নদীর কথা ও কলমে: কিছু পিছু ডাক, কিছু মায়ায় থাকে যে জীবন

আমাদের যে দিন যায় চলে তা ফিরে আসেনা, মানুষ জীবন ভর কেবল জমায় মায়া, স্মৃতি আর কিছু স্বপ্ন। ফিরে আসেনা জেনেও মানুষ ফেরে একাকী সেই সময়গুলোর কাছে, নীরবে যেয়ে দাঁড়ায় সেই শৈশবের নদীটার কাছে সন্তর্পণে। কেউ জানেনা কেবল সেই মানুষটা জানে, নদীকে সে কোন গল্প শুনায়, নদীটাই জানে কোন মানুষটা তার খুব কাছের, বুকের মাঝে লুকানো থাকে জীবন ভর।

আমার শৈশবের বেড়ে উঠা যে গ্রামটিতে, সেখানকার সেই বাড়ির ঠিক পেছনটা ছিল স্বপ্নের মতন এক স্থির চিত্রকল্প, যেন এক শিল্পী এঁকেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। আমাদের ছোট্ট আঙ্গিনা জুড়ে ছড়ানো ছিল আমার মায়ের হাতের ছোঁয়ায় বেড়ে উঠা এলোমেলো কলাবতীর লাল হ্লুদের ঝোপ। পাশেই গলাগলি করে বেড়ে উঠা ‘দোলনচাঁপা গুচ্ছ’, ওয়াটার লিলি। অন্য পাশে পেয়ারা আর লেবু এবং আরো কিছু গাছের মায়া জড়ানো ছায়া। আর এর মাঝেই কিনা মায়ের শখে এবং খুব মমতায় বেড়ে উঠা নীল অপরাজিতার লতানো অপরুপ নীলাভ সবুজের মাখামাখি প্রেম নিয়ে এক মাচা।

এই রকম এক স্বপ্ন ছোঁয়া আঙিনার সীমানা ঘেঁষেই সরু এক খাল। সেটির পার জুড়ে ধানী জমি যেখানে যেয়ে মিশে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বের হওয়া ছোট্ট এক প্রশাখা নদী। এবং সেই নদীর ধারেও আশ্চর্য সুন্দর এক গাছের সারি থেকে কোন এক শিমুল সেই আগ বাড়িয়ে জানান দিত প্রকৃতির মাতাল করা রঙের খেলার সময়গুলোর আগাম বার্তা। শিমুলে লালের ছোঁয়া এলেই আমাদের স্কুলে পড়া দিনগুলোতে বুঝে যেতাম এই এলো আবার ‘পলাশ ফোঁটা শিমুল ফোঁটা দিন’। আবার এসেছে, ‘অমর একুশের সেই ক্ষণ’, প্রভাত ফেরীর দিন।

সেই ছোট খাল, ধানী জমি এবং নদী, বর্ষা এলেই তুমুল বৃষ্টির জলে এবং দূর পাহাড়ী ঢলের বন্যায় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। এক ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হয়ে তারা কিনা সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে মিলে যেত এক সাথে নিষিদ্ধ এক টানে। অল্প কটা দিনের জন্যে হলেও। আমাদের বাড়ির সেই আঙিনাটাও হয়ে যেত অচেনা। কিন্তু এর মাঝেই দূর থেকে ভেসে আসা নৌকা, ভেলা, ট্রলারের আগমন, তাতে থাকা যাত্রী রুপি অচেনা আর দূরের মানুষগুলোর অবয়ব ঘিরে আমার চোখে রাজ্যের বিস্ময় আর অপেক্ষা। কবে আবার ফিরে পাব আমাদের তলিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া সেই চেনা খাল, নদী আর শিমুলের হাতছানি।

আমি নিশ্চিত, এইটুকুন পড়ে আমার মতন যে বা যাদের জন্ম, শৈশব কৈশোর বেড়ে উঠা বাংলার কোন গ্রামে চোখ বুজে ঠিক কেউ কেউ চলে গেছেন সেখানে। কারো কাছের বা দূরের কোন এক পুকুর ঘাটে, আপনার প্রিয় নদীটির তীরের আহ্বানে কিংবা, আদিগন্ত সবুজের পিছু ডাকে।

ভরা বর্ষায় ছোট বেলায় আমার সুযোগ হয়েছে বেশ কবার জোসনার আলোতে, বড়দের সাথে নৌকায় চড়ে সেই খাল পার হয়ে অদুরের এক শাপলা ফোটা বিলে যাবার।
আমার চোখে সেই শৈশবে দেখা সেই জোছনা রাতের অলৌকিক সুন্দর ছিল সেই রাত্রীগুলো। এখনও কোন কোন রাতে চোখ বুজে আমি খুব করে চাই এমন কোন রাতে হারাবার, আরো একবার…
গ্রামের হাঁট বাজারের দিনে ঔষধ বিক্রেতার সাথে আসা নাম না জানা, রোগা কালো কোন এক কিশোরের চোখ… ছোট্ট আমি, সবার অলক্ষ্যে কতবার দেখেছি সেই উদভ্রান্ত চাহনী… গলায় ঝুলানো হারমোনিয়ামের সুরে যে কিনা তুলে নিয়েছে ”বনমালী গো পর জনমে হইয়ো রাধার” মতন কোন বিরোহী সুর।
সেই কিশোরের ‘’রাঁধার বিরহ বুঝার কথা না’’ কিন্তু কী সেই হাহাকার, ওর হৃদয় জুড়ে হয়তো ছিল শুধুই সাদা ভাতের ছবি, জানা হয়নি, কেউ জানবে না তা কোনদিন।
আহ ‘’আমার মন কেমন করে, কী যেন কীসের তরে’’
কিশোর ছেলেটিকে কী আপন মনে হয়, আমি একে খুব খুব করে চিনি কিন্তু আমাদের কথা হয়না।
না বলা কথার কাঁপন আমার বুকে বিঁধে থাকে… আহারে কী মায়া, কী মায়ার সেই টান।
গ্রাম ছেড়ে কেন মানুষ নগরে যায়,
কেন যায়…
কত কী যে হারিয়ে যায়।
আর কোন দিন যে তা ফিরে আসেনা তা কী মানুষ জানেনা!
কেন যায়, কোথায় ছুটে চলে মানুষ, শৈশবের সেই নদীর টান ভুলে…

