অ্যাডিলেডে আদিবাসীদের নববর্ষ উদযাপন

তুহিন ভাই যখন আমাকে আমাদের নববর্ষ উদযাপন নিয়ে কিছু লিখতে বললেন, তখন কিছুক্ষণ থেমে ভাবতে হলো—কি লিখব! এ ধরনের লেখালেখিতে আমি তেমন অভ্যস্ত নই, তারপর মনে হলো, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেই ফেলি।
ধীরে ধীরে অ্যাডিলেড হয়ে উঠছে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের অনেক মানুষের আরেকটি গন্ত্যবস্থান। খুব বেশি দিন নয়—মাত্র এক দশক এর একটু বেশি আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রথম একটি চাকমা পরিবার এখানে এসে বসতি গড়ে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন পাহাড়ি পরিবার, আর উচ্চশিক্ষা ও নতুন সম্ভাবনার খোঁজে আসা শিক্ষার্থীরা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক উজ্জ্বল, বহুরঙা সংস্কৃতির বন্ধন যা সমৃদ্ধ করেছে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বহুসংস্কৃতির রূপ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহু আদিবাসীদের আবাসভূমি—যেখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, ম্রো, খুমি, খিয়াং, বম, লুসাই, পাংখো (পাংখোয়া), বনযোগী, রাখাইন এবং সাঁওতাল   জনগোষ্ঠী/জাতি যুগ যুগ ধরে সহাবস্থানে বসবাস করে আসছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব নাম রয়েছে নববর্ষের জন্য, আর রয়েছে নিজস্ব উদযাপনের রীতি। যেমন চাকমারা পালন করে বিঝু, ত্রিপুরারা উদযাপন করে বৈসু বা বৈসুক, মারমা আর চাকরা পালন করে সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যারা পালন করে বিসু। একইভাবে চাক, খুমি, ম্রো, বম ও রাখাইনরা  পালন করে সাংগ্রাই/সাংক্রান। তবে এই ভিন্নতার মাঝেও একটি সুন্দর মিলনবন্ধন রয়েছে, সমষ্টিগতভাবে এটি পরিচিত ‘বৈসাবি’ নামে। ভিন্ন ভিন্ন নাম, ভিন্ন ভিন্ন আচার তবুও একসাথে মিলেমিশে, সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির বন্ধনে সবাই এই উৎসব উদযাপন করে।

চলুন জানি বৈসাবি উৎসব সম্পর্কে।   সাধারণত বৈসাবি উৎসবটি তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। পঞ্জিকার শেষ দুই দিন আর বছরের প্রথম দিন নিয়ে আয়োজন এই উৎসবের। সাধারণত ইংরেজি পঞ্জিকার ১২ই এপ্রিল থেকে ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত চলে নববর্ষ এর আয়োজন।

প্রথম দিনটি শুরু হয় ফুল অর্পণের মধ্য দিয়ে—নদী কিংবা দেবতার উদ্দেশ্যে। এই অর্পণের মাঝে লুকিয়ে থাকে একটি গভীর প্রার্থনা—গত বছরের সব দুঃখ-কষ্ট, বেদনা ধুয়ে মুছে যাক, আর নতুন বছর বয়ে আনুক শান্তি, সুখ আর নতুন সূচনা। এই সাংস্কৃতিক আচারটি সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তরুণদের অংশগ্রহণে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা নিজেরা ফুল সংগ্রহ করে, ঘর সাজায় রঙিন ফুলে, আর তারপর সেই ফুল উৎসর্গ করে বুদ্ধ কিংবা নিজ নিজ দেবতার কাছে। আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে, বন্ধু-বান্ধব, বড়-ছোট সবাই মিলে যাত্রা করে নদীর পানে, কলা পাতায় সাজানো ফুল অর্পণ করে জল দেবতাকে, আর প্রার্থনা থাকে আসন্ন দিনের জন্য সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধির।

তবে অ্যাডিলেডে পরিবেশগত নিয়মের প্রতি সম্মান জানিয়ে, এখানকার  আদিবাসী সম্প্রদায় নদী বা লেকে ফুল অর্পণ করে না। সেটি বাদে সেই অনুভূতি, সেই বিশ্বাস আর উৎসবের আনন্দ সবকিছুই সমান উচ্ছ্বাস আর আন্তরিকতায় পালন করা হয় এখানে।

দ্বিতীয় দিন—সাধারণত ১৩ই এপ্রিল নিয়ে আসে উৎসবের মূল আনন্দধারা। আমরা সবাই জানি, খাবার একটি সংস্কৃতির অন্যতম বড় পরিচয়, আর আদিবাসীদের  ক্ষেত্রেও এটি একেবারেই সত্য। এই দিনে রান্না করা হয় বিশেষ একটি পদ – পাঁজন – যা নানা ধরনের পাহাড়ি সবজি, পাহাড়ি মসলা এবং শুঁটকি মাছ দিয়ে তৈরি এক অনন্য মিশ্রণ।

শুধু পাঁজনই নয়, এই দিনের আয়োজনে থাকে আরও নানা রকমের খাবার—ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন, মৌসুমি  সবজির তরকারি, আর পাহাড়ের বিশেষ পানীয় ‘দোচোয়ানি’। প্রায় প্রতিটি ঘরেই রান্না হয় ‘পাঁজন তোন’—এখানে ‘তোন’ মানে তরকারি—আর চেষ্টা থাকে যত বেশি সম্ভব পদ অন্তর্ভুক্ত করার। সাধারণত ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত আইটেম থাকে, চেষ্টা থাকে যতধরনের মৌসুমি সবজি দেওয়ার।

