মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে পর্যটন খাতে। জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সংকটের আশঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া পর্যটনে ধস নেমেছে। আসন্ন ‘ইস্টার’ লম্বা ছুটির আগে ব্যাপক হারে বুকিং বাতিল করছেন পর্যটকরা। শুধু সড়কপথই নয়, আকাশপথেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
পর্যটনে বড় ধাক্কা, কমছে ব্যয়: ট্যুরিজম রিসার্চ অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পর্যটকদের রাতযাপন বাবদ খরচ কমেছে প্রায় ২৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে ১২০ কোটি, নিউ সাউথ ওয়েলসে (এনএসডব্লিউ) ৪১ কোটি এবং কুইন্সল্যান্ডে ৩৮ কোটি ডলারের লোকসান হয়েছে।
সিডনি থেকে দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ‘মুরুরুন্দি ক্যারাভান পার্ক। মালিক ডন কেম্বল জানান, প্রতিবছর এই সময়ে উৎসব ও এয়ার শোর কারণে তার পার্কটি কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। কিন্তু এবার প্রতিদিন ২-৩টি করে বুকিং বাতিল হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মানুষ ভয় পাচ্ছে যদি আঞ্চলিক এলাকায় গিয়ে আটকা পড়ে এবং ফেরার জন্য তেল না পায়। আজ রাতে আমার এখানে একটি বুকিংও নেই।”
ব্যবসায়ীদের পাল্টা লড়াই: পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে অপারেটররা নানা কৌশলী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ‘রিফ্লেকশনস হলিডেজ’ তাদের অতিথিদের জন্য ২৫ ডলারের পেট্রোল ভাউচার ঘোষণা করেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যাতায়াত খরচ সামলাতে পাক্ষিক ৫০ ডলার পর্যন্ত জ্বালানি ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, উত্তর অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে নৌ-পর্যটন পরিচালনাকারীরাও চরম বিপাকে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে তাদের পরিচালনার খরচ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যার প্রধান কারণ জ্বালানির দাম।
থমকে গেছে চাকা, খাঁ খাঁ করছে ক্যাটরি: নিউ সাউথ ওয়েলসের লেক ম্যাককুয়ারির বাসিন্দা পলা এবং মাইকেল ক্যান্ডলিশ গত সাড়ে চার বছরে তাদের ক্যারাভানে ৬০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। আগামী মে মাসে তাদের পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জ্বালানি সংকটের অনিশ্চয়তায় তারা যাত্রা স্থগিত করেছেন।
ভ্রমণ বাতিলের প্রভাব পড়েছে সিডনির বড় একটি বিড়াল বোর্ডিং বা ‘ক্যাটরি’ ব্যবসায়। প্রতিষ্ঠানের মালিক মাইকেল সিমস জানান, ইস্টারের সময় সাধারণত তাদের কোনো জায়গা খালি থাকে না। কিন্তু এবার মানুষ দেশের ভেতরে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করায় বিড়াল রাখার বুকিংও কমছে। পরিস্থিতি সামলাতে তিনি নিজস্ব ‘পেট ট্যাক্সি’ সেবা চালু করেছেন।
আকাশপথেও অস্থিরতা: জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজেট এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। জেটস্টার মে মাস থেকে তাসমানিয়া রুটের ১২ শতাংশ ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম এয়ারলাইনসও তাদের অভ্যন্তরীণ রুটে বেশ কিছু ফ্লাইট বাতিল করছে।
সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ড. স্টিফেন লেইব বলেন, “ফ্লাইট কমে যাওয়ার অর্থ হলো যাত্রীদের জন্য বিকল্প কমে যাওয়া এবং টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়া। মানুষ বাড়তি দাম দিতে না চাইলে এয়ারলাইনসগুলো অলাভজনক রুটগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় পর্যটন খাতের এই স্থবিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
Source: ABC news