বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেই তপ্ত লড়াই আর বিজয়ের গৌরবগাথাকে কবিতার ছন্দে নতুন করে তুলে ধরতে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে আয়োজন করা হয় একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘কবিতায় স্বাধীনতা’ শিরোনামের এই আয়োজনে স্মরণ করা হয় সেই সব সূর্যসন্তানদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের মানচিত্র। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে কবিতার ছন্দে ও দেশাত্মবোধের অনন্য আবহে পালিত হলো বাংলাদেশের ৫৫তম মহান স্বাধীনতা দিবস। গত ২৮ মার্চ, শনিবার, স্থানীয় ‘পার্কস থিয়েটার’ হলে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন SABCA (South Australian Bangladeshi Community Association) আয়োজন করে বিশেষ আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘কবিতায় স্বাধীনতা’।


প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এক টুকরো বাংলাদেশ যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল এই আয়োজনে। অনুষ্ঠানে অ্যাডিলেডে বসবাসরত স্থানীয় প্রতিশ্রুতিশীল আবৃত্তিশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাঁদের দরাজ কণ্ঠে তুলে ধরেন বাঙালির তপ্ত লড়াই, মহান মুক্তিযুদ্ধ আর বিজয়ের গৌরবগাথা। শব্দে-ছন্দে স্মরণ করা হয় সেই সব সূর্যসন্তানদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে লাল-সবুজের মানচিত্র।
অনুষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চার করা। আয়োজকরা জানান, শেকড় থেকে দূরে থাকলেও উত্তরসূরিদের মাঝে দেশপ্রেম ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই আয়োজন।
পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন মৃন্ময়ী সাহা এবং SABCA-এর সাধারণ সম্পাদক শৌভনিক দত্ত।
সাংস্কৃতিক এই মিলনমেলায় বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিরা বলেন, এই ধরনের অনুষ্ঠান প্রবাসে আমাদের গৌরব ও হৃদস্পন্দনকে সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার একটি দারুণ সুযোগ। সব মিলিয়ে কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে প্রবাসের মাটিতে রচিত হয়েছিল এক টুকরো লাল-সবুজের আবেগ।
শৌভনিক তাঁর সংক্ষিপ্ত ধন্যবাদ বক্তব্যে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন প্রতিটি আয়োজনের পেছনে থাকে কিছু মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা। এই অনুষ্ঠানও আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছাত না, যদি না এর পেছনে কিছু মানুষের প্রেরণা, উৎসাহ ও সহযোগিতা থাকত। আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা SABCA Chairperson মোহাম্মদ তারিক, SABCA Advisor মাহবুব সিরাজ তুহিন, আমাদের সব আয়োজনের শক্তিশালী মেরুদণ্ড রিজভী শুভ এবং আজমুল হক পাপ্পু ভাইয়ের প্রতি। তার সাথে আমরা নিঃশর্ত সমর্থন পেয়েছি SABCA Executive Committee-এর সকল সদস্যের কাছ থেকে।
SABCA-এর নিজস্ব কর্মীদের বাইরে আমরা পরিচিত হয়েছি এবং পেয়েছি অ্যাডিলেডের অনেক প্রতিভাবান কবিতাপ্রেমী মানুষকে, যারা প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের সহায়তা করে গিয়েছেন। আমাদেরকে লেখা দিয়ে সহায়তা করেছেন লিটন মতিন ভাই। আমাদেরকে বাঁশিতে সহযোগিতা করেছেন ডক্টর লিপন সাহা। আমরা সৌভাগ্যবান বাংলাদেশের মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের অন্যতম শক্তিশালী নাট্যশিল্পী কবির আহমেদকে আমাদের মাঝে পেয়ে। মির আসলাম, জাফরিন জলিল তিথি এবং রিমা সাহা—এই আয়োজনকে সফল করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আমাদের চিরতরুণী রোজি আন্টি ও রুনি আন্টির অনুপ্রেরণা ছাড়া আমরা এই অনুষ্ঠান করার সাহস পেতাম না। ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না ডক্টর মামুন আলা ভাইকে। ধন্যবাদ ঝংকার পাল ও ইভা চন্দাকে তাঁদের অসাধারণ কবিতা আবৃত্তির জন্য, এবং আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য।
মা দুর্গার দশ হাত হয়তো কেউ চোখে দেখেনি, কিন্তু আজও কিছু মানুষ যেন সেই দশ হাতের সামর্থ্য নিয়ে জন্মায়। সেই রকম দুজন মানুষ—শুভ ভাই ও মৃন্ময়ী সাহা—যারা তাঁদের বহুমুখী প্রতিভা দিয়ে আমাদের এই আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেছেন। আমি বিশেষভাবে আনন্দিত তানজিনা ফেরদৌস তাইসিন-এর প্রতি—আমার জ্ঞানের গণ্ডিকে ক্ষুদ্র ডোবা থেকে এক মহাসাগরে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
এই আয়োজনের সকল অংশগ্রহণকারী কবি, শিল্পী ও আবৃত্তিকারদের প্রতি রইল আমাদের আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমাদের এই আয়োজনটি আপনাদের সকল দর্শকের জন্যই। আজকের এই সন্ধ্যায় আপনাদের উপস্থিতি আমাদের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি। SABCA আয়োজিত এই কবিতা সন্ধার মাধ্যমে ৫৫তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা রইল সকলকে। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “স্বাধীনতা থাকুক আমাদের অন্তরে।” উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামীতেও কবিতা, অনুভব ও ভালোবাসার এই ধারা অব্যাহত থাকবে। কবিতার ছন্দে ও দেশপ্রেমের টানে এই সন্ধ্যাটি অ্যাডিলেড প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়ে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এদিকে একই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সন্তানদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি দিতে এক জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সাউথ অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশি কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন (SABCA)। গত ২৮ মার্চ শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় অ্যাডিলেডের পার্ক সাইট কমিউনিটি সেন্টারে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ‘ইয়ার ১২’ (উচ্চ মাধ্যমিক সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের সম্মাননা জানাতেই এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের উদ্যোগ নেয় সংগঠনটি।
মেধার স্বীকৃতি ও উৎসাহ : অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিসহ কমিউনিটির গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে সফল শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট তুলে দেন। সাবকা (SABCA)- এর চেয়ারপারসন মোহাম্মদ তারিক জানান প্রবাসের প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতি ধরে রেখে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলাদেশিদের এই অভাবনীয় সাফল্য পুরো জাতির জন্য গর্বের।
সাবকা (SABCA)- BCA স্কুলের প্রিন্সিপাল আজমুল হক পাপ্পু জানান: “আমাদের সন্তানদের এই কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতা আগামী দিনের তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। তাদের এই অসামান্য অর্জনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।”
বিপুল সংখ্যক অভিভাবক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। SABCA Advisor মাহবুব সিরাজ তুহিন এর পক্ষ থেকে এই ধরনের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়, যা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও মেধার বিকাশ ঘটাতে সহায়ক হবে।

সংবর্ধনা পাওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “বিদেশের মাটিতে আমাদের সন্তানেরা যখন নিজেদের মেধার প্রমাণ দেয়, তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। সাবকা-র এই স্বীকৃতি তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেবে।”
আগত অতিথিদের অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের আয়োজন কেবল পড়াশোনায় নয়, বরং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি পরিচয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মধ্যে একটি শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন তৈরি করে।
উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরতে সাবকা (SABCA) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি ছিল সেই ধারাবাহিকতারই একটি অনন্য অংশ।
অনুষ্ঠানের ভিডিও লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=s9jOKCSSo9g&list=PLMQYC0LnbTtMLyyamiS1VmorfZqsKDqX7