজক কমিটির একজন।
উপস্থিত অতিথিরা একমত হলেন যে, শাটল ট্রেন তাদের জীবনের একটি বড় পাঠ শিখিয়েছে— তা হলো ‘সহনশীলতা’ এবং ‘একসাথে পথ চলা’। ট্রেনের ভেতরে প্রচণ্ড ভিড়, গরম আর ঘামের মাঝেও মানুষ যেভাবে হাসিমুখে গান গাইত, সেই ধৈর্যই আজ তাদের প্রবাস জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে।

একজন শিক্ষাথী জানালেন চার বা পাঁচ বছর পর যখন ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় আসত, তখন শাটল ট্রেনের শেষ যাত্রাটা ছিল সবচেয়ে কষ্টের। ট্রেনের জানলা দিয়ে পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা আর মনে মনে বলা— “আবার কবে আসব প্রিয় ক্যাম্পাস?”
অ্যাডিলেডের পুনর্মিলনীতে এই স্মৃতিগুলো যখন একে একে বর্ণনা করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত সবাই যেন সেই পুরোনো দিনের ‘সবুজ অরণ্যে’ হারিয়ে গিয়েছিলেন। একজন শিক্ষার্থী আবেগতাড়িত হয়ে বললেন, “অস্ট্রেলিয়া আমাদের জীবিকা দিয়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের আত্মাটা আজও সেই কাটাপাহাড়ের বাঁকে আর শাটল ট্রেনের বগিতেই রয়ে গেছে।”

মিলনমেলা থেকে বিদায়, কিন্তু স্মৃতিতে অক্ষয়: রাত ঘনিয়ে আসতেই বিদায়ের সুর বেজে ওঠে। কিন্তু এই বিদায় মানেই শেষ নয়। আয়োজকরা ঘোষণা দিলেন, এই সংগঠনকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে শুধু উৎসব নয়, বরং আর্তমানবতার সেবায় এবং অস্ট্রেলিয়ার মূলধারায় চবিয়ানদের অবদান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার অঙ্গীকার করা হয়।
অ্যাডিলেডের এই মিলনমেলা প্রমাণ করেছে যে, মানুষ তার কর্মস্থলে বা বাসস্থানে বদলে যেতে পারে, কিন্তু তার শেকড় কখনোই বদলে যায় না। চবি’র এই বিখ্যাত জায়গাগুলো কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, এগুলো প্রতিটি চবিয়ানের মনের মানচিত্রের একেকটি উজ্জ্বল বিন্দু।
২৯ মার্চের সেই রাতটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে রইল না, বরং অ্যাডিলেডের চবিয়ানদের জন্য হয়ে রইল একটি পুনর্জন্মের গল্প। রাতের আলোয় যখন অনুষ্ঠান শেষ হলো, সবার চোখে-মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি আর মনে ছিল আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি। যেন বিদায়বেলাতেও কানে বাজছিল— “স্মৃতির ক্যাম্পাসে আমরা চিরকাল অমলিন।”