অনেকের মতন, শৈশব কৈশোরে এমন কিছু সময় এসেছে যে সময়গুলোর স্মৃতি আমার মাঝে ভীষণ ছাপ রেখে গেছে। জীবন থেকে যত সময় ফুরাচ্ছে, আমার আমিটা সেই সময়গুলোর কাছে তত বেশী সমর্পিত হচ্ছি। জীবনের অনেক বৈরী সময়ে যখন জীবনের মানে খুঁজে ফিরি, আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখি
‘আমার যে আমিটা সামনে এসে দাঁড়ায়, সেই আমিটা সেই গ্রামের সবুজ আল পথ ধরে, বেনুনী দুলিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে’
যে আমিটাকে আমার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে, বুকের মাঝে চেপে রাখতে ইচ্ছে করে, ‘সেই আমি নানা বাড়ি বেড়াতে গিয়ে, কোন এক সন্ধ্যে নামি নামি সোনালী বিকেলে, সবার অলক্ষে চলে গেছি সেই পুকুর পাড় ধরে গুটি গুটি পায়ে ধানী মাঠে, যেখানে পাকা ধানের মৌ মৌ মাতাল করা সুবাস… হাতছানি দিয়ে ডেকে বলছে, ‘আয়’…
পার হলেই পরে, দূরের সেই উঁচু রাস্তা, হালকা কুয়াশা মায়া ঘোর এই বুঝি এলো…
”আহ কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা”
ঐ যে রাস্তার পর ঈদগাহ মাঠ, তারও পরে সবুজের সমারোহ, তারপরে সেখানেও আছে এক রহস্যময় নদী… এমন কোথাও আমি হারাতে চেয়েছি কত বিকেল ছোঁয়া সন্ধ্যায়! এই রকম কিছু অপার্থিব সময় পেয়েছি বলেই প্রায়ই ভাবি, ‘জীবন রইলো পরে এমন এক কুয়াশামোড়া মাঠে’।
জীবনের সময় ফুরাচ্ছে আর স্মৃতিকাতর হচ্ছি, নিজের অজান্তেই ভাবি,
আরো একবার মায়ের যতনের সেই আঙিনায় দাঁড়িয়ে খুঁজবো সেই দোলন চাঁপার সুবাস, নদীর কাছে যাবো।
সবুজ ছুঁয়ে, মাটির ঘ্রাণ নেবো, বৃষ্টি এসে আমায় ভেজাবে।
চেনা সেই ফুলের গন্ধে চোখ বুজে আরো একবার বলবো আহ জীবন, আহ বেঁচে থাকা, আমি এক প্রকৃতির কন্যা, ব্রহ্মপুত্রের মেয়ে!

কিছু ঘোর…
শৈশবের প্রিয় সেই লাল ফিতে বাঁধা বেনুনী দুলিয়ে সন্ধ্যে আসি আসি সময়টায় ধানী জমির আল ধরে প্রিয় কোন খেলার সাথীর হাত ধরে কুয়াশা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভোঁ দৌড়ে বাড়ি ফেরা।

লুকিয়ে রাখা এক কৌটা রঙিন মার্বেল। যেন পুরোটা ভর্তি রঙিন স্বপ্ন!

কোন এক উৎসব ভোরে ছোট ভাইকে নিয়ে দূরের পাড়া থেকে চেনা অচেনা ফুল সংগ্রহ, যেন ডালি ভর্তি সুখ, বাড়ি ফিরে মালা গাঁথা।

স্কুলের পেছনের সেই বিশাল রেইনট্রি গাছের আড়াল, যেখানে দাঁড়ালেই দেখা যেত দূর ঐ রাস্তা দিয়ে কে আসে, কে যায় চলে!

সাইকেল রিক্সার টুং টাং শব্দেরা যাচ্ছে দূরে…
এমন সব ছেঁড়া ছেঁড়া অনুভব প্রতিধ্বনি তোলে, নিউরনে অনুরণিত হয়।
আমাদের যে দিন যায় চলে তা ফিরে আসেনা, মানুষ জীবন ভর কেবল জমায় মায়া, স্মৃতি আর কিছু স্বপ্ন। ফিরে আসেনা জেনেও মানুষ ফেরে একাকী সেই সময়গুলোর কাছে, নীরবে যেয়ে দাঁড়ায় সেই শৈশবের নদীটার কাছে সন্তর্পণে। কেউ জানেনা কেবল সেই মানুষটা জানে, নদীকে সে কোন গল্প শুনায়, নদীটাই জানে কোন মানুষটা তার খুব কাছের, বুকের মাঝে লুকানো থাকে জীবন ভর।

‘নদীর কলমে ও কথায় এমন হারিয়ে যাওয়া সব অনুভবের ছোঁয়া নিয়ে আমি থাকছি ‘আমাদের কথা’র এই কলামে’ নিয়মিত। যে বা যারা পড়লেন, এক নদী ভালোবাসা।

নাদেরা সুলতানা নদী
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া