আফ্রিকার রঙিন দুয়ার মরোক্কোর দিনগুলি -পর্ব ১

উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সঙ্গে আমার অন্তরের টান সেই ছোটবেলা থেকেই, যখন পাঠ্যবইয়ে ইবনে বতুতার কথা পড়তাম। সুদূর মরক্কো থেকে তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন, এসেছিলেন আমাদের বাংলাদেশেও। সিলেটে হযরত শাহ জালালের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনি ও ঐতিহাসিক বিবরণ আমার কিশোর মনে তার মাতৃভূমি সম্পর্কে গভীর কৌতূহল জাগিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে আমি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী খাবার তাজিনের প্রতি। ধীরে ধীরে তাজিন রান্নার কৌশল আয়ত্ত করি এবং বিভিন্ন ধরনের তাজিন পাত্র সংগ্রহ করতে শুরু করি। ২০২০ সালে ফেসবুকে আমার সেই সংগ্রহের সঙ্গে একটি ছবিও পোস্ট করেছিলাম। আমার অন্যান্য সংগ্রহের মতো এ ক্ষেত্রেও আমার জীবনসঙ্গিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

দেশটি সম্পর্কে আরও জানার জন্য প্রায়ই এর শহর, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও খাবারদাবার নিয়ে পড়াশোনা করতাম। ইউটিউবে দেখতাম মরক্কো ভ্রমণের ভ্লগ ও রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠান। বাড়িতে অতিথি এলে প্রায়ই তাজিন রান্না করতাম, যদিও অন্য কোনো রান্নার প্রতি আমার তেমন আগ্রহ বা দক্ষতা নেই।

এত পড়াশোনা ও কল্পনার পরও মরক্কো আমার কাছে দূর দেশের এক অধরা গন্তব্য হয়েই ছিল। মনে মনে ভাবতাম, কোনো দিন যদি দেশটির প্রাচীন শহরগুলোর অলিগলি দিয়ে হাঁটতে পারতাম, ফেজের মদিনায় (দুর্গবেষ্টিত পুরোনো শহর) রহস্যময় জগতে প্রবেশ করতে পারতাম কিংবা মারাকেশের বিখ্যাত জেমা এল-ফনা ঐতিহাসিক চত্বরে বসে এক কাপ পুদিনা চা পান করতে পারতাম! কিন্তু সেই দিনটি কবে বা কীভাবে আসবে, তা জানতাম না।

অবশেষে আমার পেশাগত জীবনের সূত্র ধরেই সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল। ২০২৬ সালের Equality, Diversity and Inclusion (EDI) Conference-এর আয়োজক ছিল মরক্কোর ঐতিহাসিক শহর মারাকেশের কাদি আইয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়। একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবে সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি আমার গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। সম্মেলনের একটি গবেষণা স্ট্রিমের চেয়ার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সংবাদটি তাই আমার জন্য একই সঙ্গে পেশাগত স্বীকৃতি এবং বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের বার্তা নিয়ে এলো।

স্ট্রিম চেয়ার হিসেবে আমি সাংস্কৃতিক সক্ষমতা বা cultural competence বিষয়ে গবেষণাপত্র আহ্বান করলাম। দেশ-বিদেশের গবেষক ও শিক্ষাবিদেরা এই স্ট্রিমে তাঁদের গবেষণাপত্র জমা দেবেন, আর আমি আন্তর্জাতিক জ্ঞানবিনিময়ের এই পরিসরটিকে নেতৃত্ব দেব। এসব ভাবতেই আনন্দের পাশাপাশি গভীর সন্মানিত বোধ করলাম। যে দেশটিকে এত দিন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও খাবারের মধ্য দিয়ে চিনেছি, এবার সেখানে যাওয়ার পথ তৈরি হলো আমার নিজের গবেষণা ও একাডেমিক কাজের সূত্র ধরে।

মারাকেশে সম্মেলন ছিল ২ থেকে ৪ জুলাই ২০২৬। সম্মেলনের আগে মরক্কোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ঘুরে দেখার জন্য ২৫ জুন রাতে অ্যাডিলেড থেকে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা করলাম। সময় ছিল সীমিত, অথচ দেখার তালিকা দীর্ঘ। তাই তৈরি হলো বেশ আঁটসাঁট এক ভ্রমণসূচি। প্রথমে অ্যাডিলেড থেকে দোহা, তারপর কাসাব্লাঙ্কা। দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে ২৬ জুন কাসাব্লাঙ্কায় পৌঁছে সেখানে এক রাত থাকার পরিকল্পনা ছিল। পরদিন মরক্কোর দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন আল বোরাকে চড়ে রওনা হব দেশটির রাজধানী রাবাতের উদ্দেশে। রাবাতে এক রাত কাটিয়ে যাব উত্তরের বন্দরনগরী টানজিয়ারে। সেখানেও এক রাত, তারপর যাত্রা ফেজের পথে। ফেজে দুই রাত কাটানোর পর ১ জুলাই ট্রেনে করে পৌঁছাব মারাকেশে। পরদিন শুরু হবে তিন দিনের EDI সম্মেলন। সম্মেলন শেষে ৪ জুলাই কাসাব্লাঙ্কার পথে রওনা হয়ে সেখান থেকে দোহা হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরব।

পরিকল্পনাটি ছিল রোমাঞ্চকর, তবে সহজ নয়। প্রায় প্রতিদিনই নতুন শহর, নতুন রেলস্টেশন, নতুন থাকার জায়গা এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ।

পরিকল্পনাটি ছিল রোমাঞ্চকর, তবে সহজ নয়। প্রায় প্রতিদিনই নতুন শহর, নতুন রেলস্টেশন, নতুন থাকার জায়গা এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ। এক শহরে পৌঁছানোর আগেই পরের দিনের ট্রেন, হোটেল ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে ভাবতে হবে। কোথাও এক রাত, কোথাও দুই রাত; স্যুটকেস খোলার পরপরই যেন আবার গুছিয়ে নেওয়ার সময় এসে যাবে।

শরীর এই ধকল কতটা সামলাতে পারবে, ট্রেনগুলো সময়মতো পাওয়া যাবে কি না কিংবা অপরিচিত শহরে ঠিকানা খুঁজে পেতে কোনো অসুবিধা হবে কি না, এসব নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। তবু ভয় বা অনিশ্চয়তার চেয়ে উত্তেজনাই ছিল বেশি। মনে হচ্ছিল, সময় অল্প, পথ দীর্ঘ, আর প্রতিটি দিনের আড়ালে অপেক্ষা করছে নতুন কোনো শহর, নতুন কোনো গল্প।