অস্ট্রেলিয়ায় ‘মনোকালচার’ বিতর্ক: পলিন হ্যানসনের মন্তব্যে নতুন করে উত্তাপ

দীর্ঘ তিন দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের পোডিয়ামে দাঁড়িয়েছিলেন ওয়ান নেশন দলের নেতা পলিন হ্যানসন। জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে তাঁর এই উপস্থিতি অনেক আগেই প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যা বললেন, তা যেন দেশটির বহু দশকের বহুসাংস্কৃতিক (Multicultural) কাঠামোর মূলে এক বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। হ্যানসন তাঁর বক্তৃতায় অস্ট্রেলিয়াকে একটি “মনোকালচার” বা একক সংস্কৃতির দেশ হিসেবে গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন। তাঁর দাবি, অস্ট্রেলিয়া হবে “বহুজাতিগত (multiracial) কিন্তু একক সাংস্কৃতিক (monocultural)”। অর্থাৎ, এখানে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের বা বংশোদ্ভূত মানুষ থাকতে পারেন, কিন্তু সাংস্কৃতিক অভিন্নতায় তাঁদের সবাইকে একই সুতোয় বাঁধা থাকতে হবে।

হ্যানসনের এই মন্তব্যের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সমালোচকদের বড় একটি অংশ ‘মনোকালচার’ শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায়, মনোকালচার বা একক চাষাবাদ এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বৈচিত্র্যহীনতায় পুরো ব্যবস্থাটিই ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যে অস্ট্রেলিয়া দশকের পর দশক ধরে বহুসংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে নিজের পরিচয় নির্মাণ করেছে, সেখানে এ ধরনের ধারণা কি আদৌ প্রয়োগযোগ্য? সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, “অস্ট্রেলিয়ার শক্তিই হলো তার বৈচিত্র্য। হ্যানসনের এই ধারণা কেবল সমাজকে বিভাজিত করবে না, বরং বহুসাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়ার মূল ভিত্তিকে অস্বীকার করার নামান্তর।”

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পলিন হ্যানসনের এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কোনো পরিবর্তন নয়, বরং ১৯৯৬ সালে এশীয় অভিবাসন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যেরই একটি ধারাবাহিকতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে হ্যানসন বারংবার অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এবারের প্রেস ক্লাবের বক্তৃতা সেই পুরোনো বিতর্কের আগুনেই নতুন করে ঘি ঢালল।

পর্যবেক্ষকেরা লক্ষ্য করেছেন, হ্যানসন বারবার নিজেকে ‘সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি’ হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। তবে তাঁর এই ভাষ্য কতটা প্রকৃত সাধারণ মানুষের প্রতিফলন, নাকি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রেস ক্লাবের সেই অনুষ্ঠানের পর থেকে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো কেবল তাঁর বক্তব্যই তুলে ধরছে না, বরং তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকেও নতুন করে বিশ্লেষণ করছে।

অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে বহুসংস্কৃতিবাদের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ এখানে নিজেদের ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি লালন করেও গর্বিত অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে টিকে আছেন। হ্যানসনের “মনোকালচার” প্রস্তাব এই জাতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই বিতর্ক কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি অভিবাসন নীতিমালা, সামাজিক সংহতি এবং অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের বহুসাংস্কৃতিক নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ধরনের রাজনৈতিক আলোচনার খোরাক হতে যাচ্ছে। আগামী দিনে অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিতে অভিবাসন ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে যে মেরুকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে, পলিন হ্যানসনের এই বক্তব্য তাতে নতুন এক মাত্রা যোগ করল—এমনটাই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

পলিন হ্যানসনের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের বক্তব্য এবং অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের আলোকে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। (ছবি : সংগৃহীত)