একটি মজার রীতি রয়েছে বিঝুতে (চাকমাদের নববর্ষ)—এই দিনে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে অন্তত ৭টি বাড়িতে যেতে হয়। না হলে নাকি বিঝু পূর্ণতা পায় না! ছোটবেলায় একবার আমি আমার কাজিনের সঙ্গে ১৫টি বাড়িতে গিয়েছিলাম। তবে সাধারণত সংখ্যাটা আরও বেশি হয়। এপ্রিলে এই  দিনে   দল বেঁধে বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে চলা, গল্প আর হাসিতে ভরা সেই মুহূর্তগুলো পাহাড়ের প্রতিটি ছেলে-মেয়ের জীবনে এক অমলিন, সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে।

আর শেষে আসে তৃতীয় দিন—১৪ই এপ্রিল, নববর্ষের দিন।

১২ই এপ্রিল পরিচিত ফুল বিঝু নামে, ১৩ই এপ্রিল পালিত হয় মূল বিঝু, আর ১৪ই এপ্রিলকে বলা হয় গোজ্জে পোজ্জে দিন বা নববর্ষ এর প্রথম দিন। এই দিনে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করে, বড়দের আশীর্বাদ নেয়, আর অংশ নেয় বিঝুর নানা আয়োজনে।

তাহলে অ্যাডিলেডের আদিবাসীরা কীভাবে উদযাপন করে তাদের নববর্ষ?  অ্যাডিলেডে আমরা এই তিনটি দিন আলাদাভাবে উদযাপনের সুযোগ খুব কমই পাই। তাই এখানকার আদিবাসীরা চেষ্টা করে একদিনেই এই তিন দিনের মূল আচারগুলোকে একসাথে ধারণ করতে। অনেকেই এই দিনের জন্য কাজ থেকে ছুটি নেয়, শিক্ষার্থীরাও চেষ্টা করে অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার চাপকে ইস্টার বিরতির আগে বা পরে সামলে নিতে।

সব বাধা আর ব্যস্ততার মাঝেও, অ্যাডিলেডের প্রতিটি আদিবাসী  প্রাণপণে চেষ্টা করে এই সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনের অংশ হতে। আমরা একত্র হই কোনো বাসায় বা পার্কে—ফুল দিয়ে সাজাই নিজেদের বাসা, বুদ্ধ ও নিজ নিজ দেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি, আর নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে উঠি—পিনন-হাদি, থামি-আঙ্গি, রিগনাই-রিসা কিংবা আরও অনেক রঙিন পরিচয়ে।

প্রত্যেকে নিজের ঐতিহ্যের খাবার নিয়ে আসে,  সবাই সবার সাথে ভাগাভাগি করে ,এতে  থাকে পাঁজন সহ  আরো  ঐতিহ্যবাহী  নানা পদ । এই দিন গান গাওয়া হয়, খেলা হয়, আর পাহাড়ের সুরে ভেসে ওঠে পুরো পরিবেশ।

ব্যস্ত জীবন, কাজ আর পড়াশোনার চাপের মাঝেও আমরা চেষ্টা করি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই আয়োজন চালিয়ে যেতে যাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়সূচির মাঝেও কেউ যেন বাদ না পড়ে। ব্যস্ততার কারনে আমাদের সবার সময়  একসাথে মেলে না। কিন্তু এই একটি দিন আমাদের আবার ফিরিয়ে আনে শিকড়ে, আমাদের মানুষদের কাছে।

আপনি যে ছবিগুলো দেখছেন, সেগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি জাতির মানুষ তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকারে সজ্জিত।

বৈসাবি শুধুই একটি উৎসব নয় এটি আমাদের  অস্তিত্বের শেকড়ও। বৈসাবি উদযাপন মানে বাড়ী ফেরা, নিজের কাছে ফেরা। আমাদের ব্যস্ততা বা দূরত্ব যতই থাকুক, এই দিনে আমরা একসাথে হই, সংযোগ খুঁজে পাই, আর অনুভব করি সেই চেনা উষ্ণতা, সেই আপন করে নেওয়ার অনুভব।

হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেই পাহাড় আমাদের ভেতর থেকে কখনো দূরে সরে যায়নি। এই নববর্ষে আমরা শুধু উদযাপন করতে একত্র হই না—আমরা ফিরে যাই আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের পরিচয়ে, আর সেই ভালোবাসার বন্ধনে, যা আমাদের সবাইকে এক করে রাখে আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সাথে পরিচিতি করিয়ে গড়ে তুলে ।

ফটো সৌজন্যে- প্রিমা চাকমা, সুস্মিতা ত্রিপুরা ও Adelaide Jummos. (জুম চাষ পাহাড়ি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই পরিচয়কে বুকে ধারণ করে, অ্যাডিলেডে বসবাসরত পাহাড়ি জাতির সবাই গর্বের সাথে নিজেদের ‘Adelaide Jummos’ নামে পরিচয় দিয়ে থাকেন।)

লেখা – জ্যোতি জীবন খীশা, অ্যাডিলেড। বিশেষ ধন্যবাদ – উছাছা-এ চাক, অ্যাডিলেড।