যুক্তরাষ্ট্রে নিহত বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী বৃষ্টির মরদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির (২৭) মরদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর মরদেহ খুঁজে পেতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। এনবিসি নিউজ ও ফক্স ১৩ টাম্পা বে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। ফক্স ১৩ টাম্পা বের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তল্লাশি–উদ্ধার অভিযানে ‘উই আর দ্য এসেনশিয়ালস’ নামের স্বেচ্ছাসেবীরাও যোগ দিয়েছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার উদ্ধারকারী দলগুলো স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করে। তদন্তকারীরা আগে এই এলাকাতে তল্লাশি চালিয়েছিলেন। এখন মুঠোফোনের তথ্যসহ সাম্প্রতিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) ক্ষতবিক্ষত মরদেহ গত শুক্রবার উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফ্লোরিডার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জামিল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। আর বৃষ্টি পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। জামিল ও বৃষ্টিকে সবশেষ ১৬ এপ্রিল টাম্পায় দেখা গিয়েছিল। তাঁদের খোঁজ না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ ডায়েরি হয়।
জামিল ও বৃষ্টির নিখোঁজ–মৃত্যুর ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের এক মার্কিন যুবককে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার (ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার) দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে গতকাল।
‘বাবা আমি ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করছি, ইউনিভার্সিটির ল্যাবের কাজ চলছে। পাঁচটার দিকে আমরা কেনাকাটা করতে যাব। আমার এক বান্ধবীকে নিয়ে আমি কেনাকাটা করব।’ গত ১৬ এপ্রিল বাবা জহির উদ্দিন আকনের সঙ্গে শেষবার এসব কথাই বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিহত শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। আগামী জুলাই মাসে ছুটি নিয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল বৃষ্টির। পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে যাওয়ার সেই পরিকল্পনাই যে তার শেষ কথা হবে, ভাবতেও পারেননি বাবা। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ হওয়ার পর সেদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বৃষ্টির মৃত্যুর খবর জানালেও এখন পর্যন্ত তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর ও ঢাকার মিরপুরের বাসায়।

এখন আর কেউ ‘বাবা’ বলে ডাকবে না, মেয়ের সঙ্গে আর কথা হবে না বলতে বলতে ভেঙে পড়ছিলেন বৃষ্টির বাবা। তিনি বলেন, ‘ওইদিনের (বৃহস্পতিবার) কথাই ছিল আমার মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা। আমার মেয়ে বৃষ্টিকে আমি “মা” বলে ডাকতাম। এখন আমি আর কাউকে “মা” বলে ডাকতে পারব না।’

বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘কত আনন্দ ছিল আমার আমার মেয়ের মনে, জুলাইয়ে ওর দেশে আসার কথা ছিল। এই জন্যই নিজের এবং পরিবারের জন্য সময় পেলেই কেনাকাটার চেষ্টা করত।’ এখন আর কেউ ‘বাবা’ বলে ডাকবে না, মেয়ের সঙ্গে আর কথা হবে না বলতে বলতে ভেঙে পড়ছিলেন বৃষ্টির বাবা। তিনি বলেন, ‘ওইদিনের (বৃহস্পতিবার) কথাই ছিল আমার মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা। আমার মেয়ে বৃষ্টিকে আমি “মা” বলে ডাকতাম। এখন আমি আর কাউকে “মা” বলে ডাকতে পারব না।’
বৃষ্টির বাবার এখন একটাই দাবি, তার মেয়ের মরদেহ খুঁজে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তিনি বলেন, ‘শুধু শেষবারের মতো আমার মেয়ের মুখটা দেখতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকান আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন আমার ছেলেকে ফোন করে মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ জানায়। প্রতিদিন আমার ছেলে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এখন পর্যন্ত আমার মেয়ের মৃতদেহের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আমার মেয়েকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। সব হারিয়ে গেল।’
বৃষ্টির পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে শহীদ বীর-উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি—উভয় পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ পেয়ে পাশ করেন বৃষ্টি। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে বুয়েটের পড়াশোনা শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পান তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট তিনি আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।
বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর এলাকায়। তবে গত ২৫ বছর ধরে তার পরিবার ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বরে থাকছে। বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে স্বজনরা প্রথম তার মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন।
বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আকন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বৃষ্টি আপু অনেক মেধাবী ছিলেন, অনেক ভালো ছিলেন। সকালে জাহিদ ভাইয়া (বৃষ্টির বড়ভাই) তার ফেসবুকে আপু মারা যাওয়া নিয়ে পোস্ট দেন, তা দেখে আমরা প্রথমে জানতে পারি। তবে এর আগে থেকেই আপু নিখোঁজ ছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে, কেন তাকে হত্যা করা হলো—তা আমরা কিছুই জানি না। তার এক সহপাঠীকেও হত্যা করা হয়েছে। শুনেছি তার লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু আপুর লাশ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই। আর বৃষ্টির লাশ দেশে আনার দাবি জানাই।’

সংগৃহীত ও সংকলিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *